শান্তা মারিয়া
প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূলকে প্রকম্পিত করেছিল স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে দাসবিদ্রোহ। সেসময় ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে শক্তিমান নেতা গ্লাডিয়েটর স্পার্টাকাস ঘোষণা করেছিলেন মানবতার জয়। তিনি মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সাহিত্য জগতের পদলেহী, চাটুকার, পদক-সম্মাননার পিছনে ধাবমান, ক্ষমতার আশপাশে ঘোরাঘুরি করা উচ্ছিষ্টভোগী সাহিত্যিকদের ভিড়ে এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম এবং মাথা উঁচু করে চলা মেরুদণ্ডধারী কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ যিনি অবলীলায় উচ্চারণ করেন
‘স্পার্টাকাস, এ শতকে কোন ক্রীতদাস নেই
সকলেই চাকরিজীবী
চাকরিজীবীদের কোন স্পার্টাকাস নেই
চাকরিজীবীদের হাত ও কলমের মাঝে তৃতীয় পুরুষ নেইা’
( কাব্যগ্রন্থ: চাকরিজীবীদের কোন স্পার্টসকাস নেই)
প্রবল আত্মসম্মান সম্পন্ন এবং সাহসী এই কবি কোন পদপদবী ও ক্ষমতার ধার ধারেন না।
কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ সত্তর দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। এটি হলো প্রচলিত মূল্যায়ন। কিন্তু আমার কাছে এই দশকের বিভাজন পদ্ধতি পছন্দনীয় নয়। আমি মনে করি জাহাঙ্গীর ফিরোজ বাংলা ভাষার একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবি। তাঁর কবিতায় বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর সকলের চেয়ে আলাদা। তিনি যেমন, কবিতায় সমাজসচেতন তেমনি চিরকালীন।
জাহাঙ্গীর ফিরোজের সঙ্গে আমার পরিচয় ( বলা ভালো আমার ও শাহিনের পরিচয়) নব্বই দশকের শেষ প্রান্তে। প্রথম পরিচয়ে তিনি আমাদের মুগ্ধ করেন তাঁর প্রাণখোলা আচরণে। তিনি এমন একজন মানুষ যিনি অত্যন্ত সাদাসিধে, আন্তরিক, হৃদয়-অনুসারী। নজরুলের সেই অমর পংক্তি যেন দেহ ধারণ করেছে ‘আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা, করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা।’
অতি দ্রুত তিনি আমাদের আপন হয়ে ওঠেন। তিনি আমার অগ্রজ কবি। প্রকৃতপক্ষেই বড়ভাই। তবে তাঁর সঙ্গে আমরা একদম সহজ বন্ধুর মতো। কত স্মৃতিই না তাঁর সঙ্গে। সোনার গাঁওয়ে লোকজ মেলার চত্বরে, মধুপুরের অরণ্যে পড়ন্ত বিকেলের আলোয়, কলকাতার নন্দনে সন্ধ্যায়, হলদিয়ায় হলদি নদীর তীরে সূর্যাস্তের বিভায়, টাঙ্গাইলে ভোরের আলোয় ঘাসের বুকে শিশিরের স্নিগ্ধতায়, কত কবিতা, আড্ডা এমনকি মতভেদ। এখনও ঢাকায় ফিরেই আমি প্রেসক্লাবে প্রথমেই যাঁকে খুঁজি, যাঁর সঙ্গে সবচেয়ে প্রাণখুলে কথা বলি তিনি কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ—আমাদের অতি আপন শেলীভাই। হ্যা, কবি পি. বি. শেলীর নামে তাঁর ডাকনাম। একজন কবির নামে যখন ছেলেটির নাম রেখেছিলেন বাবা মা, তখন তাঁরা নিশ্চয়ই আশা করেছিলেন সে কবি হবে। সে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। এমন সার্থক ডাকনাম আমি খুব কম দেখেছি।
কবি শেলীর মতোই আমাদের কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ উদ্দাম, প্রাণশক্তিময় এবং আপাদমস্তক কবি। তিনি যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন,
‘পৃথিবীর সহোদর আমি পৃথিবী আমার
কেন এই পাসপোর্ট কাঁটাতার কাঁটাতার খেলা
পৃথিবীর আমার আমি হেঁটে যাব
পৃথিবীর আমার আমি খুঁজে খুঁজে কুমারী জমিন নেব
পৃথিবী আমার আমি হেঁটে যাব’
( কাব্যগ্রন্থ: বদ্ধ মাতাল রোদে)
তখন শ্রোতা দর্শকরা প্রবল আবেগে কম্পিত হয়। এমন আন্তর্জাতিক উচ্চারণ যে কোন বুদ্ধিমান ও হৃদয়বান মানুষকে আলোড়িত করে।
কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজের কবিতায় এই আন্তর্জাতিক বোধ সেই সঙ্গে সমকালীন সমাজের চিত্র তুলে ধরার কাব্য-উচ্চারণ বাংলা কবিতার জগতে নিঃসন্দেহে তাঁকে স্থাপন করেছে ভিন্ন এক উচ্চতায়।
চলুন একনজরে দেখে নিই তাঁর কয়েকটি কবিতার বইয়ের নাম। : ‘বদ্ধ মাতাল রোদে’, ‘যে ছিল প্রাণের জরুরি’, ‘চাকরিজীবীদের কোন স্পার্টাকাস নেই’, ‘লাললের পাখি উড়ে যায়’, ‘মৌরি বনের বাতাস’, ‘সাগরের গর্জন থেকে নুন রক্তে আসিল’, ‘সন্ন্যাসীর বাঁশির আগুন’, ‘ধাঁধাময় জগৎ সংসার’, ‘ছেঁড়া টুকরো মেঘ’ এবং কবিতা সমগ্র।
তাঁর জন্ম ৬ এপ্রিল ১৯৫৫ সালে। চৈত্রের তীব্র দাহ এবং বসন্তের মাতাল হাওয়া দুটোই তাঁর কবিতায় এবং ব্যক্তিত্বে রয়েছে।
একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করি। কবির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা। কবিপত্নী শিরীন আখতারকে আমি ভাবী ডাকি। ভাবী একজন অত্যন্ত গুণী ও অসাধারণ মানুষ। এই দম্পতির ছেলে সাদমান এবং মেয়ে কঙ্কাবতী ( ভালোনাম নাবিলা) আমাকে ফুপ্পি বলে। প্রতিবছর প্রেসক্লাবের পিকনিকে আমরা একসঙ্গে খুব চমৎকার সময় কাটাই। আমি, শাহিন এবং আমাদের ছেলে অর্ণ এই পরিবারের আত্মীয়ের মতো। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও যে মানুষ আত্মীয় হয়ে উঠতে পারে আমরা এর প্রকৃত উদাহরণ। যে জন্য এত কথা বললাম, এখন সেটি বলি। ঢাকার বাইরে গেলে অনেক সময়ই বেহিসাবী ও অভিমানী শেলীভাইকে শাসনের দায়িত্ব বোন হিসেবে আমি পালন করি। সেজন্য জাহাঙ্গীর ভাই আমার উপরে রাগ করেছেন অনেকবার। তবে এইসব রাগারাগিকে আমি ধর্তব্য বলে মনে করি না। জানি যে, কয়েকদিন পর আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। অনেকবার তাঁকে রীতিমতো ধমক দিতে হয়েছে। এই লেখার মাধ্যমে সেজন্য জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। সেই সঙ্গে এটিও জানিয়ে রাখছি, প্রয়োজন হলে আবারও এমনটি করবো।
ফিরে আসি তাঁর কবিতার প্রসঙ্গে। ‘বদ্ধ মাতাল রোদে’ দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু। আমার কাছে তাঁর ‘যে ছিল প্রাণের জরুরি’ বইটি সবচেয়ে প্রিয়। এমনকি প্রবাসেও আমি এই বই থেকে মাঝেমাঝে কবিতা পড়ি। ‘যেটুকু আকাশ ছিল বুকে, তার সবটুকু জুড়ে লিখেছি তোমার নাম’ এই চরণটি স্মৃতি থেকে লিখলাম। তাঁর অনেক কবিতাই আমার মনের ভিতর দাগ কেটে আছে। অনেক কবিতা রচনার প্রেক্ষাপট জানি। সেগুলো মধুর স্মৃতি।
তাঁর কবিতায় আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া মিলেছে গভীর দার্শনিক অনুভবের সঙ্গে। ‘লালনের পাখি উড়ে যায়’ থেকে এই বাঁকবদল আমার চোখে পড়েছে। গম্ভীর এক বিষন্ন সুর সৃষ্টি করছেন তিনি। এই কাব্যজগতটি অন্যভুবনের জানালাকে উন্মোচন করছে। জাহাঙ্গীর ফিরোজের কাব্যজগৎ গভীর আত্মপোলব্ধিতে পূর্ণ। সেই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শাণিত। এখানেই তিনি আন্তর্জাতিক হয়েও একান্ত বাংলার কবি।
৬ এপ্রিল তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানাই, দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি। কামনা করি সৃষ্টিশীলতার ভুবনে তাঁর সমৃদ্ধ অভিযাত্রা। শতবছর পরমায়ু হোক আর বাংলা কবিতার জগতে আপনি অমর হোন শেলীভাই। অশেষ শ্রদ্ধা রইল। শুভ জন্মদিন।







