মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
অনেক অনেক কাল আগের কথা। পৃথিবীর মানচিত্রে ‘হৃদয়পুর’ নামে এক বিস্তীর্ণ এবং সুজলা-সুফলা উপত্যকা ছিল। উপত্যকাটি ছিল সৃষ্টিকর্তার এক অপূর্ব দান। চারদিকে সবুজের সমারোহ, মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা স্ফটিকস্বচ্ছ নদী আর পাখির কলকাকলিতে মুখরিত এক স্বপ্নিল জনপদ। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এই উপত্যকার মানুষের মনে এক অদ্ভুত ব্যধির জন্ম হলো। এই ব্যধির নাম ‘অহংকার’। সম্পদ, আভিজাত্য এবং ক্ষমতার মোহে পড়ে হৃদয়পুরের মানুষ নিজেদের দুটি ভাগে বিভক্ত করে ফেলল। উপত্যকার উঁচু ভূমিতে যারা বাস করত, তারা নিজেদের নাম দিল ‘স্বর্ণচূড়া’। আর নিচু ভূমির নাম হয়ে গেল ‘ধূলিমাটি’। স্বর্ণচূড়ার অধিবাসীরা উপত্যকার সমস্ত সম্পদ, নদীর মিঠা পানি এবং উর্বর জমি নিজেদের কুক্ষিগত করে নিল। কেবল সম্পদের অধিকার নিয়েই তারা ক্ষান্ত হলো না, ধূলিমাটির মানুষদের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য তারা দুই জনপদের মাঝখানে তৈরি করল এক বিশাল, নিরেট এবং আকাশচুম্বী প্রাচীর। পাথরের তৈরি সেই প্রাচীর কেবল দুটি ভূখণ্ডকেই আলাদা করল না, বরং মানুষের সাথে মানুষের আত্মার যে পবিত্র সংযোগ ছিল, তাকেও চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দিল।
বছরের পর বছর কেটে যায়। স্বর্ণচূড়ার মানুষেরা প্রাসাদের পর প্রাসাদ নির্মাণ করে। তাদের জীবনে বিলাসিতার কোনো কমতি নেই। রেশমি পোশাক, মণিমুক্তা, সোনার থালা আর সুস্বাদু খাবারের আয়োজনে তাদের দিন কাটে। কিন্তু এত সব প্রাচুর্যের মাঝেও তাদের মনে কোনো সত্যিকারের প্রশান্তি নেই। এক অদ্ভুত আত্মকেন্দ্রিকতা আর স্বার্থপরতা তাদের গ্রাস করে ফেলেছে। অন্যদিকে প্রাচীরের ওপারে ধূলিমাটির মানুষদের জীবনে নেমে এসেছে অবর্ণনীয় কষ্ট। উর্বর জমি এবং পানির অভাবে সেখানে ফসল ফলে না। অনাহার, অর্ধাহার আর রোগে-শোকে সেখানকার মানুষেরা কঙ্কালসার হয়ে বেঁচে আছে। তবুও ধূলিমাটির মানুষদের মধ্যে একটি জিনিস টিকে ছিল—সেটি হলো পারিবারিক উষ্ণতা এবং একে অপরের প্রতি সহানুভূতি। নিজেদের চরম অভাবের মধ্যেও তারা একে অপরের চোখের পানি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করত।
হৃদয়পুর উপত্যকায় একটি প্রাচীন প্রথা ছিল। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে ‘চাঁদের উৎসব’ পালিত হতো। দীর্ঘ এক মাস আত্মশুদ্ধি এবং কৃচ্ছ্রসাধনের পর আকাশে যখন নতুন চাঁদ উঠত, তখন এই উৎসবের আয়োজন করা হতো। অতীতকালে এই দিনে উপত্যকার সব মানুষ একসঙ্গে মিলে আনন্দ করত। কিন্তু প্রাচীর ওঠার পর থেকে সেই প্রথা বদলে গেছে। স্বর্ণচূড়ার মানুষেরা এই দিনটিকে কেবল নতুন পোশাক প্রদর্শন, ক্ষণিকের বাহ্যিক উল্লাস এবং মাত্রাতিরিক্ত ভোজনের একটি উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করল। উৎসবের প্রকৃত উদ্দেশ্য যে আত্মশুদ্ধি এবং আত্মার সাথে আত্মার মিলন, তা তারা সম্পূর্ণ ভুলে গেল। অন্যদিকে ধূলিমাটিতে এই উৎসবের দিনটি নিয়ে আসত এক বুকফাটা হাহাকার। তাদের কাছে উৎসব মানেই ছিল খালি পেট আর শূন্য হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে শিশুদের দীর্ঘশ্বাস।
এবারের চাঁদের উৎসব যখন ঘনিয়ে এল, তখন স্বর্ণচূড়ায় সাজ সাজ রব পড়ে গেল। উপত্যকার সবচেয়ে দামি রেশম দিয়ে পোশাক তৈরি হতে লাগল। অন্যদিকে প্রাচীরের ওপারে ধূলিমাটির আকাশে তখন কেবলই ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্নার ধ্বনি। কিন্তু এই দুই জনপদের মাঝখানে, সেই বিশাল প্রাচীরের ঠিক মাঝবরাবর একটি প্রাচীন এবং পরিত্যক্ত প্রান্তর ছিল। এককালে এটি ছিল উপত্যকার ‘মিলনমাঠ’ বা ঈদগাহ। প্রাচীর নির্মাণের সময় এই প্রান্তরটি দুই ভাগ হয়ে গেলেও, এর ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটি ছোট কুঁড়েঘর টিকে ছিল। সেখানে বাস করতেন ‘ইকবাল’ নামের এক বৃদ্ধ দরবেশ। তিনি ছিলেন হৃদয়পুর উপত্যকার সর্বশেষ বিবেক। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও তাঁর চোখ দুটি ছিল অদ্ভুত রকম উজ্জ্বল। ইকবাল দরবেশ সারা বছর সেই মিলনমাঠের আগাছা পরিষ্কার করতেন আর একটি বিশেষ বীজের যত্ন নিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এই প্রাচীর ভেঙে পড়বে এবং এই বীজ থেকে এমন এক বৃক্ষের জন্ম হবে, যা সমগ্র উপত্যকাকে ছায়া দেবে।
উৎসবের ঠিক আগের দিন বিকেলে স্বর্ণচূড়ার এক ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে ‘রুহান’ দলছুট হয়ে প্রাচীরের কাছাকাছি সেই পরিত্যক্ত প্রান্তরে এসে উপস্থিত হলো। রুহানের গায়ে জড়ানো ছিল বহুমূল্যবান রেশমের পোশাক, গলায় হীরাখচিত হার। কিন্তু তার মনে অদ্ভুত এক শূন্যতা। এত দামি পোশাক আর এত খাবারের আয়োজনও তাকে কেন যেন আনন্দ দিচ্ছিল না। প্রান্তরে এসে সে দেখল, বৃদ্ধ ইকবাল আপন মনে একটি গর্ত খুঁড়ছেন। রুহান কৌতূহলী হয়ে বৃদ্ধের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওহে বৃদ্ধ, কাল আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন। তুমি নতুন পোশাক না কিনে এখানে ধুলোবালির মধ্যে কী করছ?”
বৃদ্ধ ইকবাল মাথা তুলে রুহানের দিকে তাকালেন। তাঁর মুখে এক স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। তিনি অত্যন্ত শান্ত এবং প্রাঞ্জল কণ্ঠে বললেন, “বৎস, তুমি যাকে আনন্দ বলছ, তা তো কেবল ক্ষণিকের উল্লাস। এই যে তোমার গায়ে এত দামি পোশাক, এটি তো কেবল তোমার বাইরের শরীরটাকে ঢেকেছে। তোমার আত্মাকে কি তা স্পর্শ করতে পেরেছে? উৎসব তো কেবল নতুন পোশাক বা ক্ষণিকের উল্লাস নয়। এটি হলো আত্মার সাথে আত্মার এক পবিত্র সংযোগের ডাক।”
রুহান অবাক হয়ে বলল, “আত্মার সংযোগ? সেটি আবার কী? আমরা তো জানি, উৎসব মানেই নিজের পরিবার আর বন্ধুদের নিয়ে ভালো খাওয়া আর আনন্দ করা।”
ইকবাল দরবেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রাচীরের ওপারে ইশারা করে বললেন, “পরিবারের উষ্ণতা থেকে যে আনন্দ জন্ম নেয়, তা যদি সমাজের গভীরে মিশে না যায়, তবে তা কেমন আনন্দ? উৎসব তো উম্মাহর সীমানা পেরিয়ে এক বৃহত্তর মানবতার জয়গান গায়। প্রাচীরের ওপারে তোমারই মতো অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য শিশু আজ অনাহারে ধুঁকছে। তাদের চোখের জল আর হাহাকারকে উপেক্ষা করে তুমি যে আনন্দ করছ, তা তো এক নিরেট স্বার্থপরতা। তুমি কি জানো না, যেদিন পৃথিবীর সব মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবে, সেদিন এই অহংকারের প্রাচীন দেয়ালগুলো ধুলোয় মিশে যাবে?”
বৃদ্ধের কথাগুলো রুহানের হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। সে ধীর পায়ে সেই বিশাল প্রাচীরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। পাথরের গায়ে একটি ছোট ফাটল ছিল। রুহান সেই ফাটল দিয়ে ওপারে তাকাল। সে দেখল, ধূলিমাটির এক জীর্ণ কুঁড়েঘরের সামনে ‘আমিনা’ নামের একটি ছোট মেয়ে বসে আছে। মেয়েটির গায়ে শতচ্ছিন্ন মলিন পোশাক, গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অবিরত অশ্রু। তার মা একটি শূন্য হাঁড়িতে কেবল পানি আর পাথর ফুটিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই দৃশ্য দেখে রুহানের বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেল। তার মনে হলো, তার গায়ের রেশমি পোশাকটি যেন আগুনের মতো তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। গলার হীরার হারটি যেন তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করতে চাইছে। সে বুঝতে পারল, জসিম দরবেশ ঠিকই বলেছেন। মানুষের কান্নার ওপর দাঁড়িয়ে কখনো সত্যিকারের উৎসব হতে পারে না।
রুহান ছুটে ফিরে গেল স্বর্ণচূড়ায়। প্রাসাদের পর প্রাসাদে গিয়ে সে মানুষকে ডাকল। সে বোঝানোর চেষ্টা করল যে, তাদের এই বিলাসী উৎসব অর্থহীন। সে চিৎকার করে বলল, “আমাদের আত্মাকে আমরা বন্দি করে রেখেছি অহংকারের প্রাচীরে! আসুন, আমরা ওপারে যাই। আমাদের আনন্দকে তাদের সাথে ভাগ করে নিই।” কিন্তু অহংকারে অন্ধ স্বর্ণচূড়ার মানুষ রুহানের কথায় হাসল। তারা তাকে পাগল ভেবে তাড়িয়ে দিল। কিন্তু রুহানের এই ডাক একেবারে বৃথা গেল না। স্বর্ণচূড়ার কিছু তরুণ এবং যাদের মনে এখনো সামান্য মানবতা অবশিষ্ট ছিল, তাদের হৃদয়ে রুহানের কথাগুলো গভীর দাগ কেটে গেল।