কাজী জহিরুল ইসলাম
জুলাই সনদের ষষ্ঠ অধ্যায়ের শিরোনাম “ঐকমত্যে উপনীত হওয়া বিষয়সমূহ”। এর অর্থ হচ্ছে ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট একসঙ্গে বসে ২৩টি বৈঠক করার পর সকল রাজনৈতিক দল ও জোট মিলে এই অধ্যায়ে বর্ণিত ৮৪টি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।
তবে অনেক বিষয়ে শতভাগ ঐকমত্য না হলেও সকল বিষয়েই অধিকাংশ দল ও জোট ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছে। ৩৩টি দল ও জোটের নেতাকর্মীরা এক সঙ্গে হয়ে ৮৪টি বিষয়ে শতভাগ ঐকমত্য অর্জন করতে পারবেন, এটি একটি অসম্ভব ব্যাপার। কোথাও না কোথাও কিছু না কিছু দ্বিমত থাকবেই।
যেসব বিষয়ে দলগুলো তাদের আপত্তি জানিয়েছে সেগুলো সেই দলের নাম উল্লেখ করে নোট অব ডিসেন্ট আকারে এই দলিলে লেখা আছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো প্রয়োজন হলে দেশবাসী আপত্তিগুলো দেখতে পারে, রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এইসব আপত্তি সনদ বাস্তবায়নে কোনো ভূমিকা না রাখলেও, এগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে।
নোট অব ডিসেন্টের অর্থ এই নয় যে এই বিষয়গুলো অনুমোদিত হয়নি। সনদের ভাষা এতোটাই দলগুলোর অনুকূলে, এবং জনবান্ধব, যে নোট অব ডিসেন্ট প্রসঙ্গে বলা আছে, “কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে সেইমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।”
এই কথার অর্থ কী? একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করি। উদাহরণ হিসেবে ৮৪টি সিদ্ধান্তের ১১ নম্বর সিদ্ধান্তটিকে নিই। এখানে বলা আছে “রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়নের লক্ষ্যে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮ (৩)-এর সংশোধনী আনয়ন করা, যাতে কারো পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ার বলে রাষ্ট্রপতি নিম্নলিখিত পদে নিয়োগ প্রদান করতে পারেন: (১) জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, (২) তথ্য কমিশনের প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনারগণ, (৩) বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, (৪) আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, (৫) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এবং (৬) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ।”
বিএনপিসহ ৯টি দল এই সিদ্ধান্তে আংশিক আপত্তি জানিয়েছে, তারা ৫ ও ৬ নম্বরে বর্ণিত ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দিতে চান না। অন্য ৪ টিতে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
জুলাই সনদের ভাষ্যমতে বিএনপি যদি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই কথা লেখে যে ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাহী বিভাগের প্রধানের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন না।’ এবং এই ইশতেহারের ভিত্তিতে তারা যদি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে তাহলে এই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ তারা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
কী চমৎকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। কোন গণতন্ত্রমনা মানুষ এই রকম সুলিখিত, জনবান্ধন, একটি সনদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে না।
আজকের লেখায় আমি জুলাই সনদ নিয়েই কথা বলবো, তবে তা অন্য একটি বিষয়ে। বিষয়টি জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ সিদ্ধান্তগুলোর দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত, সেটি হচ্ছে ‘বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয়’। বর্তমান সংবিধানের ৬(২)-এ বর্ণিত আছে, ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন’। বিষয়টি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সব মানুষ তো বাঙালি নয়, তাহলে আমরা কী করে সংবিধানে লিখি বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি? এখানে চাকমা, মারমা, মগ, মুরং, সাঁওতালসহ আরো কত জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। সংবিধান তো তাদের অস্বীকার করতে পারে না। যদি অস্বীকার করে তার অর্থ দাঁড়ায় তোমরা এই দেশ থেকে চলে যাও। এর একটি গোপন অর্থও আছে, তোমরা তোমাদের অঞ্চলের স্বাধীনতা ঘোষণা করো, কারণ তোমরা বাংলাদেশের মানুষ নও কিংবা তোমরা যে ভূখণ্ডে বাস করো সেটি বাংলাদেশ নয়।
ভারতের তৈরি করে দেওয়া সংবিধানে বাংলাদেশের মানুষের জাতীয়তা ‘বাঙালি’ লেখার পেছনে একটি দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা ছিল। এর দুটি কারণ, প্রথমত সকল জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ যাতে কোনোদিনও ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে না পারে, যাতে সব সময় একটা জাতিগত সংঘাত এখানে সক্রিয় থাকে। এমন কী পাহাড়ি জনগোষ্ঠী যেন স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একই এথনিসিটির টানে একদিন ভারতের সঙ্গে এপারের বাঙালিরাও যেন একীভূত হওয়ার স্বপ্ন দেখে, যেন বাংলাদেশ একদিন ভারতের বাংলা প্রদেশের অংশ হয়ে যায়।
এই বিভ্রান্তি দূর করে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে জুলাই সনদে সংবিধানের ৬ (২) ধারাটি নিম্নোক্তভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন’।
এটি একটি সঠিক, যুগোপযোগী, আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য ইতিবাচক প্রতিস্থাপন। এর বিরুদ্ধে কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। অথচ কিছু বুদ্ধিহীন কিংবা দেশপ্রেমবর্জিত মানুষ এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধেও কথা বলছে।
আজকের পৃথিবীতে কেউ তার নিজস্ব জাতিগোষ্ঠী বা এথনিক পরিচয় গর্বের সঙ্গে দেয় না। হিটলারের এথনিক ক্লিঞ্জিংয়ের যে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে, এর পরে এই ধরনের এথনিক পরিচয় বিপদজনকই শুধু নয়, রীতিমতো অনেকের কাছে লজ্জারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পৃথিবীর বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়কালে জাতিগত বিদ্বেষ অতঃপর স্বাধীনতার লড়াইয়ে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার বিভিন্ন রাজ্যের ১ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
আফ্রিকার দেশে দেশে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে চলছে রক্তের হোলিখেলা। এমন কী এক গোত্রের লোক অন্য গোত্রের শিশুদের ধরে এনে তাদের আঙুল চিবিয়ে খেয়ে ফেলার খবরও পাওয়া গেছে। হাত, পা কেটে পঙ্গু করার ঘটনা তো লক্ষ লক্ষ ঘটেছে। সিয়েরা লিয়নে, আইভরি কোস্টে, লাইবেরিয়ায়, কঙ্গোতে, সুদানে, মালিতে, অ্যাঙ্গোলায়, রুয়ান্ডায় বহুদিন ধরে এইসব ঘটনা ঘটছে।
রুয়ান্ডার ঘটনার ওপর তো বেশ কিছু বিশ্বখ্যাত সিনেমাও তৈরি হয়েছে। টেরি জর্জের পরিচালনায় নির্মিত এবং ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমাটি সারা দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছে। ১৯৯৪ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৯ জুলাই এই সময়ের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হুতু সম্প্রদায় সংখ্যালঘু তুতসি সম্প্রদায়ের ১০ লক্ষ মানুষ হত্যা করে। এই নির্মম ঘটনাটি ইতিহাসে ‘১০০ দিনে ১ মিলিয়ন মানুষ হত্যা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
জাতিগত বিদ্বেষ এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে অনেকে নিজের স্ত্রীকে, ভাইয়ের স্ত্রীকে তুতসি হবার কারণে জবাই করেছে। প্রতিবেশি বন্ধুর শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে।
সব খারাপ সময়ই এক সময় শেষ হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় ১৯ জুলাই এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থামে। এরপর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট হন সংখ্যালঘু তুতসি সম্প্রদায়ের নেতা পল কাগামে। তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েই ঘোষণা দেন আজ থেকে আমরা কেউ হুতু না, কেউ তুতসি না, আমরা সবাই রুয়ান্ডিজ, এটিই আমাদের জাতীয়তা।
পৃথিবীর নানান দেশে কাজ করতে গিয়ে বহু রুয়ান্ডিজ নারী-পুরুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে।আমি ওদের মুখের দিকে তাকালেই বলে দিতে পারি কে হুতু আর কে তুতসি। সাধারণত তুতসিরা একটু লম্বা, নাক কিছুটা খাড়া, মুখশ্রী ছোটো এবং গোলাকার বা ওভাল। হুতুরা খাটো, চ্যাপ্টা নাক, চৌকোনো মুখ। আমি তো দেখেই চিনে ফেলি, তবু যদি কাউকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি হুতু কিংবা তুমি কি তুতসি? দশবার জিজ্ঞেস করলেও তোতাপাখির শেখানো বুলির মত ওরা জবাব দেবে, আমি রুয়ান্ডিজ। কেউ ভুলেও নিজের জাতিগত পরিচয় দেবে না।
পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশের মানুষই এখন আর নিজের এথনিক পরিচয় দেয় না, অথচ আমরা বাঙালিরা, এখনও নির্লজ্জের মত বলি, আমি গর্বিত বাঙালি।
বাঙালি আমাদের এথনিক পরিচয়, কিন্তু এই পরিচয়ে গর্বিত না হয়ে আমাদের সবাইকে হয়ে উঠতে হবে বাংলাদেশি, গড়ে তুলতে হবে ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য, যাতে অন্য কোনো দেশ বা জাতি আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে।
হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১ এপ্রিল ২০২৬







