লিখেছেন : তানজিল শফিক

মুসলিম কে?


তানজিল শফিক

আজ আরাফাতের দিন। লক্ষ লক্ষ মানুষ একসাথে দাঁড়িয়ে আছে—কেউ রাজা না, কেউ প্রজা না, কেউ ধনী না, কেউ গরিব না, কেউ জাতির প্রতিনিধি না, কেউ বংশের অহংকার না। সবাই শুধু এক বাক্যে ফিরে যাচ্ছে: লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। আমরা হাজির। আমরা হাজির, হে আল্লাহ। আমরা এসেছি। আমরা সাড়া দিয়েছি। আমরা নিজেদের কেন্দ্র থেকে সরে এসে তোমার সামনে দাঁড়িয়েছি।

এই “হাজির” হওয়াটাই আসলে মুসলিম হওয়ার শুরু। মুসলিম হওয়া মানে শুধু একটা পরিচয় বহন করা না। শুধু একটা নাম, একটা পোশাক, একটা কমিউনিটি, একটা ইতিহাস, একটা রাজনৈতিক ক্যাটাগরি না। মুসলিম হওয়া মানে প্রথমত এই স্বীকারোক্তি: আমি নিজের দ্বারা সম্পূর্ণ না। আমি নিজে নিজে দাঁড়াই না। আমার দেহ, আমার শ্বাস, আমার জ্ঞান, আমার রিযিক, আমার ভাষা, আমার ছায়া—কিছুই আমার নিজের বানানো না। আমি হাজির, কারণ আমাকে ডাকা হয়েছে। আমি সাড়া দিচ্ছি, কারণ আমার অস্তিত্বের গভীরে সেই ডাক আগে থেকেই ছিল।

তাই “মুসলিম কে?”—এই প্রশ্নটা বাইরে থেকে সহজে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। মুসলিমকে যদি শুধু census category, minority question, security problem, cultural identity, বা political bloc হিসেবে পড়া হয়, তাহলে মুসলিমকে বোঝা হয় না; মুসলিমকে ব্যবস্থাপনা করা হয়। মুসলিম কে—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে মুসলিমকে নিজের ভাষায়, নিজের ওহীর আলোতে, নিজের তাওহিদের ভিতর দাঁড়িয়ে কথা বলতে দিতে হবে। এটাই epistemic justice-এর ন্যূনতম শর্ত। অন্যের ভয় দিয়ে মুসলিমকে সংজ্ঞায়িত করলে মুসলিম দেখা যায় না; শুধু নিজের ভয়টাই দেখা যায়।

কিন্তু কুরআনে মুসলিম হওয়ার ধারণা আরও বড়, আরও গভীর, আরও মহাজাগতিক। কুরআন submission-কে শুধু মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখে না। কুরআন দেখায়—সমগ্র সৃষ্টি এক ধরনের সিজদার মধ্যে আছে। আসমান, জমিন, সূর্য, চাঁদ, তারা, পাহাড়, গাছ, প্রাণী, ফেরেশতা—সবকিছু আল্লাহর rububiyyah-এর মধ্যে আছে। সবকিছু নিজের অস্তিত্বের ভাষায় আল্লাহর দিকে ফিরে আছে। সবকিছু তার সীমা, তার মাপ, তার গতি, তার মৃত্যু, তার পুনর্জন্ম, তার dependency দিয়ে আল্লাহকে প্রকাশ করছে।

কুরআন বলে: “And to Allah prostrates whoever is within the heavens and the earth, willingly or by compulsion, and their shadows [as well] in the mornings and the afternoons.” — Qur’an 13:15. অর্থাৎ আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, তারা আল্লাহর সামনে সিজদা করে—ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়; এমনকি তাদের ছায়াও সকাল-বিকেলে সিজদা করে। এই আয়াত শুধু একটি আধ্যাত্মিক ছবি না; এটা ontology। এটা অস্তিত্বের ব্যাকরণ। এখানে মানুষ একা না। মানুষের শরীরই শুধু না, তার ছায়াও আল্লাহর সামনে নত। তার দৃশ্যমান অংশই শুধু না, তার relational extension-ও আল্লাহর অধীন।