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত ভোর উপস্থিত হলো। চাঁদের উৎসবের সকাল। স্বর্ণচূড়ার আকাশে সুরভিত আতরের সুবাস, আর ধূলিমাটির আকাশে শূন্যতার হাহাকার। কিন্তু আজ রুহান তার দামি রেশমি পোশাক পরল না। সে একটি সাধারণ সুতির পোশাক পরে, খালি পায়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়ল। তার গন্তব্য সেই প্রাচীরের কাছের প্রাচীন মিলনমাঠ। রুহানকে একা হাঁটতে দেখে প্রাসাদের আরও কয়েকজন মানুষ তার পিছু নিল। ধীরে ধীরে এই সংখ্যা বাড়তে লাগল। যারা নিজেদের অন্তরের ডাক শুনতে পেয়েছিল, তারা আজ সব অহংকার ভুলে পথে নেমে এল।
অন্যদিকে, ইকবাল দরবেশ প্রাচীরের ফাটল দিয়ে ধূলিমাটির মানুষদেরও ডাক দিলেন। তিনি বললেন, “এসো, আজ আমরা এক কাতারে দাঁড়াব। আমাদের সম্পদ নেই, কিন্তু আমাদের আত্মা তো পবিত্র।” ধূলিমাটির মানুষেরাও তাদের মলিন পোশাক গায়ে জড়িয়ে সেই প্রান্তরের দিকে এগোতে লাগল।
সূর্য যখন পুরোপুরি উঠল, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো। বিশাল সেই পাথরের প্রাচীরের এপাশে দাঁড়িয়ে আছে স্বর্ণচূড়ার শত শত মানুষ, আর ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে ধূলিমাটির হাজারো মানুষ। মাঝখানে দুর্লঙ্ঘ্য পাথরের দেয়াল। ইকবাল দরবেশ প্রাচীরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সুমধুর কণ্ঠে প্রার্থনার ডাক দিলেন। তাঁর সেই ডাক যেন কোনো সাধারণ শব্দ ছিল না, তা ছিল আত্মার এক গভীর ঐকতান। প্রাচীরের দুই পাশের মানুষ এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শক্তিতে আবিষ্ট হয়ে পড়ল। তারা ভুলে গেল কে ধনী, কে গরিব। কে শোষক, আর কে শোষিত। তারা কেবল মানুষ হিসেবে স্রষ্টার সামনে মাথা নত করার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেল।
ইকবাল দরবেশ যখন প্রার্থনার জন্য হাত তুললেন, দুই পাশের মানুষও একসঙ্গে হাত তুলল। যখন তারা স্রষ্টার মহিমা ঘোষণা করে একসাথে মাথা নত করল, তখন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটতে শুরু করল। মানুষের এই নিঃস্বার্থ এবং অহংকারমুক্ত ঐক্যের স্পন্দনে সেই বিশাল পাথরের প্রাচীরে মৃদু কম্পন শুরু হলো। যুগ যুগ ধরে যে দেয়াল মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে রেখেছিল, আজ স্রষ্টার সামনে মানুষের এই নিখাদ আত্মিক সমর্পণের কাছে তা যেন হার মানতে শুরু করল।
প্রার্থনা শেষে ইকবাল দরবেশ বললেন, “এবার তোমাদের দুই পাশে থাকা ভাইদের দিকে ফিরে তাকাও। তাদের হাতে হাত রাখো।” রুহান তার ডান দিকে ফিরে দেখল, সেখানে প্রাচীরের শক্ত পাথর। কিন্তু সে জানত, ওপারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। রুহান তার হাতটি পাথরের দেয়ালের ওপর রাখল। ওপাশ থেকে ছোট্ট আমিনা এবং তার বাবাও দেয়ালের গায়ে হাত রাখল। যখন প্রাচীরের দুই পাশ থেকে দুটি ভিন্ন শ্রেণীর মানুষের হাত একই বিন্দুতে মিলিত হলো, তখন সেই স্নিগ্ধ স্পর্শের জাদুতে এক অভাবনীয় বিস্ফোরণ ঘটল।
কোনো বারুদ বা বোমার শব্দ নয়, বরং এক অদ্ভুত প্রশান্তির অনুরণনে সেই বিশাল, আকাশচুম্বী অহংকারের প্রাচীরটি নিমিষেই ধুলোয় পরিণত হলো। হ্যাঁ, ইকবাল দরবেশের কথাই সত্য হলো। অহংকার আর ভেদাভেদের প্রাচীন দেয়ালগুলো আজ সত্যিই ধুলোয় মিশে গেল। ধূলিমাটির বাতাসে সেই ধুলো উড়ে গিয়ে উপত্যকাকে একাকার করে দিল। প্রাচীর সরে যাওয়ার পর দুই জনপদের মানুষ যখন সামনাসামনি হলো, তখন এক মুহূর্তের জন্য সেখানে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। স্বর্ণচূড়ার মানুষেরা দেখল তাদেরই ভাইদের কঙ্কালসার দেহ, আর ধূলিমাটির মানুষেরা দেখল অনুশোচনায় অবনত কিছু অশ্রুসিক্ত মুখ।
রুহান ছুটে গিয়ে ছোট্ট আমিনাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। রুহানের দেখাদেখি স্বর্ণচূড়ার মানুষেরাও ছুটে গেল ধূলিমাটির মানুষদের দিকে। তারা একে অপরকে বুকে জড়িয়ে কোলাকুলি করতে লাগল। হাতে হাত রেখে মুসাফাহা করতে লাগল। এই একটিমাত্র স্নিগ্ধ স্পর্শে, এই একটিমাত্র আলিঙ্গনে যেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা যাবতীয় গ্লানি, বিদ্বেষ, ক্ষোভ আর ঘৃণা জাদুর মতো মুছে গেল। স্বর্ণচূড়ার মানুষের চোখের জলে ধুয়ে গেল তাদের অতীত অহংকার, আর ধূলিমাটির মানুষেরা তাদের পরম শত্রুকে ক্ষমা করে দিয়ে প্রমাণ করল তাদের হৃদয়ের বিশালতা। এই মিলন যেন কোনো সাধারণ উৎসবের মিলন ছিল না, এটি ছিল এক শান্ত ও সুন্দর পৃথিবীর জন্য সব মানুষের হৃদয়ের এক মহাসম্মিলিত ঐকতান।
সবাই যখন এই স্বর্গীয় আনন্দে আত্মহারা, তখন জসিম দরবেশ ধীর পায়ে হেঁটে এলেন সেই ধুলোয় মিশে যাওয়া প্রাচীরের ঠিক মাঝখানটিতে। তাঁর হাতে সেই উজ্জ্বল রহস্যময় বীজটি। তিনি সবাইকে ডাক দিয়ে বললেন, “আজ তোমরা যে সাম্য এবং সম্প্রীতির ইতিহাস তৈরি করলে, তা কেবল আজকের এই দিনটির জন্য যেন সীমাবদ্ধ না থাকে। উৎসবের এই আবহে তোমাদের হৃদয়ে আজ যে পবিত্রতার জন্ম হয়েছে, তাকে চিরস্থায়ী করতে হবে।”
এই বলে তিনি রুহান এবং আমিনাকে ডেকে তাদের দুজনের হাত দিয়ে সেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাচীরের ধুলোর মধ্যে বীজটি রোপণ করালেন। বীজটি মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল। উপত্যকার সমস্ত মানুষের সম্মিলিত ভালোবাসার ছোঁয়ায় সেই বীজ থেকে তৎক্ষণাৎ একটি অপূর্ব সুন্দর বৃক্ষ অঙ্কুরিত হলো। দেখতে দেখতে সেই ছোট চারাগাছটি ডালপালা মেলে এক বিশাল মহিরুহে পরিণত হলো। গাছটির প্রতিটি পাতা থেকে এক স্নিগ্ধ, পবিত্র আলো ঠিকরে বের হতে লাগল। এই গাছের নাম দেওয়া হলো ‘নূরতরু’ বা আলোর বৃক্ষ।
সেই আলোর ছটায় উপত্যকার অন্ধকার চিরতরে দূর হয়ে গেল। স্বর্ণচূড়া আর ধূলিমাটি বলে আর কোনো আলাদা জনপদ রইল না, পুরো উপত্যকার নাম হয়ে গেল ‘আলোকনগর’। এরপর থেকে সেই উপত্যকায় আর কেউ কখনো অনাহারে থাকেনি। সম্পদের সুষম বণ্টন এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসায় উপত্যকাটি পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গে পরিণত হলো।







