সুপ্রিয় সাহা
আর্টের একটা ইনহেরিটেড সমস্যা আছে। আর্ট লাক্সারির সাথে প্রকটভাবে জড়িত। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অবসর না পেলে আর্টের সৃষ্টি কখনো হতো কি-না তা নিয়ে সন্দেহ করা যায়। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই আর্ট এই লাক্সারির বোঝাটি বয়ে আসছে। আর একটু পরে, যখন আর্ট গুহা থেকে রাজরাজাদের দরবারে প্রবেশ করতে পারলো, তখন এর শ্রেণিচরিত্র এবং রাজনৈতিক ঝোঁক স্পষ্ট হলো। ‘রাজশিল্পী’ গোত্র তৈরি হলো। এর ট্রেস কিন্তু এখনো পাই। তবুও ইতিহাসের নানান বাঁকে, নানান বিপ্লবে, গণমানুষের উত্থানে আর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এটা তখনই সম্ভব হয় যখন আর্ট দরবার হল থেকে বেরিয়ে রাজপথে নামে।
তেমনই এক ঘটনা আমরা দেখলাম আমাদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। দেবাশিস চক্রবর্তীর আর্ট এই অভ্যুত্থানে ব্যবহৃত হয়েছে, অনুপ্রেরণা দিয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে পথ দেখিয়েছে এবং জাতীয় ঐক্য সংহত করেছে। লক্ষ কোটি টাকা লুট করা আওয়ামী লীগের গ্রাফিকস টিম ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোপরি, গণমানুষের হয়ে উঠেছে দেবাশিসের আর্ট। বলে রাখা ভালো যে, তাঁর শিল্পকর্ম ‘আর্ট’ হিসেবে কালোত্তীর্ণ কি-না বা তাঁর রাজনৈতিক অভিলাষের ওকালতি: কোনোটাই এ লেখার মধ্যে নেই।
আমরা জানি, রেজিম যত কর্তৃত্বপরায়ণ ও সর্বগ্রাসী হয়, সমালোচকদের ততই ক্ষুরধার হওয়া লাগে। সরাসরি যখন কোনো কিছু নিয়ে প্রতিবাদ করা যায় না, তখন সূক্ষ্মভাবে নানান ফর্মে (যেমন কৌতুক ইত্যাদি) মানুষ তার ভাব ব্যক্ত করে। বিগত রেজিমেও এরকম প্রতিবাদ– শিল্পীরা জারি রেখেছিলেন। কিন্তু সকলের মধ্যে দেবাশিসই কেন শাইন করলেন তার কিছু কারণ তালাশ করার চেষ্টা করেছি।
দেবাশিসের আর্টগুলো দেখলে দেখবেন যে উনি তিনটি রঙের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছেন। এতে হরেকপ্রকার রঙ দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায় না। সেই তিনটি রঙ– কালো, লাল, সোনালি– বেশ অর্থবহ। কালোকে যদি আমরা বিদ্যমান অপশাসনের প্রতীক (ইউরোপীয় আলোকায়ন মতে); লালকে রক্ত, বিদ্রোহ-বিপ্লবের প্রতীক এবং সোনালিকে আশা ও ভবিষ্যতের প্রতীক ভেবে নিই তবে এরকম একটি অর্থ দাঁড় করানো যায়– বিদ্যমান অপশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, দরকারে রক্ত দিয়ে, সোনালি ভবিষ্যত ছিনিয়ে আনতে হবে। ব্যবহৃত রঙ নিজেই কথা বলা শুরু করে এক্ষেত্রে। উপরন্তু, রঙ তিনটির যে শেড তিনি ব্যবহার করে থাকেন, তা কোনো পেলবতার অনুভূতি জাগ্রত করে না; রুঢ় বাস্তবতার কথাই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়।
দিন যত যাচ্ছে, মানুষ সৃজনশীল উপায়ে প্রতিবাদ করা শিখছে। কেউ হয়তো ব্যাকগ্রাউন্ডে পূজামণ্ডপ রেখে ‘Free Palestine’ লিখে ফিলিস্তিনের সংগ্রামের সাথে সংহতি জানাচ্ছেন, কেউ হয়তো গ্রাফিকস কার্ড বানিয়ে একইসাথে দাম কমানোর দাবি এবং নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। এগুলোকে মানুষ স্বাগতও জানাচ্ছে। এগুলো যে ভুল সেটা বলা আমার উদ্দেশ্য না, তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি একটু কম-পছন্দ করি এগুলো। কারণ, এতে মনোযোগটা দুইদিকে ভাগ হয়ে যায়: না ঠিকঠাক নববর্ষের আমেজ আসে, না ঠিকঠাক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, না ঠিকঠাক পূজার আনন্দ করা যায়, না ঠিকঠাক সংহতি জানানো যায়। যে মুডে আমরা নববর্ষ উদযাপন করি, নিশ্চয়ই সেই মুডে আমরা দাম কমানোর দাবি তুলি না। দুটো একসাথে করতে গেলে দাবিটা লঘু হয়।
দেবাশিসও এরকম দ্বৈত বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা আর্ট করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ কাজে, বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানকালে তাঁর ফোকাল পয়েন্ট হয়ে উঠেছে ক্রমশ স্পষ্ট। উনি যখন লেখেন, ‘শেখাসিনার অনেক গুণ পুলিশ দিয়ে করছে খুন’ অথবা, ‘তুমি কে আমি কে বিকল্প বিকল্প’ তখন তার বক্তব্য আমাদের পূর্ণ মনোযোগ দাবি করে; এদিক-ওদিক তাকানোর সুযোগ দেয় না।
বিখ্যাত চিত্রশিল্পী আমেদেও মোদিলিয়ানিকে নিয়ে একটা মিথ আছে। উনি সেসময় চরম দারিদ্র্যে নিপতিত। এক শিল্পপতি ওনার একটা ছবি দেখে পছন্দ করলেন; তার পারফিউম ব্র্যান্ডের লোগো হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলেন। টাকার প্রচণ্ড দরকার থাকা সত্ত্বেও মোদিলিয়ানি এতে রাজি হলেন না পাছে তার আর্ট সহজলভ্য হয়ে যায়।
তো, আর্ট নিয়ে এইরকম নাকউঁচু স্বভাব সবদেশেই ছিলো এবং আছে। অনেকে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’-এর দোহাই দিয়ে আর্টকে সমাজ-বাস্তবতা থেকে বিছিন্ন রাখতে চায়, অনেকে সহজলভ্যতার ভয়ে দুর্বোধ্যতার আশ্রয় নেয়, অনেকে ডিজিটাল মাধ্যমে আঁকা আর্টকে আর্ট বলে স্বীকৃতিই দিয়ে চায় না। দেবাশিস এই সকল মাত্রাতেই নিজেকে জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পেরেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নন-পার্টিজান হওয়া এবং বিদেশে অবস্থান করা– এই দুটি ফ্যাক্টর তাঁর ভয়ডরহীন কাজকে ফুয়েল করেছে বলে মনে করি।
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেমন দেশের রাজনীতি বদলেছে: অনেকেরই আদর্শবাদী অবস্থান থেকে সরে এসে জাতীয় আকাঙ্ক্ষার সাথে তাল মেলাতে হচ্ছে; আমার মনে হয়, আর্ট নিয়ে যে এলিটপনা, যে রিজিডিটি সমাজে ছিলো তা অনেকাংশে ভাঙবে। এই কৃতিত্বের বড় একটা ভাগ পাবেন দেবাশিস।
হিরো বানানোর সমস্যা আছে। হিরোদের তাড়াতাড়ি মরে যেতে হয়। না হলে পচে যাবার সম্ভাবনা থাকে। সেজন্য প্রশংসাবাক্য যেন ব্যক্তিপূজায় পর্যবসিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখি। তবে ‘ফ্যাক্ট’ স্বীকার করা ফরজ। জুলাইয়ে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে যদি সামাজিক বাস্তবতায় ‘ন্যাশনাল হিরো’ নামক কোনো বর্গের উৎপত্তি হয়, দেবাশিস অবশ্যই সে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এটুকু কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন আমার কর্তব্য।







