প্রচ্ছদগদ্যমুসা আল হাফিজ : লড়াইয়ের সামনের কাতারে থাকা একজন লেখক

লিখেছেন : এনামূল হক পলাশ

মুসা আল হাফিজ : লড়াইয়ের সামনের কাতারে থাকা একজন লেখক


এনামূল হক পলাশ

কওমি মাদ্রাসা থেকে একজন কবি বেরিয়ে এসেছেন প্রেম দ্রোহ আর মানবিক বোধ থেকে। তার নাম মুসা আল হাফিজ। তার কবিতার সাথে খুব বেশি আগে আমার পরিচয় হয় নি। তিনি বিগত বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে একজন চিন্তক হিসেবে ধরা দিয়েছেন আমার কাছে। চিন্তার স্বাধীনতা এবং সমন্বয় অনেক সময় একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের কাছাকাছি এনে দেয়। আমরা দুজন বিপরীত মেরুর লোক হলেও চিন্তায় কাছাকাছি। ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। পোস্টটি ছিল– “ঘর যে তৈরী করেছেন তার মধ্যে এক্সিট পয়েন্ট রেখেছেন তো?”
লাইক মাত্র ৭ টা। কমেন্ট ৩ টা। ঘটনাচক্রে এক্সিট পয়েন্টটি বেদনাদায়ক ছিল। সেটা ঘটেছিল ২০২৪ সালে। এইজন্য ঘর বানানোর সময় বের হওয়ার একটি রাস্তা রাখতে হয়।
তারপর ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমি লিখেছিলাম,
“আমি কীভাবে ভুলে যাব ভাই হারানোর বেদনা?
আমি কীভাবে ভুলে যাব পুত্র হারানোর বেদনা?
আমি কীভাবে বয়ে বেড়াবো এই ঝাঁঝরা মানচিত্র?
তুমি বুক পেতে নিরস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলে
গাঢ় নীল অথবা হালকা জলপাই কালারের
সসস্ত্র কুকুরগুলোর মুখোমুখি।

ইয়াবা ব্যবসায়ী কুকুরের দল মানচিত্রটি
সদম্ভে নিজেদের পকেটে ভরে
গুলি করে দিলো তোমার নিরস্ত্র বুকে।
তুমি হাঁটু গেড়ে চেটে খাওনি শুয়োরের পা,
বাংলাদেশকে ফেলে রেখে দেখাওনি পিঠ,
বেজন্মার মতো চেপে ধরোনি মায়ের টুটি,
কেননা একদিন তুমি জন্মেছিলে মাতৃগর্ভে।”

এর বেশি কিছু লিখতে পারিনি। কিন্তু মুসা আল হাফিজ রীতিমতো এক কলাম লিখেছেন। সেটি প্রচারিত হয়েছে ইনসাফ নামের এক অনলাইন পোর্টালে। তিনি লিখেছেন, “আন্দোলনটি কোটা ইস্যুর চেয়েও গভীর। বস্তুত সরকার ভুল অঙ্ক কষছে। ক্ষমতাকে দম্ভ দিয়ে নিরাপদ করতে চাইছে। কিন্তু পাপ বোধ হয় চূড়ান্ত পরিণতির শেষ মঞ্চে । নিয়তির সাইরেন বোধ হয় বেজে গেছে।”
সে এক সর্বনাশা সময়। মানুষের জবান বন্ধ রাখার সময়। নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলাম বিভিন্ন মহলে। আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। প্রশ্ন ছিলো হাসিনা কি যাবে? নাকি রক্তের উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ শাসন করবে? বন্ধু বা একই মতের অন্যান্যদের সাথে আমরা মোবাইলে পরস্পর মতবিনিময় করছিলাম। সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন হওয়া উচিত মনে করেছিলাম। প্রবল রক্তস্রোতের আশংকা করছিলাম। আমরা মনে করেছিলাম হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকারের আর এক মুহূর্ত ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার নেই। তখন মুসা আল হাফিজের ১৮ জুলাইয়ের এই ইশারা ছিলো আমাদের মনোভাবের প্রকাশ্য ইশারা। এখানেই মুসা আল হাফিজের সাথে আমাদের একাত্মতা। চিন্তার ঐক্য আমাদেরকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। মুসা আল হাফিজ তার ধর্মীয় পরিচয় ছাড়িয়ে কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে এক বিশাল হাতিয়ার হয়ে উঠলেন। এ হচ্ছে সেই সময়; যে সময়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে কমিউনিস্ট, আলেম, উলামা সহ সকল মতাদর্শের লোক নিজেদের আত্মপরিচয় বাক্সে ভরে হাসিনার পতনের অপেক্ষায় ছিলো। মুসা আল হাফিজের সেই কলামটি মানুষের ভেতরের বয়ানটা প্রকাশ করে দিল। একজন মাফিয়ার বিরুদ্ধে মুসার কলম ধরাটা শুধুমাত্র সাহসিকতা বললে ভুল হবে। রীতিমতো এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় নেমেছিলেন মুসা আল হাফিজ। ইতিহাসে এমন ২৪ আর আসবে কিনা জানিনা, আমরা যারা ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে আছি তারা জানি ঘটনাটি আসলে কি।
আপনি যখন ক্ষমতার বাইরে থাকবেন তখনই আপনার পক্ষে জনগণের অভিপ্রায়কে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। এজন্যই বুদ্ধিজীবীদের উচিত ক্ষমতার বলয়ের বাইরে থাকা। কারণ, বুদ্ধিজীবীদের কাজ রাষ্ট্র পরিচালনা করা নয়। বুদ্ধিজীবীদের কাজ হচ্ছে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে সমাজ পরিবর্তনে চিন্তার প্রভাব বিস্তার করা যাতে জনগণের অভিপ্রায় প্রতিফলিত হবে। মুসা আল হাফিজ ক্ষমতার বাইরে থেকে চ্যালেঞ্জ করতে জানেন। আমরা যখন নিজেদের আত্মপরিচয় বাক্সবন্দী করে সাধারণ জনতার সাথে মিশে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলাম, মুসা আল হাফিজ তখন তার লেখক পরিচয় নিয়েই সকল বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছেন। আজ ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই না আসলে আমরা বা মুসা আল হাফিজের মতো লোকদের স্থান হতো আয়নাঘরে অথবা চিরতরে পৃথিবী থেকে গুম হয়ে যেতে হতো। লাল জুলাইএ অবদান রাখার জন্য মুসা আল হাফিজকে স্যালুট জানাই।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা