শাহানা সিরাজী
বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষার একজন ব্যাপকভাবে আলোচিত শক্তিমান কবি ও প্রাবন্ধিক আমিনুল ইসলামের কবিতা নিয়ে গবেষক-কবি মতিন বৈরাগী ‘কাঠামোবাদী তত্ত্বে আমিনুল ইসলামের কবিতা’ শিরোনামে একখানি তাত্ত্বিক আলোচনা বা সমালোচনামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন । মতিন বৈরাগী একজন শক্তিমান সাহিত্য সমালোচক, সমাজ চিন্তক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কবি। তিনি বাম ঘরানার অন্তর্ভুক্ত। তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের রচয়িতা।
‘কাঠামোবাদী তত্ত্বে আমিনুল ইসলামের কবিতা’ বইটি হাতে এসেছে কয়েকদিন আগে। বইটির নাম দেখেই চিন্তা করলাম ভিন্ন আঙ্গিকে কবির কবিতাকে উপস্থাপন করেছেন কবি মতিন বৈরাগী। কাঠামোবাদী তত্ত্বে শব্দ হলো প্রতীক। কবিতায় শব্দের প্রতীক (Sign) ব্যবহার আক্ষরিক অর্থের বাইরে প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়। কাঠামোবাদী তত্ত্বে ‘চিহ্ন’ (Sign) ব্যবহারের বিষয়টি বেশ মজার এবং অনেকটা কোড ডিকোড করার মতো। এটি মূলত ভাষাবিজ্ঞানী ফার্দিনান্দ দ্য সস্যুর-এর চিন্তাধারা থেকে এসেছে। গ্রন্থটিতে চিহ্ন (Sign), বাইনারি অপজিশন (Binary Opposition), উত্তর-কাঠামোবাদ (Post-structuralism),ব্যক্তি-বিলোপ (Depersonalization), ডিকনস্ট্রাকশন (Deconstruction), ব্যক্তিগত বনাম শৈল্পিক: ‘লেখকের মৃত্যু’ (Death of the Author), মেটামডার্ন বা আধিবিদ্যক অবস্থান, আন্তঃগ্রন্থিকতা (Intertextuality), বিশ্বায়ন (Globalization) এবং নব্য-উপনিবেশবাদের (Neo-colonialism), নিউ-হিস্টোরিসিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি (New Historicist view ), পরাবাস্তব চিত্রকল্প, প্রাচ্যবাদ, বাখতিনের পলিফোনি, অর্থের চূড়ান্ত অনুপস্থিতি, মানবমনের কাঠামো, আদর্শ বনাম বাস্তবতা, শিল্প বনাম ক্ষমতা, স্থানীয়তা বনাম বৈশ্বিকতা, সেমিওটিক ডোমেন, ট্রেস, হাইমেন, বিজ্ঞানচেতনা, উত্তরআধুনিকতা, প্রাচ্যবাদ, মাতৃভাষা ও প্রাক্ চেতনা, প্যারাডাইগমেটিক ভাষ্য, সিন্ট্যাগম্যাটিক কবিতা, অস্তিত্ববাদী বিদ্রোহ, হাইব্রিডিটি বা সংকরায়ণ, অ্যাবসার্ডিজম, হাইপার রিয়ালিটি প্রভৃতি ধারণা-মতবাদ আলোচনায় গতিনিয়ন্ত্রণাকারী ভূমিকা পালন করেছে। প্রসঙ্গক্রমে অনিবার্যভাবে এসেছে প্লেটো, কার্ল মার্কস, জ্যাক দেরিদা, আলবেয়ার কামু, বাখতিন, আস্তোনিও গ্রামশি, নীৎশে, লু্ই আলথুসার, মিশেল ফুকো, সিগমন্ড ফ্রয়েড, কার্ল গুস্তাফ ইয়ং, এডওয়ার্ড সাঈদ, ফ্রাঞ্জো ফানন, ক্রিস্টোফার কডওয়েল, ক্লোদ লেভি স্ত্রাউস, নোয়াম চমস্কি, হোমি কে. ভাভা, জুলিয়া ক্রিস্তেভা, মার্টিন হাইডেগার, বদ্রিলার, লাঁকা, জোসেফ স্টালিন, নেপোলিয়ান, আলবার্ট আইনস্টাইন স্টেফিন হকিং, হাসনাত আবদুল হাই, তপোধীর ভট্টাচার্য প্রমুখ চিন্তাবিদ-লেখকে নাম ও অভিমত।
গ্রন্থকার মতিন বৈরাগী কবি আমিনুল ইসলামের কবিতাকে কাঠামোবাদী (Structuralist), উত্তর-কাঠামোবাদী এবং নিউ-হিস্টোরিসিস্ট (New Historicist) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, আমিনুল ইসলামের কবিতা কেবল বিনোদনের জন্য নয়, বরং এর গভীরে সমাজ, রাষ্ট্র এবং ইতিহাসের নানা স্বর ও স্তর মিশে আছে। গ্রন্থটির শুরুরতেই আছে অধ্যাপক ড. এলহাম হোসেনর লেখা একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ভূমিকা। ভূমিকায় মূলত আমিনুল ইসলামের কবিতার একটি গভীর তাত্ত্বিক পাঠ তুলে ধরা হয়েছে যেখানে সমকালীন বিশ্ব রাজনীতি, সমাজকাঠামো, এবং মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে কবিতার আলোকে বিশ্লেষিত হয়েছে। তিনি মতিন বৈরাগীর বইটির অনন্যতা ও সাহিত্যিক ঐশ্বর্য নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিমত দান করেছেন। ভূমিকাটি পড়লে গ্রন্থটির সার-সংক্ষেপ প্রায় জানা হয়ে যায়।
গ্রন্থটিতে মতিন বৈরাগী গ্রন্থটিতে আমিনুল ইসলামের ৭০/৭২টি কবিতা বেছে নিয়ে নিয়ে আলোচনা করেছেন। উপরে কবিতা দিয়ে তার নিচে কবিতাটির বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন যোগ করা হয়েছে। আলোচনায় শব্দ ব্যবহারের অভিনবত্ব ও অনন্যতা এবং কবিতায় ব্যবহৃত পরস্পর বিপরীতধর্মী শব্দ / প্রত্যয়, — কাঠামোবাদে যাকে বলা হয় বাইনারি, তা শনাক্ত করার পর এই শাব্দিক বা প্রত্যয়গত বৈপরীত্ব কবিতায় কী ধরনের অর্থব্যঞ্জনা ও শৈল্পিক সুষমা সৃষ্টি করেছে তার নিরুপন করা হয়েছে। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প এসবের প্রসঙ্গ এসেছে মাঝে মাঝে সেগুলো মুখ্য বিবেচনার বাইরে থেকেছে।
‘কাঠামোবাদী তত্ত্বে আমিনুল ইসলামের কবিতা’ গ্রন্থটিতে প্রচলিত ইউরোপীয় পুঁজিবাদী সাহিত্যত্ত্বের প্রায় বাইরে গিয়ে কবিতা পাঠের ও বিচারের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহৃত হয়েছে। আলোচনায় জোর দেওয়া হয়েছে যে, কবিতার প্রতিটি শব্দের পেছনে বিশেষ অর্থ ও ব্যঞ্জনা থাকে। কবিতা কখনো ইতিহাসের কাঠামোয়, কখনো মনস্তাত্ত্বিক বা নৈতিক বিবেচনায় পাঠ করতে হয়। লেখক প্রথাগত বা প্রচলিত ইউরোপীয় আধুনিক পুঁজিবাদী সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আধুনিক কিন্তু সাম্যবাদ বা বামপন্থা ঘেঁষা তাত্ত্বিক লেন্স ব্যবহার করে কবিতার ব্যবচ্ছেদ করেছেন। আমিনুল ইসলামের কবিতায় উদ্ভাসিত আধুনিক নগরজীবন, বিশ্বায়ন (Globalization) এবং নব্য-উপনিবেশবাদের (Neo-colonialism) প্রভৃতির নেতিবাচক দিকগুলো আলোচনায় উঠে এসেছে। তাঁর কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে দেখানো হয়েছে কীভাবে মানুষ প্রযুক্তির ভিড়ে একা হয়ে যাচ্ছে, কীভাবে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি (যেমন: লালন, হাছন রাজা) হারিয়ে যাচ্ছে এবং মানুষ কীভাবে ‘বাজারের পণ্যে’ পরিণত হচ্ছে! বইটিতে ক্ষমতার কাঠামো ও প্রতিবাদ নিয়ে আলোচনা এসেছে। মিশেল ফুকো ও এডওয়ার্ড সাঈদের তত্ত্বের রেশ ধরে এখানে দেখানো হয়েছে যে, সাহিত্য ও জ্ঞান কীভাবে পুঁজিবাদ নির্ভর ক্ষমতার আজ্ঞাবহ হতে পারে। আমিনুল ইসলামের কবিতা সেই ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শৈল্পিক ভাষ্য হিসেবে কাজ করে। তাঁর কবিতা সমাজের অনিয়ম ও স্থবিরতাকে ভাঙতে চায় কিন্তু সেটা রাজনৈতিক স্লোগানের মতো উচ্চকণ্ঠ নয়। আমিনুল ইসলামের কবিতায় ফুটে ওঠা অস্তিত্ব সংকট ও বিচ্ছিন্নতা নিয়ে সূক্ষ্ণ আলোচনা করেছেন মতিন বৈরাগী। কবিতায় প্রতিফলিত মাধ্যমে সমকালীন মানুষের অস্তিত্বের সংকট, একাকিত্ব এবং সাইবার জগতের প্রভাবে মানুষের মধ্যকার প্রকৃত যোগাযোগের অভাব সম্পর্কিত দিকগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। লেখক বলতে চেয়েছেন, আমিনুল ইসলামের কবিতা সময় সচেতন এবং তা পাঠকের মনে সমাজ ও সংস্কৃতির স্পন্দন অনুভব করতে সাহায্য করে। কাঠামোবাদ ও উত্তর-কাঠামোবাদের আলোকেই তিনি এসব শনাক্ত করেছেন। তাত্ত্বিক কাঠামোর ব্যাপকতা প্রসঙ্গে মতিন বৈরাগী তাঁর এই বিশ্লেষণে বিশ্বখ্যাত দার্শনিক ও চিন্তকদের তত্ত্ব ব্যবহার করেছেন: জাক লাঁকা: অবচেতন মন ও ভাষার কাঠামো বিশ্লেষণে। আলবেয়ার কামু: মহাজাগতিক বিচ্ছিন্নতার ধারণা ব্যাখ্যায়। জুলিয়া ক্রিস্তোভা: আন্তঃগ্রন্থিকতা (Intertextuality) বা কবিতার মধ্যকার বহু স্বরের মেলবন্ধন দেখাতে। নীৎশে: ‘উইল টু পাওয়ার’ বা মানুষের প্রভুত্ব অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বিশ্লেষণে। এ ছাড়াও মার্কসবাদ, দেরিদা, এডওয়ার্ড সাঈদ এবং মিশেল ফুকোর তত্ত্বের আলোকে আমিনুল ইসলামের কবিতাকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে।তিনি আমিনুল ইসলামের ‘অনাবিস্কৃত’ এবং ‘হে শ্যামাঙ্গী অধ্যাপিকা’ শীর্ষক দুটি কবিতার আলোচনায় মন্ব্য করেছেন: “আমিনুল’র এই দু’টি কবিতা উত্তর-কাঠামোবাদ ও উত্তর-উপনিবেশবাদের এক অনন্য সংশ্লেষণ ঘটায়। ‘অনাবিস্কৃত’ উপনিবেশ-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত সংকটকে ভাষার অস্থিরতার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে। অন্যদিকে, ‘হে শ্যামাঙ্গী অধ্যাপিকা’ সাংস্কৃতিক সংকরতা, জ্ঞানভিত্তির প্রশ্ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকতার মাধ্যমে উপনিবেশ-উত্তর পরিচয় পুনর্গঠন করেছে। কবিতাটি আধুনিক বাংলা কবিতায় বিশ্বায়ন, ক্ষমতা ও পরিচয়ের জটিল সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। এখানে কবির কণ্ঠে এক বুদ্ধিদীপ্ত প্রেমাবেগ। অধ্যাপিকার সৌন্দর্য ও জ্ঞান, দুই-ই প্রেমের উৎস। কবিতায় বাইনারি শব্দের ব্যবহার জ্ঞান বনাম কামনা, বৈদগ্ধ/ কৈশোরের বাসনা, বাস্তর বনাম কল্পনা, গ্রিক মিশরীয় মিথ যুক্ত যেমন নেফারতিতি, বোদলেয়ার-কীটস-এলিয়টের নামকরণ প্রেমের নন্দনতত্ত্বকে বিশ্বসাহিত্বের সঙ্গে মিশিয়েছে।”(পৃষ্ঠা: ১৩২)
গ্রন্থটিতে মেটামডার্ন বা আধিবিদ্যক কবি হিসেবে আমিনুল ইসলাম আলোচনায় আমিনুল ইসলামকে একজন ‘মেটামডার্ন’ কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কবিতা নির্মাণ করেন। তাঁর কবিতায় অতীত কখনো মৃত নয়, বরং তা বর্তমানকে স্পর্শ করে ভবিষ্যৎ নির্মাণের রসদ যোগায়। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত আবেগকে কবিতার ক্যানভাসের বাইরে রেখে এক ধরনের ‘ডিপারসনালাইজেশন’ (Depersonalization) তৈরি করেন।বইটিতে আমিনুল ইসলামের কবিতার অলোচানায় এনে দেখানো হয়েছে যে, বর্তমান বিশ্ব ‘কানেক্টিভিটি’ বা যোগাযোগের কথা বললেও মানুষ আসলে এক গভীর ‘বিচ্ছিন্নতার কৃষ্ণগহ্বরে’ হারিয়ে যাচ্ছে। সাইবার প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকতা মানুষকে একটি ‘পোস্ট-হিউম্যান’ বা উত্তর-মানবিক জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে মানুষের আবেগ ও অনুভূতিগুলো যান্ত্রিকতায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গ্রন্থটিতে পুঁজিবাদের প্রভাব ও মানবজীবনের গন্তব্যহীনতা গুরুত্বপূর্ণ অবজারভেশন আছে । কারণ আমিনুল পুঁজিবাদ বিরোধী-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী- একজন কবি। তিনি চরম বৈষয়িকা ও ইতর ভোগবিলাসেরও বিপক্ষে কবিতা লিখেছেন। পুঁজিবাদ মানুষের সৃজনশীলতাকে হ্যাক করছে এবং মানুষকে বাজারে পরিণত করছে। আমিনুল ইসলামের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন যে, মানুষ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সময় ফুরিয়ে ফেলার আশঙ্কায় এক অনিয়ন্ত্রিত দৌড়ের মধ্যে আছে। মানুষের পরিচয় আজ বিশ্বায়নের প্রভাবে মিশে গিয়ে এক ‘সংকরায়িত’ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে।
মতির বৈরাগীর আলোচনায় অনন্যতা এখানে যে তিনি কাঠামোবাদ-উত্তর কাঠামোবাদ তত্ত্বকে কেন্দে রেখেই তাঁর যাবতীয় আলোচনা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছন। একইসঙ্গে আলোচনার ভাঁজে ভাঁজে ফাঁকে ফাঁকে আমিনুল ইসলামের কবিমন, তাঁর কবিতার শাশ্বত শৈল্পিক সৌন্দর্য তথা শব্দে, উপমা, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষা, কল্পনান ও বাস্তবের সম্মিলন, ইতিহাস মিথ ও অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংশ্লেষ নির্মাণ প্রভৃতি বিষয়ে ছোট ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন। উদাহরণ স্বরূপ তিনি আমিনুল ইসলামের কাব্যভাষার স্বরূপ নির্ধারণী অভিমতে তিনি বলেছেন: “আমিনুল ইসলামের কাব্যশক্তি অসাধারন। তার কবিতার প্রধান শক্তি হলো পর্যবেকক্ষণী মন এবং বিষয়ের গভীরতা। তিনি সমাজের বিভিন্ন অসংগতিকে কেবল চিহ্নিত শুধু করেন না, বরং তার গভীরে প্রবেশ করে মূল কারণগুলো তুলে ধরেন। তার কাব্যশক্তি অত্যন্ত পরিণত এবং তার নতুনত্বের এই ধারা পাঠককে আকর্ষণ করতে সক্ষম। তিনি কবিতার মাধ্যমে সমাজের মুখোশ উন্মোচন করেন এবং পাঠকের মধ্যে একধরনরে অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি জিজ্ঞাসা তৈরি করেন। তার কবিতার প্রধান নতুনত্বগুলো হলো সমসাময়িকতা এবং বিষয়ের আধুনিকতা। আবার সমসাময়িক চিত্রের মধ্যেই ধারণ করা হয়েছে সর্বকালীন আবেদন রং ও রস। তিনি প্রচলিত প্রেম, প্রকৃতি বা নস্টালজিয়ার বাইরে গিয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে তার কবিতার প্রধান বিষয় করেছেন। তার চিত্রকল্পগুলো প্রচলিত উপমার বাইরে গিয়ে নতুন ব্যঞ্জনা তৈরি করে। ‘সারমেয় লেজ’, ‘দাঁড়িপাল্লায় ওঠা চেয়ার’, ‘কৌটিল্যের ঘুণ’, ‘আকাশের আর্কাইভ’, ‘স্রোতের আঙুল’, ‘রঙিন মুলো’, ‘অভিকর্ষের নাক্ষত্রিক ফিল্ডিং’, ‘অক্সিজেনের বাগান’, ‘জগৎশেঠের নাতি’, ‘স্টুয়ার্ট মিলের মানুষ’, ‘ দোয়েলের রিট পিটিশন’—এ ধরনের শব্দবন্ধগুলো তার নিজস্ব কাব্যিক প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। তিনি প্রচলিত কাব্যিক ভাষা ত্যাগ করে গদ্যময় ও তীক্ষ্ণ ভাষা ব্যবহার করেন, যা পাঠকের কাছে সরাসরি পৌঁছায় এবং ভাবনাকে নাড়িয়ে দেয়।
