প্রচ্ছদগদ্যমানসুর মুজাম্মিলের জীবন, সাধনা ও নীরব প্রস্থান

লিখেছেন : মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন

মানসুর মুজাম্মিলের জীবন, সাধনা ও নীরব প্রস্থান

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন

বাংলা সাহিত্যের নীরব অথচ দীপ্তিমান এক সাধকের বিদায়ে শোকাভিভূত সাহিত্যাঙ্গন। কবি, ছড়াকার ও সংগঠক মানসুর মুজাম্মিল ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল, রোববার ভোর ৪টা ২৭ মিনিটে ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর এই চলে যাওয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং এক গভীর সাংস্কৃতিক ক্ষতি—যার অভিঘাত দীর্ঘদিন অনুভূত হবে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

নব্বই দশকের অগ্নিঝরা সময়ের সাহিত্যচর্চার পরিমণ্ডলে যারা বেড়ে উঠেছেন, তাদের অনেকের মতোই মানসুর মুজাম্মিলের সাহিত্যযাত্রার সূচনা হয়েছিল দৈনিক মিল্লাতের ‘কিশোর কাফেলা’র আড্ডা থেকে। সেই আড্ডা ছিল স্বপ্ন বোনা, শব্দে শব্দে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার এক অনন্য ক্ষেত্র।
এছাড়া খেলাঘর আসর, কচিকাঁচার মেলা, শিশু কল‍্যাণ পরিষদ, বাংলা সাহিত্য পরিষদ কিংবা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ইত্যাদি সাহিত্য সভায় একসাথে অংশ নিতাম । সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ পথচলা, যেখানে তিনি হয়ে ওঠেন আপনজন, সহযোদ্ধা এবং হৃদয়ের খুব কাছের একজন মানুষ।

দৈনিক বাংলা মোড়ের চায়ের আড্ডায় তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রাণের সঞ্চার। ছন্দে ছন্দে কথা বলা, মিষ্টি হাসি আর সহজাত প্রাণবন্ততা তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দিত। কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতায়, বিশেষ করে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর, তিনি ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে যেন শুধু এটুকুই জানিয়ে দিতেন—তিনি এখনও বেঁচে আছেন। এই নীরব উপস্থিতি যেন ছিল এক গভীর অভিমান, এক অব্যক্ত বেদনার ভাষা।

মানসুর মুজাম্মিল ছিলেন আকাশসম হৃদয়ের মানুষ। কঠিন অর্থকষ্টের ভেতর দিয়েও তিনি কখনো কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। তাঁর আত্মসম্মানবোধ ছিল দৃঢ়, অবিচল। অথচ এই সমাজ, যে সমাজ গুণীজনের মূল্যায়নের কথা বলে, সেই সমাজই তাঁর মতো একজন নিবেদিত সাহিত্যিককে যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়েছে—এ এক নির্মম সত্য।

তিনি সমাজের এই অবক্ষয়, এই নীতিহীনতার প্রতি গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ছিলেন। একসময় যে রাজনৈতিক ও সামাজিক শিষ্টাচারের ভেতর দিয়ে গুণীজনদের সম্মান জানানো হতো, সেই সংস্কৃতি আজ প্রায় বিলুপ্ত। আমরা অনেকেই আদর্শের কথা বলি, আদর্শবাদী হওয়ার দাবি করি; কিন্তু বাস্তবতা হলো, আদর্শের সেই বলয় আজ অনেকাংশেই অর্থনৈতিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই বলয়ের ভেতরে থেকেও অনেকেই সুবিধা ভোগ করেন, কিন্তু মানসুর মুজাম্মিলের মতো একজন সংগ্রামী সাহিত্যিক সেই বলয় থেকে ন্যূনতম সহযোগিতাও পেয়েছেন কি না—তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে কাটিয়েছেন। তিলে তিলে অনাদর, অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার ভেতর দিয়ে তিনি বিদায় নিয়েছেন এই পৃথিবী থেকে। এই বাস্তবতা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে—আমরা কি সত্যিই আমাদের গুণীজনদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পেরেছি?

অথচ তাঁর মৃত্যুর পর হয়তো সভা হবে, স্মরণসভা হবে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা হবে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে। কিন্তু জীবদ্দশায় যে মানুষটি নিঃশব্দে অবহেলার শিকার হয়েছেন, তাঁর জন্য সেই আয়োজন কতটা অর্থবহ—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সাহিত্যচর্চায় মানসুর মুজাম্মিল ছিলেন এক নিবেদিত প্রাণ। ছড়াসাহিত্যে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর লেখনী ছিল সহজ, প্রাণবন্ত এবং গভীর মানবিকতায় ভরপুর। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ—‘তাওয়ায় জ্বলা রুটি’, ‘সোনার বরণ মেয়ে’, ‘চাঁদের হাসি’, ‘তাজা খুন’, ‘এক ব্যাগ অফিসার’, ‘হারিয়ে যাবার দিন’, ‘সবার সাথে আছি’, ‘পা চালিয়ে যাও’, ‘দশ আকাশ’ এবং ‘সুগন্ধি গাছের কাছে’—বাংলা সাহিত্যে তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর বহন করে।

একজন ‘পোড়খাওয়া’ জীবনসংগ্রামী হিসেবে তিনি শুধু লেখালেখিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; সংগঠক হিসেবেও কাজ করেছেন নিরলসভাবে। সাহিত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে, নতুনদের অনুপ্রাণিত করতে তিনি ছিলেন সর্বদা সচেষ্ট। তাঁর এই কর্মপ্রবণতা ও দায়বদ্ধতা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার গোড়ান ছাপড়া মসজিদে এবং পরে চাঁদপুরের শাহরাস্তির দশনাপাড়া গ্রামে তাঁকে দাফন করা হয়। শেষ বিদায়ের এই মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন তাঁর পরিবার, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা, যাদের চোখে ছিল গভীর শোকের ছাপ।

মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন তাঁর স্ত্রী, এক পুত্র, এক কন্যা এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী। কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর সৃষ্টিকর্ম, তাঁর মানবিকতা এবং তাঁর জীবনসংগ্রামের গল্পে নিহিত।

মানসুর মুজাম্মিল আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর স্মৃতি, তাঁর শব্দ, তাঁর জীবনবোধ—সবই থেকে যাবে আমাদের ভেতরে। তিনি হয়তো নীরবে চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো, তাঁর জীবনের অসমাপ্ত বেদনা—সেগুলো আমাদের বিবেককে দীর্ঘদিন তাড়িত করবে।

মহান আল্লাহ তাঁর সকল গুনাহ মাফ করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন এবং তাঁর পরিবারকে এই শোক সহ্য করার শক্তি দিন।

…………..
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
প্যারিস, ফ্রান্স।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা