মাহমুদ মেঘ
বাংলাদেশের মানচিত্রে অসংখ্য বীরের রক্ত মিশে আছে। ১৯৫২-এর ভাষা শহীদ থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—প্রতিটি সংগ্রামই আমাদের স্বাধীনতার একেকটি সোপান। কিন্তু ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হারায় এমন এক সন্তানকে, যিনি ছিলেন এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আধুনিক পাহারাদার। শরীফ ওসমান বিন হাদি—কেবল ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী চিন্তক, নির্ভীক বাগ্মী এবং এক আদর্শিক সেনানী। ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর এই মাঘের সকালে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন শহীদ ওসমানের সেই বজ্রকণ্ঠ আজও আমাদের কানে সার্বভৌমত্বের মন্ত্র হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়। তার এই সংক্ষিপ্ত অথচ বৈপ্লবিক জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে হয়।
শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদীর জন্ম ঝালকাঠির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তার বেড়ে ওঠার পেছনে কাজ করেছে এক গভীর নৈতিক ও ধর্মীয় চেতনা। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অনুসন্ধিৎসু এবং পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। তার শৈশব কেটেছে মফস্বলের নির্মল পরিবেশে, যেখানে তিনি এদেশের মানুষের মাটির সাথে থাকা সংগ্রামের রূপটি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। তার পারিবারিক পরিমণ্ডলে ইসলামের ইনসাফভিত্তিক সমাজদর্শনের যে চর্চা ছিল, তাই পরবর্তীতে তার রাজনৈতিক চিন্তাধারায় প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখেন, তখন থেকেই তার ভেতরে এক ধরণের রূপান্তরের শুরু হয়। তিনি কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং বিশ্বরাজনীতির গভীর পাঠ তাকে একজন তুখোড় তার্কিক ও চিন্তক হিসেবে গড়ে তোলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তাকে শিখিয়েছে কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। তিনি যখন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন, তখন তার উদ্দেশ্য ছিল কেবল জীবিকা নয়; বরং একটি সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলা। তিনি ছাত্রদের ক্লাসরুমেও সার্বভৌমত্বের পাঠ দিতেন, যা পরবর্তীতে রাজপথের স্লোগানে পরিণত হয়।
ওসমান হাদির দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল সার্বভৌমত্বের নতুন সংজ্ঞায়ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল তার সীমান্তে কাঁটাতারের বেষ্টনীতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত সেই জাতির মানুষের চিন্তার স্বাধীনতায় নিহিত। তিনি প্রায়ই বলতেন:
“আমরা ১৯৭১ সালে একটি ভূখণ্ড পেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের চিন্তার জগৎটি দীর্ঘকাল ধরে দিল্লির ‘সাংস্কৃতিক কলোনি’ হয়ে ছিল। আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি সুকৌশলে আমাদের শিখিয়েছে যে, কলকাতা আমাদের সংস্কৃতির মাপকাঠি। তারা আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে, দিল্লির আশীর্বাদ ছাড়া এদেশের ক্ষমতা টেকা সম্ভব নয়। কিন্তু চব্বিশের বিপ্লব প্রমাণ করেছে, আমরা কেবল ভূখণ্ডের মুক্তি চাইনি, আমরা আমাদের মনস্তাত্ত্বিক গোলামি থেকে মুক্তি চেয়েছি।”
ওসমান হাদি বিশ্বাস করতেন, সার্বভৌমত্ব মানে হলো যখন এদেশের নীতিনির্ধারণী টেবিলে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ছায়া থাকবে না। তিনি সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ার দাবি তুলতেন এবং একপাক্ষিক ট্রানজিট ও স্বার্থবিরোধী পানিবণ্টন চুক্তির কঠোর বিরোধিতা করতেন। তার মতে, সার্বভৌমত্ব হলো এদেশের মানুষের আত্মপরিচয়ের গর্ব।
তিনি বলতেন, “যে দেশ তার নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলে অন্যের অনুকরণ করে, তার সার্বভৌমত্ব কেবল কাগজে-কলমে থাকে।”
ইনকিলাব মঞ্চের মূল ভিত্তি হিসেবে ‘ইনসাফ’ শব্দটিকে ওসমান হাদি অত্যন্ত দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, সমাজ থেকে ইনসাফ বিদায় নিলেই ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। তার রাজনীতি কোনো বিশেষ দলের লেজুড়বৃত্তি ছিল না, বরং তা ছিল জুলুমের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন প্রতিবাদ। তিনি তাত্ত্বিকভাবে ইনসাফকে দুটি ভাগে ভাগ করতেন—একটি হলো বিচার বিভাগীয় ইনসাফ এবং অন্যটি হলো বন্টনমূলক ইনসাফ।
তিনি বলতেন: “ইনসাফ মানে কেবল অপরাধীর বিচার নয়; ইনসাফ মানে হলো অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই। যদি ইনকিলাব মঞ্চের কেউ অন্যায় করে, তবে তার বিচার সবার আগে হতে হবে—এটাই ইনসাফ। আবার যদি আমাদের ঘোর রাজনৈতিক শত্রুর ওপর কোনো অন্যায় করা হয়, তবে আমরা তার পাশে দাঁড়াবো—সেটাও ইনসাফ। আমরা চাই এমন এক সমাজ, যেখানে বিচারক শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্যের রায় দিতে পারবেন।”
তার এই ইনসাফ তত্ত্বে ‘জুলাই যোদ্ধারা’ ছিল সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য। তিনি মনে করতেন, যারা রাজপথে রক্ত দিয়েছে, তাদের মর্যাদা রক্ষা করাই হলো ইনসাফ কায়েমের প্রথম ধাপ। তিনি হুঁশিয়ার করে বলতেন যে, জুলাইয়ের রক্তে অর্জিত বিপ্লবকে যদি বিশেষ কোনো দলের গদি দখলের হাতিয়ার বানানো হয়, তবে সেটি হবে ইনসাফের সাথে বড় ধরণের বেইমানি।
একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে শরীফ ওসমান হাদি বাংলাদেশের প্রচলিত সংবিধানের যে আইনি ময়নাতদন্ত করেছেন, তা সমকালীন রাজনীতিতে নজিরবিহীন। তিনি মনে করতেন, শেখ হাসিনা এককভাবে দায়ী নন, বরং যে সংবিধান তাকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়েছিল—সেই সংবিধানই ফ্যাসিবাদের মূল আঁতুড়ঘর। তিনি ক্লাসরুমের লেকচার থেকে শুরু করে টকশো পর্যন্ত সব জায়গায় প্রমাণ করতেন যে, ৭২-এর সংবিধানে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা ক্ষমতার ভারসাম্যের কোনো বালাই নেই।
তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট: “৭২-এর সংবিধানটি ছিল মূলত একটি ফ্যাসিবাদী দলিল। এটি প্রধানমন্ত্রীকে এমন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয় যা তাকে একজন ঈশ্বরতুল্য স্বৈরশাসকে পরিণত করে। হাসিনা আইনের বাইরে গিয়ে গুম-খুন করেননি, বরং তিনি আইনকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যাতে তার প্রতিটি অপরাধ ‘আইনি’ সুরক্ষা পায়। এই সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের মতো কালাকানুন আছে, যা সংসদ সদস্যদের নিজেদের বিবেকের বিরুদ্ধে ভোট দিতে বাধ্য করে। সুতরাং, এই পচা-গলা সংবিধান সংশোধন করে কোনো লাভ হবে না। আমাদের প্রয়োজন জুলাই ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে একটি নতুন ‘গণ-সংবিধান’, যেখানে জনগণের সার্বভৌমত্ব হবে প্রশ্নাতীত এবং রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গই স্বৈরাচারী হওয়ার সুযোগ পাবে না।”
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে হুঁশিয়ার করে বলতেন, এই সংবিধান বজায় রেখে নির্বাচন হওয়া মানে হলো কেবল একজন ডিক্টেটরের বদলে আরেকজন ডিক্টেটরকে ক্ষমতায় বসানো। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক রাষ্ট্রকাঠামো, যেখানে বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং আইন বিভাগ একে অপরের পরিপূরক হবে, কিন্তু কেউ কারো ওপর প্রভুত্ব করবে না। তার প্রস্তাবিত ‘নতুন সামাজিক চুক্তি’ ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্র মেরামতের এক বাস্তবধর্মী রূপরেখা।
ওসমান হাদি ছিলেন আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের সবচেয়ে সাহসী ও স্পষ্টভাষী কণ্ঠস্বর। তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং দিল্লির হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য জনমত গড়ে তুলেছিলেন। অনেক বড় বড় রাজনীতিবিদ যখন দিল্লির ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে থাকতেন, তখন ওসমান হাদী সরাসরি দিল্লির পলিসিগুলোর অসারতা তুলে ধরতেন।
তিনি রাজপথে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে বলতেন: “দিল্লির জবান আর ঢাকার জবান কোনোদিন এক হতে পারে না। জুলাইয়ের বিপ্লবের পর আমরা দেখেছি, কীভাবে ভারতীয় মিডিয়া আমাদের এই মহান গণঅভ্যুত্থানকে ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছে। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার কোটি টাকা আজও এদেশের বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে, তারা প্রশাসনে ঘাপটি মেরে বসে সাবোটাজ করছে। তারা চায় এদেশকে অস্থিতিশীল করে আবার দিল্লির পদতলে সঁপে দিতে। কিন্তু তারা জানে না, ২০২৪-এর প্রজন্ম দিল্লির দাসত্ব করতে রাজপথে নামেনি। আমরা এসেছি এদেশের মালিকানা এদেশের মানুষের হাতে ফিরিয়ে দিতে। আমাদের লড়াই কোনো বিশেষ জাতির বিরুদ্ধে নয়, আমাদের লড়াই হলো আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে।”
তিনি মনে করতেন, আধিপত্যবাদ কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকও বটে। তাই তিনি ‘দেশি পণ্য, দেশি ভাষা’ ব্যবহারের ওপর জোর দিতেন। তিনি বলতেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক হতে হবে ‘পিপল টু পিপল’ এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে। একপাক্ষিক ট্রানজিট বা তিস্তার পানির অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে তার আপসহীন অবস্থান তাকে সাধারণ মানুষের কাছে জাতীয় বীরের মর্যাদায় বসিয়েছিল।
শহীদ ও আহতদের বিষয়ে ওসমান হাদি ছিলেন অসম্ভব স্পর্শকাতর। তিনি মনে করতেন, এই রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে দেড় হাজার শহীদের লাশের ওপর এবং হাজার হাজার পঙ্গু মানুষের কান্নার ওপর। জুলাইয়ের শহীদদের ত্যাগের মূল্যায়ন না হওয়াকে তিনি জাতীয় ব্যর্থতা মনে করতেন।
তিনি ব্যথাতুর হৃদয়ে বলতেন: “আজ যখন ক্ষমতার ভাগাভাগি আর সিট ভাগাভাগি নিয়ে বড় বড় দলগুলো ব্যস্ত, তখন আমার সেই ভাইটির কথা কেউ ভাবে না যে নিজের দুই চোখ হারিয়ে চিরতরে অন্ধকার জগতে চলে গেছে। শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক করা মানে তাদের আত্মত্যাগকে উপহাস করা। সরকার যদি শহীদদের পরিবারের পুনর্বাসন করতে না পারে, তবে তাদের এই সচিবালয়ে বসে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। জুলাইয়ের রক্ত সস্তা নয়, এই রক্তই এদেশের নতুন আজাদির ভিত্তিপ্রস্তর। আমরা শহীদ পরিবারের চোখের পানিকে আমাদের লড়াইয়ের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করব।”
তিনি প্রায়ই বলতেন, যারা রাজপথে জীবন দিয়েছে, তারা কোনো পদের জন্য বা মন্ত্রিত্বের জন্য দেয়নি; তারা দিয়েছিল একটি ইনসাফভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য। তার এই মমতা ও দায়বদ্ধতা তাকে ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিটি কর্মীর কাছে একজন ‘বড় ভাই’ এবং ‘অভিভাবক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
ওসমান হাদি বিশ্বাস করতেন, কেবল আবেগ দিয়ে বিপ্লব টেকানো যায় না। একটি স্থায়ী পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন মেধা ও যুক্তিনির্ভর তারুণ্য। তিনি ইনকিলাব মঞ্চের তরুণদের উদ্দেশ্যে প্রায়ই বলতেন যে, রাজপথ দখলের পাশাপাশি লাইব্রেরি ও নলেজ সেন্টারগুলো দখল করাও জরুরি। তার মতে, ফ্যাসিবাদের প্রধান শক্তি হলো ভুল ইতিহাস এবং তথ্য বিকৃতি, যা কেবল পড়াশোনা দিয়েই মোকাবিলা করা সম্ভব।
তিনি অত্যন্ত দূরদর্শীভাবে বলতেন: “তোমরা শুধু মিছিল করলে হবে না, তোমাদের হতে হবে গবেষক। আমাদের ওপর যে জুলুম হয়েছে, যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, তার প্রতিটি মুহূর্ত নথিবদ্ধ করতে হবে। বিশ্ববাসীকে আমাদের লড়াইয়ের গল্প শোনাতে হবে আন্তর্জাতিক ভাষায়। আমরা যদি আমাদের ইতিহাস না লিখি, তবে ঘাতকরাই একদিন তাদের মতো করে ইতিহাস লিখে আমাদের ‘সন্ত্রাসী’ বানিয়ে দেবে। মেধা ও যুক্তি দিয়েই আমরা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করব। জুলাইয়ের বিপ্লবকে একটি একাডেমিক রূপ দেওয়া আমাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।”
তিনি বুটেক্স বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করতেন যেন তারা নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং আর্কাইভ তৈরি করে। তিনি চাইতেন বাংলাদেশের প্রতিটি ছাত্র যেন একেকজন সিপাহসালার হয়ে ওঠে, যারা ডোমেইন-হোস্টিং থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক লবিং পর্যন্ত সব জায়গায় আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যখন আধিপত্যবাদী অপশক্তিগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল, তখন ওসমান হাদী হয়ে উঠেছিলেন তাদের প্রধান টার্গেট। তিনি জানতেন তার জীবন যেকোনো সময় কেড়ে নেওয়া হতে পারে, কিন্তু তার চোখেমুখে ভয়ের লেশমাত্র ছিল না। ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরের রাজপথে গুলিবিদ্ধ হওয়ারা আগে তিনি বলেছিলেন: “শত্রুরা ভাবছে শরীফ ওসমানকে সরিয়ে দিলে ইনকিলাব বৃক্ষ উপড়ে ফেলা যাবে। তারা জানে না, এই বৃক্ষ এখন প্রতিটি তরুণের হৃদয়ে প্রোথিত। আমি যদি মরে যাই, আমার রক্ত এই মাটির প্রতিটি ধূলিকণাকে বিপ্লবী করবে। আমরা আমাদের জীবনকে বাজি রেখেছি এদেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। আমরা নিজেদের জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে হলেও এদেশের মানুষকে জান্নাতের মতো শান্তির এক ইনসাফের রাষ্ট্র উপহার দিয়ে যাব। আমি শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত, তোমরা কি প্রস্তুত? কেয়ামত পর্যন্ত এই জমিনের আজাদ সন্তানেরা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবেই যাবে।”
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার শাহাদাত কেবল একটি মৃত্যু ছিল না, বরং তা ছিল একটি ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার চূড়ান্ত ডাক।
শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদী আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া প্রতিটি শব্দ এখন আমাদের অস্তিত্বের অংশ। তার শাহাদাত পরবর্তী এই সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। তরুণরা এখন কেবল স্লোগান দেয় না, তারা প্রশ্ন করতে শিখেছে। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এখন সাধারণ মানুষও সোচ্চার।
শহীদ ওসমানের লিগ্যাসি আমাদের তিনটি প্রধান শিক্ষা দেয় তা হলো, সাহস, সততা এবং ত্যাগ। আধিপত্যবাদের চোখের দিকে তাকিয়ে ‘না’ বলা, সত্য উচ্চারণে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করা এবং কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর সুবিধাভোগী না হয়ে সর্বদা মজলুমের পক্ষ নেওয়ার সাথে সাথে নিজের ক্যারিয়ার বা জীবনের চেয়েও দেশের সার্বভৌমত্বকে বড় করে দেখা।
তিনি প্রায়ই বলতেন, “ব্যক্তি ওসমান নশ্বর, কিন্তু ওসমানের চিন্তা অবিনশ্বর।” আজ বাংলাদেশের প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি ক্যাম্পাসে শহীদ শরীফ ওসমানের সেই তেজস্বী কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়। তিনি এখন আর কোনো বিশেষ সংগঠনের মুখপাত্র নন, তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ‘গ্লোবাল আইকন’।
শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদী কেবল একটি নাম নয়, এটি একটি অসমাপ্ত বিপ্লবের নাম। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে কোনো বিদেশি প্রভুর হুকুম চলবে না, যেখানে দরিদ্র মানুষ আদালতের বারান্দায় ইনসাফের জন্য হাহাকার করবে না এবং যেখানে তারুণ্যের জয়গান গাওয়া হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। তার শাহাদাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতার চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। ২০২৬ সালের এই মাঘের সকালে দাঁড়িয়ে আমরা শপথ নিচ্ছি—শহীদ ওসমানের সেই ‘সার্বভৌম বাংলাদেশ’ ও ‘ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র’ আমরা গড়বই গড়ব। তার রক্তে ভেজা পথই হবে আমাদের আগামীর মানচিত্র।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ!