উত্তর-উপনিবেশিকতা ও উত্তরআধুনিকতার আলোকে আমিনুল ইসলামের এই কবিতাগুলো শুধু মাত্র কাঠামোবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এগুলোর উপনিবেশিক এবং উত্তর-আধুনিক সাহিত্যিক চেতনার এক চমৎকার সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়। এই দুটি তত্ত্বই পশ্চিমা আধিপত্য, ক্ষমতার কাঠামো এবং আধুনিকতার ব্যর্থতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।”( পৃষ্ঠা:১৭৮-১৭৯)
‘কাঠামোবাদী তত্ত্বে আমিনুল ইসলামের কবিতা’ গ্রন্থটিতে মোট ২৩৫টি পৃষ্ঠা আছে। অর্থাৎ গ্রন্থটি মাঝারি আকৃতির। মতিন বৈরাগী নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আমিনুল ইসলামের কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থের মধ্যে নানা মনীষীর মতবাদ স্থান পেয়েছে যার আলোকে মূল আলোচনা সাজানো হয়েছে। কবিতাগুলো নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে আবার কয়েকটি কবিতা মিলিয়ে যে কাব্যপ্রবণতা দাাঁড়ায় সেটাও তুলে ধরা হয়েছে। কোনো কোনো পাঠরে সময় সহজ বলে প্রতীয়মান হয় কিন্তু মতিন বৈরাগী সেই কবিতার সহজতার আড়ালে থাকা ভাবসম্পদ ও নান্দনিক সৌন্দর্য খুঁড়ে তুলেছেন। কবিতায় ভাষার সহজতার আড়ালে কত রহস্যময়তা থাকতে পারে, মতিন বৈরাগীর বিশ্লেষণ ও আলোচনা পাঠে বিস্মিত হতে হয়। গ্রন্থটির অনিঃশেষ গুরুত্বএখানে যে মতিন বৈরাগী সমগ্র আলোচনা শেষে কবি হিসেবে আমিনুল ইসলামের অবস্থান চিহ্নিত করেছেন। অবশ্য গ্রন্থের শুরুতেই একটি তুলনামূলক আলোচনা আছে। সেখানে কবি বিষ্ণু দে, সমর সেন, শামসুর রহমান, আল মাহমুদ প্রমুখ বিখ্যাত কবির মূল কাব্যপ্রবণতার সঙ্গে আমিনুল ইসলামের মূল কাব্যপ্রবণতার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এবং আমিনুল ইসলামের নিজস্বতা ও শক্তিমত্তার স্থানগুলো দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ বলা যেতে পারে দুঃসাহসী কাজ। তিনি গ্রন্থের শেষভাগে উপসংহার শব্দটি ব্যবহার না করেই অনেকটা অনুরূপ ভঙ্গিতে আমিনুল ইসলামের কবিতা সম্পর্কে সমাপ্তিসূচক অভিমত প্রদান করেছেন যা অতীব গুরুত্বপূর্ণ । তিনি লিখেছেন,“আমিনুল ইসলাম কবিতার মাধ্যমে কেবল দৃশ্যমান সত্যই তুলে ধরেননি, বরং তার অন্তরালে থাকা অৃদশ্য কাঠামোকেও উন্মোচন করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন কবিতা শুধুমাত্র নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়, বরং একই সঙ্গে সমাজের অসংগতি ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে আঘাত হানার এক শক্তিশালী শৈল্পিক অস্ত্র। তাঁর কাব্যশৈলীতে হৃদয়াবেগের সঙ্গে জ্ঞান ও বুদ্ধির প্রখরতার যে সুসমন্বয় দেখা যায়, তা তাঁকে একজন সচেতন ও মননশীল কবির আসনে দৃঢ়ভঅবে প্রতিষ্ঠিত করে।”(পৃষ্ঠা: ২৩২)
কবিতার শক্তি দিয়ে বিপ্লব আনা যায় , পুরাতন ধ্যান-ধারণাকে ভেঙে গুড়িয়ে নতুন পৃথিবী গড়া যায়। নজরুলের কবিতায় যেমন করে আমরা পাই ‘লাথি মার ভাঙরে তালা’ অথবা ‘আমি বিদ্রোহী রণক্লান্ত’ ‘আমরা শক্তি আমরা বল’ এর মতো শক্তিশালী কবিতা তেমনই আমিনুল ইসলামের কবিতাও পাই কাঠামোর ভেতর দাঁড়িয়ে কাঠামোর বিরুদ্ধে কঠোর উচ্চারণ-
‘জাতিসংঘের কথা বলছো ? জাতিসংঘ এক দ্রৌপদী যাকে
ঘিরে রয়েছে পারমাণবিক পুরুষাঙ্গ বিশিষ্ট পাঁচ স্বামী’
এতো শক্তিশালী উচ্চারণ বর্তমান সময়ের কবিদের ভেতর দেখা যায় না।
গ্রন্থটির শেষের তিনটি পৃষ্ঠায় তথ্যসূত্র প্রদান করা হয়েছে যা আগ্রহী পাঠকের জন্য উপকারী হতে পারে।
অধ্যাপক ড. এলহাম হোসেন এই গ্রন্থটিকে ‘অমূল্য’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ বাংলা সাহিত্যে একজন কবির কবিতা নিয়ে এমন বিশদ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ খুব একটা দেখা যায় না। তাঁর মতে, বাংলা সাহিত্য সমালোচনার ভাষা সাধারণত খুব সমৃদ্ধ নয়, কিন্তু মতিন বৈরাগী এখানে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন। বইটি কেবল পাঠকদের জন্য নয়, বরং পরবর্তী সময়ের সমালোচকদের জন্যও একটি পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করব বইটি কেবল আমিনুল ইসলামের কবিতার গুণকীর্তন নয়, বরং এটি সমকালীন বিশ্বব্যবস্থা, দর্শন এবং মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে কবিতার আয়নায় দেখার একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা। অধ্যাপক এলহাম হোসেনের ভাষায়, এই গ্রন্থটি কবি আমিনুল ইসলাম এবং সমালোচক মতিন বৈরাগী—উভয়কেই নতুন আলোয় আলোকিত করেছে।
আমি অধ্যাপক ড. এলহাম হোসেন উক্ত অমিভতের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। আমার কাছে গ্রন্থটি অভিনব প্রকৃতির। কাঠামোবাদ তত্ত্বের আলোকে কোনো কবিতার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি আস্ত গ্রন্থ রচনা এর আগে অন্তত আমার চোখে পাড়েনি। ‘কাঠামোবাদী তত্ত্বে আমিনুল ইসলামের কবিতা’ গ্রন্থটি কবিতা রচয়িতা, কাব্যপাঠক এবং কাব্যসমালোচকদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
কাঠামোবাদী তত্ত্বে আমিনুল ইসলামের কবিতা
মতিন বৈরাগী
পুণ্ড্রু প্রকাশন:
কনকর্ড এম্পারিয়াল শপিং কমপ্লেক্স , কাঁটাবন, ঢাকা ১২০৫
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
প্রথম প্রকাশ: ২০২৫
মোট পৃষ্ঠা: ২৩৫
মূল্য: ৬০০/ টাকা
আলোচক
শাহানা সিরাজী
ইন্সট্রাক্টর
পিটিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়া
[কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক]
মুঠোফোন: ০১৫৫২৩২৯৮২৩








পর্যালোচনাটি পড়েছি। ” কাঠামোবাদী তত্ত্বে আমিনুল ইসলামের কবিতা ” নামক বইটির এক অসাধারণ সুন্দর পর্যালোচনা। আলোচক শাহানা সিরাজী একাধারে কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি বইটি নিবিড়ভাবে পাঠের পর গভীর আন্তরিকতার সাথে তাঁর মুল্যায়ন ও অভিমত জ্ঞাপন করেছেন বলে মনে হলো। এই পর্যালোচনা মতিন বৈরাগীর বইটির সংক্ষিপ্ত আকারে যথাযথ মূল্যায়ন। শাহানা সিরাজীকে সাধুবাদ দেওয়া যায়।