আরেক জায়গায় বলা হচ্ছে: “And to Allah ˹alone˺ bows down ˹in submission˺ whatever is in the heavens and whatever is on the earth of living creatures, as do the angels—and they are not arrogant.” — Qur’an 16:49. এখানে প্রাণী আছে, ফেরেশতা আছে, আসমান-জমিনের সব সত্তা আছে। submission এখানে শুধু belief system না; এটা existence system। অহংকারহীনভাবে থাকা, নিজের রবের নিয়মের ভেতর থাকা, নিজের সীমা মেনে থাকা—এটাই সৃষ্টির স্বাভাবিক অবস্থা।

সূরা হজ্জে এই cosmic submission আরও বিস্তৃতভাবে আসে: “Do you not see that to Allah prostrates whoever is in the heavens and whoever is on the earth, and the sun, and the moon, and the stars, and the mountains, and the trees, and the moving creatures, and many of the people?” — Qur’an 22:18. লক্ষ করুন—সূর্য, চাঁদ, তারা, পাহাড়, গাছ, প্রাণী—সবাই সিজদায়। তারপর বলা হচ্ছে, মানুষের মধ্যে অনেকে। এখানেই মানুষের বিশেষ বিপদ। creation-এর বাকিরা already submitted. কিন্তু মানুষকে submit করতে হয়। মানুষকে সাড়া দিতে হয়। মানুষকে বলতে হয়: লাব্বাইক।

তাই আরাফাতের দিন শুধু হজের একটি রিচুয়াল মুহূর্ত না। এটা মানুষের মহাজাগতিক অবস্থান স্মরণ করার দিন। মানুষ এখানে দাঁড়িয়ে বলে—আমি আর নিজেকে কেন্দ্র ভাববো না। আমি আর আমার ego, আমার nation, আমার market, আমার ideology, আমার race, আমার class, আমার knowledge, আমার civilisation—এসবকে রব বানাবো না। আমি হাজির। আমি নিজের কেন্দ্র থেকে সরে এসে রবের সামনে দাঁড়ালাম।

এখানে “লাব্বাইক” শুধু মুখের বাক্য না। এটা এক ধরনের ontological turning. নিজের দিকে তাকানো থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। নিজের মালিকানা-ভ্রম থেকে আমানতের জগতে ফিরে যাওয়া। নিজের sovereignty-এর মিথ্যা থেকে ubudiyyah-এর সত্যে ফিরে যাওয়া। মানুষ যখন বলে “লাব্বাইক”, তখন সে শুধু মক্কার দিকে যাচ্ছে না; সে নিজের ভেতরের ফেরাউনের কাছ থেকেও সরে আসছে। সে বলছে: আমি প্রভু না। আমি বান্দা।

এই অর্থে মুসলিম হওয়া কোনো সংকীর্ণ communal badge না। মুসলিম হওয়া মানে বাস্তবতাকে তার আসল কেন্দ্রসহ দেখা। আল্লাহ ছাড়া কোনো রব নেই। আল্লাহ ছাড়া কোনো চূড়ান্ত মালিক নেই। আল্লাহ ছাড়া কোনো self-sufficient power নেই। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তাই শুধু theological proposition না; এটা জগতের মিথ্যা কেন্দ্রগুলোকে নামিয়ে দেওয়ার ঘোষণা। বাজার রব না। রাষ্ট্র রব না। উন্নয়ন রব না। জাতি রব না। পুরুষতন্ত্র রব না। সাম্রাজ্য রব না। মানুষও রব না। রব একমাত্র আল্লাহ।

এইখানে ecology-ও বদলে যায়। যদি গাছ সিজদা করে, পাহাড় সিজদা করে, নদী আল্লাহর আয়াত হয়, ছায়াও আল্লাহর সামনে নত হয়—তাহলে প্রকৃতি কোনো dead resource না। প্রকৃতি silent না। প্রকৃতি কথা বলে, কিন্তু মানুষের ভাষায় না। গাছ ফল দিয়ে কথা বলে। নদী প্রবাহ দিয়ে কথা বলে। পাখি উড্ডয়ন দিয়ে কথা বলে। মাটি ধারণ করে কথা বলে। ছায়া নত হয়ে কথা বলে। মানুষ ভাবে, প্রকৃতি নীরব; কুরআন বলে, সমস্যা প্রকৃতির নীরবতা না, মানুষের বধিরতা।

এটা panpsychism না—মানে পাথর মানুষের মতো চিন্তা করে, গাছ মানুষের মতো আত্মসচেতন, এমন দাবি না। কথাটা তার চেয়ে গভীর। কুরআন বলছে, সবকিছু আয়াত। সবকিছু আল্লাহর দিকে ইশারা করে। সবকিছু নিজের অস্তিত্বের ধরনে reveal করে। revelation শুধু পৃষ্ঠায় না; creation-ও এক ধরনের পাঠ্য। কিন্তু সেই পাঠ পড়তে হলে মানুষকে অহংকার থেকে নামতে হয়। আরাফাত সেই নামার জায়গা। সেখানে মানুষ নিজের জ্ঞান, ক্ষমতা, মর্যাদা, সাজসজ্জা, পরিচয়ের স্তরগুলো খুলে দাঁড়ায়। শুধু বলে: আমি হাজির।

তাহলে মুসলিম কে? মুসলিম সে, যে নিজের dependency বুঝে। যে জানে, সে self-made না। যে জানে, তার শ্বাস ধার করা। যে জানে, তার জ্ঞান আমানত। যে জানে, তার শরীর আমানত। যে জানে, তার শহর, নদী, জমি, প্রতিবেশ, সমাজ—সব আমানত। মুসলিম সে, যে creation-এর cosmic submission-এর সঙ্গে নিজেকে পুনরায় মিলিয়ে নিতে চায়। যে বলে, আমি আর বিচ্ছিন্ন আধুনিক subject হয়ে থাকতে চাই না; আমি সেই মহাজাগতিক সিজদার ভেতরে ফিরে যেতে চাই, যেখানে আমার ছায়াও আগে থেকেই নত।

মানুষের মর্যাদা এখানেই যে সে জোর করে মুসলিম না। সে অস্বীকার করতে পারে। সে নিজেকে রব ভাবতে পারে। সে পৃথিবীকে ভোগ্যবস্তু বানাতে পারে। সে অন্য মানুষকে object বানাতে পারে। সে আল্লাহর আয়াতকে resource বানাতে পারে। সে নদী মেরে ফেলতে পারে, শহর দখল করতে পারে, জ্ঞানকে অস্ত্র বানাতে পারে, ধর্মকেও ক্ষমতার মঞ্চ বানাতে পারে। তাই মানুষের “লাব্বাইক” এত মূল্যবান। কারণ সে না-ও বলতে পারত। সে তবুও বলে—আমি হাজির।

আজ আরাফাতের দিনে এই কথাটাই সবচেয়ে গভীর মনে হয়। মুসলিম হওয়া শুরু হয় এই উপলব্ধি থেকে: আমি পৃথিবীর মালিক না; আমি পৃথিবীতে আগন্তুকও না; আমি আমানতদার। আমি আল্লাহর জমিনে, আল্লাহর আকাশের নিচে, আল্লাহর রিযিক খেয়ে, আল্লাহর দেওয়া দেহ নিয়ে, আল্লাহর দেওয়া সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। আমার সামনে শুধু identity politics-এর প্রশ্ন না; আমার সামনে অস্তিত্বের প্রশ্ন। আমি কাকে রব মানবো?

লাব্বাইক তাই শুধু হাজিদের ধ্বনি না। এটা মানুষের আসল উত্তর। যখন creation বহুদিন ধরে নিজের ভাষায় বলে যাচ্ছে—আমরা নত, আমরা আল্লাহর—তখন মানুষ আরাফাতে দাঁড়িয়ে সেই পুরনো মহাজাগতিক সুরে নিজের কণ্ঠ যোগ করে।

আমরা হাজির।
আমরা হাজির।
আমরা নিজের অহংকার থেকে ফিরে এসেছি।
আমরা সেই সিজদার জগতে ফিরতে চাই, যেখানে সূর্য, চাঁদ, তারা, পাহাড়, গাছ, প্রাণী, ফেরেশতা—সবাই আগে থেকেই আল্লাহর সামনে নত।
আমরাও হাজির, হে আল্লাহ।
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা