সৈয়দ আব্দুল আজিজ
এক.
বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার স্বরূপ উন্মোচনে দার্শনিক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাশীল লেখক ‘আহমদ ছফা’ (১৯৪৩-২০০১) চিন্তার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন ১৯৭২ সালে তাঁর সাড়া জাগানো প্রবন্ধ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ লেখার মাধ্যমে। ধারাবাহিকভাবে সতের কিস্তির লেখাগুলি আজও প্রাসঙ্গিক এবং আমাদের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের সুবিধাবাদিতার নগ্ন রূপ এর মাধ্যমে তিনি উন্মোচন করেন। আহমদ ছফা বুদ্ধিজীবীদের শুধু সমালোচনাই করেন নাই তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের বন্ধাত্বের কারনও অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর ভাষায় আমাদের মন-মানসে দুই ধরণের অন্ধতা বিরাজমান; একটি শাসকগোষ্ঠি কর্তৃক আরোপিত, অপরটি স্বেচ্ছা অন্ধত্ব। এ অন্ধতার মনোজগতে বসবাস করে তারা আকারে ইঙ্গিতে যা প্রকাশ করতে চান তা হলো বাংলা সংস্কৃতির উৎকর্ষ যা হওয়ার ব্রিটিশ আমলে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের সাধনায় তা হয়ে গেছে। এর বাইরে একচুল অগ্রসর হওয়ার সামর্থ্যও নেই। তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধত্বের ফলে দেশ ও জাতির দুর্দশার আশংকা ব্যক্ত করে লিখেন, “একটি সমাজ যখন উপলব্ধি করতে পারে যে, তার প্রতিষ্ঠিত বিচার-আচার, সংস্কার বিশ্বাস, রীতি নীতি, আইন-কানুন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব জীবনের চাহিদা মেটাতে মোটেও সক্ষম হচ্ছে না, তখন সেই বিশেষ সমাজের বেঁচে থাকার তাগিদে জীবনকে সমৃদ্ধ ও গরীয়ান করার প্রেরণায় সম্পূর্ণ নয়া দৃষ্টিকোন থেকে সবকিছু বিচার করতে হয়। নতুন চিন্তার অস্ত্রে নতুন মানুষ জন্মগ্রহন করে”। তিনি বাংলা সাহিত্যকে দেশীয় স্রোতধারায় বলীয়ান হয়ে আন্তর্দেশীয় হয়ে ওঠা এবং নতুন কালের রবীন্দ্র-নজরুলের আবির্ভাব প্রত্যাশা করেন।
দুই.
ব্রিটিশোত্তর আমাদের স্বাধীনতার দুটি পর্বে (ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত পূর্ব পাকিস্তান এবং পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ) বাংলা সাহিত্যের বিকাশমান ধারার গতি প্রকৃতি পর্যালোচনা করা সময়ের জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য যে প্রশ্নগুলো নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন তা হলো, বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব কতটুকু হচ্ছে? সমকালীন প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতি কি কোন সংকটে নিমজ্জিত? সময় কি নির্লিপ্ত থাকার না দ্রোহের? সমকালীন সাহিত্য চর্চায় কি সে ভাষা নির্ধারণ ও ব্যবহার করতে পারছে? যেভাবে কবি রফিক আজাদ’ (১৯৪২-২০১৬) এর কবিতা হয়েছিল মানুষের ভাষা, “ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাবো”, যেভাবে কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) লিখেছিলেন, “উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ”, কবি আল মাহমুদ লিখেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম? কামরুল হাসান (১৯২১-১৯৮৮) ক
এঁকেছিলেন সেই কালজয়ী কার্টুন, “দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে” । বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার দেওলিয়াত্ব এবং পদলেহী আচরণের বিরুদ্ধে কলম তুলেছিলেন আহমদ ছফা (১৯৪৩-২০০১) । রবীন্দ্রবলয়ের ঘোর প্রতাপের মাঝেও নজরুল তাঁর কবিতার বাঁশিতে তুলেছিলেন বিদ্রোহের সুর, সে সুরে কাঁপন ধরেছিলো রাজকপাটে।
তিন.
শিল্প সাহিত্য ও বৃদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে আমাদের বিবেচনা করতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনের ঐকাহিক সঙ্গী হিসেবে, মানুষের নিঃস্বাসে-প্রশ্বাসে বেরিয়ে আসা ব্যক্ত-অব্যক্ত ভাষার প্রতিধ্বনি হিসেবে যা জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিক, তাকে সময় করে পাঠ করতে হয় না, তা হয় জনজীবনেরই প্রাত্যহিক অনিবার্য উচ্চারণ। ঠিক যেমনটা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান কবি আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) বলেছেন, “জীবন যাপনের তাৎপর্যকে শিল্পে ধরতে পারা মানবিক জগতের এক বড় স্বাদ। এ সত্যকে প্রবলভাবে উপেক্ষা করতে পারেন তাঁরাই—যারা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ মতবাদী। কিন্তু ‘সত্যিকারের কবিতা ডানায় ভর দিয়ে উড়ে আসে। তাকে বানানো যায় না”। সুতরাং কবিতা শুধু নয় কবিতা বা শিল্পের জন্য, তাকে হতে হবে জনমানুষের জন্য। কবিতায় মানুষের অন্তঃধ্বনি শুনতে পাওয়াই কবিতার স্বার্থকতা। জনআকাংখার মানসপটে প্রত্যাশা থাকে যেন প্রথম পাঠেই কবিতা ভালো লেগে যায়, অন্তরে ঢেউ তোলে, বিশ্বাসের পালে যেন হৃদয় তরঙ্গের মৃদুময় ছন্দ টের পাওয়া যায়। সুবোধ ঘোষ (১৯০৯-১৯৮০) যেমনটা বলেছেন, “যে কবিতা প্রথমবার পাঠ করার সাথে সাথেই বিদ্যুৎচমকের মতো ভালো লেগে যায়, তারপর ফিরে যেতে হয় তার কাছে, সেই কবিতাই উৎকৃষ্ট কবিতা”। তাই কবিতা হওয়া চাই মানুষের জীবনের ডানা কেন্দ্রিক যা তাঁর ঐক্যাহিক প্রয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত, প্রাত্যহিক চাহিদার সাথে ব্যাপৃত, যা তাঁর বিশ্বাসের পালে সৃষ্টি করে তরঙ্গ, তার অন্ত:ধ্বনিকে করে উদ্বেলিত। তা হয় মানুষের বাহ্যিক, জৈবিক ও আত্মিক চাহিদার অন্তজ প্রকাশেরই শিল্পীত প্রকাশ।
চার.
প্রায় চার দশক ধরে বগুড়ায় একদল সাহিত্যকর্মী শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনায় সম্পৃক্ত। এ ধারারই অন্যতম সদস্য নব্বই দশকের আলোচিত কবি ‘সাজ্জাদ বিপ্লব’ (আমেরিকা প্রবাসী) সম্প্রতি দেশে আসা উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয় নানা সাহিত্য আড্ডা; আলোচনা হয় সমকালীন কবিতা, আধুনিকতা-উত্তরাধুনিকতা, একবিংশ শতকের শিল্প-সাহিত্য সামাজিক আন্দোলনের ধারা ও প্রকৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নিয়ে নানাধর্মী বিশ্লেষণ। এসব আলোচনার ভিত্তিতেই প্রবন্ধটি লেখার প্রয়াস। সেই সাথে সমকালীন শিল্প সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার গতি প্রকৃতি হাল আমলের লিখিয়েদের কাছে তুলে ধরাও এ প্রবন্ধটির লেখার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। প্রবন্ধটিতে একবিংশ শতকের চলমান প্রযুক্তি ও পরিবর্তনশীল বিশ্বে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার রূপরেখা তুলে ধরার সাথে সাথে উপস্থাপিত হয়েছে শিল্পবিপ্লব ও সমকালীন প্রযুক্তির মিথস্ক্রিয়া। বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান তৈরিতে প্রযুক্তি-শিল্পবিপ্লব-বিশ্বায়ন ব্যবস্থা কিভাবে সম্পর্কসূত্র মেনে চলে তার একটি আন্ত:সম্পর্কীয় ছাঁচ (Matrix) এবং কবি ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ কিভাবে একটি নতুন যুগের সূচনা এবং আধুনিকতার নতুন ধারণা বিনির্মাণ করেছেন, সে সম্পর্কের একটি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে।
পাঁচ.
শিল্পবিপ্লব, বিশ্বব্যবস্থার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক
শিল্প-বিপ্লবের সাথে শিল্প-সাহিত্যের যুগলবন্দি ধারাবাহিকতা, পথ-পরিক্রমা ও গতিশীলতার সম্পর্ক কে আমরা বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম। ‘আধুনিকতা’ মতবাদের আতুঁর ঘর হিসেবে প্রথম শিল্প বিপ্লব একটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা য়েছিলো, পরবর্তিতে শিল্পায়ন, পুঁজিবাদের উদ্ভবকে কেন্দ্র করে উত্তর-উপনিবেশিক বিশ্ব পুঁজিবাদী ও সমাজতন্ত্রী এই দুই ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। চিন্তার বিন্যাস হতে থাকে সাম্রাজ্যবাদী শাসনব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। পরবর্তিতে সংঘটিত সকল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও শিল্প বিপ্লবের যুগল অগ্রসরতার সাথে বিশ্বব্যবস্থার একটি মেরুকরণ আমরা লক্ষ্য করি। বিশ্বব্যবস্থার মেরুকরনের সাথেই প্রকল্প আকারে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। বৃদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রের ভিত্তিতেই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির রূপ বদল ঘটেছে, মিডিয়ার বিষয় নির্ধারিত হয়েছে। আমরা প্রযুক্তি-শিল্পবিপ্লব-বৈশ্বিক ব্যবস্থার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক এই সম্পর্ক নিচের তথ্য বিবরণীর মাধ্যমে উপস্থাপন করলাম সেইসাথে চলমান বিশ্বব্যবস্থাকেও এই চিন্তা কাঠামোর আলোকেই বুঝতে আগ্রহী শিল্প-সাহিত্য কর্মীদের মনোযোগ আকর্ষণ করবো।
সারণী: শিল্প বিপ্লবের সাথে প্রযুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্র এবং আন্তসম্পর্ক
| শিল্পবিপ্লব | মেয়াদকাল | প্রযুক্তিগত উন্মেষ | বিশ্বব্যবস্থা ও বিশ্বপরিস্থিতি | ভাষা শিল্প-সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্র |
| প্রথম | ১৭৮৪- | বাষ্প ইঞ্জিন, বিদ্যৎ ও টেলিফোন আবিস্কার। শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হস্তচালিত থেকে যান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা, ব্যাপক উৎপাদন ও পুঁজির বিকাশ (Mass Production, Profit Making), | গৃহযুদ্ধ, বর্ণবাদ, উপনিবেশ-সাম্রাজ্যবাদ প্রভাবিত বিশ্বব্যবস্থা। | আধুনিকতাবাদ, শ্রেষ্ঠত্যবাদী তত্ত্ব, (ওরিয়েন্টালিজম), বাঙ্গালী রেনেসাঁ (মূলত হিন্দু রেনেসাঁ)। কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যচর্চা ও লেখক-বুদ্ধিজীবিদের শ্রেষ্ঠত্যবাদী চর্চা। |
| দ্বিতীয় | ১৮৭০- | |||
| তৃতীয় | ১৯৬৯- | ইন্টারনেট ও কম্পিউটার প্রযুক্তির উন্মেষ। অটোমেশন/স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশ। | বিশ্বযুদ্ধ-1-২ সংঘটিত, উপনিবেশের অবসান, জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব, পরাশক্তির শীতল যুদ্ধ। সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী প্রচার এবং পরাশক্তিসমূহের নতুন মেরুকরণ। | উত্তরাধুনিকতাবাদের চর্চা এবং আধুনিকতার প্যাটার্ন ভাংগার প্রয়াস। স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে এর উদ্ভব। বাংলা সাহিত্যের নতুন কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা’র উদ্ভব। |
| চতুর্থ | ২০০০- (একবিংশ শতক) | সাইবার ফিজিক্যাল টেকনোলজি, সোশ্যাল মিডিয়া, থ্রিডি প্রিন্টিং, রোবটিক্স, কৃত্তিম বৃদ্ধিমত্ত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস (IOT), বিগ ডাটা (Big data)। ভার্চুয়াল রিয়েলিটির যুগ। | ক্ষমতার বিকেন্দ্রকরণ, আঞ্চলিক শক্তির উদ্ভব। আমেরিকার নেতৃত্বে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ শুরু এবং ইসলামোফোবিক বিশ্বব্যবস্থা। | ইসলামোফোবিক বিশ্ব, মিডিয়া ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। ঢাকা ক্রমশ: হয়ে উঠে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী। |
ছয়. কাজী নজরুল ইসলাম ও আধুনিকতা
কবিতা সব কালেই মানুষের জয়গান গেয়েছে, সময়কে প্রতিনিধিত্ব করেছে, অগ্রসরমানতাকে প্রাধান্য দিয়েছে। কালের সীমা পেরিয়ে বহুদূরগামী হতে চেয়েছে। বর্তমানে বসে ভবিষ্যতের আকাংখা ব্যক্ত হয়েছে। প্রায় ছয়শত বছর আগের অষ্টাদশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি ও মঙ্গলকাব্যের শক্তিমান কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র (১৭১২–১৭৬০) তাঁর অমর কাব্য আজও মানুষের মুখে ফেরে, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”। এখানে দুধভাত হিসেবে শুধু খাবার উপকরণ নয় বরং ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি ও কল্যানের প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে। কালের ধারাবাহিকতায় একইভাবে প্রায় শতবর্ষ আগে আমাদের কবি ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ তাঁর ‘সংকল্প’ কবিতায় কল্পনাশক্তির পরমপ্রকাশ ঘটিয়ে লিখেছিলেন, “বিশ্ব জগত দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে” একই কবিতায় তিনি ভবিষৎকালের চন্দ্রাভিযানকে উত্থাপন করে লিখেছেন, ‘হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিনপুরে’ কিংবা মঙ্গলগ্রহ আবিস্কারের আগমনী কথা শুনিয়ে বলেছিলেন, ‘শুনব আমি ইঙ্গিত কোন মঙ্গল হতে আসছে উড়ে’ । এসব কবিতায় কবি রচনা করেছেন ভবিষ্যতের পৃথিবী, ভেঙ্গে ফেলেছেন বৃত্তাবদ্ধ চিন্তার দেয়াল, অবিরাম আবিস্কারের উন্মাদনা সৃষ্টি করেছেন। তাই কবি বর্তমান কালে অবস্থান করলেও ভবিষ্যতের প্রক্ষেপণ তিনি সার্থকভাবে করতে পেরেছেন।
সাত.বিশ্বাসীদের কাব্য-সাহিত্য চর্চা
বিশ্বাসী কবিদের সমালোচনাকে উপেক্ষা করার সাহসিকতা থাকতে হবে। নিজের সৃষ্টির মগ্নতায় নিজেকে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। এর একটি উদাহরন আমরা কবি নজরুল ইসলামের জীবনে দেখতে পাই তাঁর ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায়। কবিকে সারা জীবনে রবীন্দ্রবলয়ে ঘনছায়ায় সাহিত্য চর্চা করতে হয়েছে, লিখতে হয়েছে। অবিশ্রান্তভাবে নানা অযৌক্তিক সমালোচনায় বিদ্ধ হতে হয়েছে। নিজেই তাঁর জবাব দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি কলকাতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে “নজরুল ইসলাম ও আধুনিক বাংলা কবিতা “ শীর্ষক প্রবন্ধ বক্তব্যে সমকালীন বাংলাসাহিত্যে জনপ্রিয় লেখক সমালোচক কবি সলিমুল্লাহ খান বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতাকে বিশ্লেষণ করে কবি নজরুল ইসলামকে আধুনিক বাংলা কবিতার নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব দিয়েছেন। তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ফরাসী বিপ্লবোত্তর জার্মানী ও ইতালীতে উত্থিত ফ্যাসিবাদের উত্থানকালে ভালতার বেনিয়ামিনের প্রবন্ধ “The Work of Art in the age of Technological Reproducibility এর মূল বিষয়বস্তুকে ও ‘আধুনিকতার মহিমা’ বিশ্লেষণ করে দেখান যে, ভাল্টার বেনিয়ামিন এর প্রায় ৬ বছর আগে ১৯২৫ সালে কবি নজরুল ইসলাম ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতাটি রচনা করেন, যার মাধ্যমে ‘মহিমা’ বা শ্রেষ্ঠ্যত্ববোধ এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন, তিনি লিখেছেন—
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবির সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে যে, চিরকেলে-বাণী কই কবি?
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!
এই পঙ্ক্তিমালা সমূহে ‘The Aura of Modernity’ যার বাংলা অনুবাদ ‘আধুনিকতার মহিমা’, গ্রীক ভাষায় যার আক্ষরিক অর্থ ‘বাতাস’। তবুও কবি প্রভাতী বাতাসকে যথার্থভাবে তুলে ধরে বলেছেন, “আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী”। উল্লেখ্য যে কবি নজরুল ইসলামের সময়টি ছিলো বাংলা কবিতার মহিমাক্রান্ত। সবকিছুকেই মহিমার বাঁধনে আটকে রাখার পরিবেশে তিনি লিখেছেন নতুন যুগের কবিতা, বর্তমানের কবিতা। যথার্থই তিনি সকল ভ্রুকুটি আর মহিমাকে উপেক্ষা করে নিজকে প্রতিস্থাপিত করেছেন তাঁর মহিমায়, লিখেছেন–
কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ড আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?
ঐতিহ্য, রোমান্টিকতা, বিশ্বাস, সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি নীতি সুরক্ষা ও উচ্চকিত করেই কাজী নজরুল ইসলাম নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলা কবিতায় আধুনিকতার নতুন ধারনা, মানুষের অধিকারকে উপেক্ষা করে, শক্তিমানের সামনে মানুষের কথা না তুলে যারা শ্রেষ্ঠত্ববাদি চেতনায় ঘুমে আছেন তাদের প্রতি নিক্ষেপ করেছেন তীব্র ক্ষোভ–
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
তিনি প্রতিষ্ঠিত ধারণা ও সকল তাত্ত্বিকতাকে উপেক্ষা করে স্বমহিমায় নিজের অবস্থানকে জানান দিয়েছেন–
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!
কবি সলিমউল্লাহ খান তাই যথার্থই বলেছেন, “কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতাই প্রমাণ করে কবিতায় মহিমার অবসান ও আধুনিক বাংলা কবিতার তত্ত্বগত প্রতিষ্ঠা তাঁর হাতেই সম্পন্ন হয়েছিল”।
আট. জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলা সাহিত্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা
বাংলা সাহিত্যের জমিনকে আমাদের বুঝে নিতে হবে, ইতিহাস-ঐতিহ্য ভাষাভিত্তিক জাতিসত্ত্বার স্বকীয়তা দিয়ে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উদ্ভব ও অবস্থান, উত্তর-উপনিবেশিক ও ভূরাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করেই শিল্প-সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে হবে। বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে পশ্চিম দুনিয়ায় যে বৃদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পগুলো যা অব্যাহতভাবে গৃহিত হচ্ছে তার ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন থেকেই সে ধারার সাথে নিজস্ব সংস্কৃতির অভিযোজন-বাস্তবায়ন অথবা গ্রহন-বর্জনের পদক্ষেপ নিতে হবে। চলমান বিশ্বের সাহিত্য আন্দোলনে চিন্তার ক্ষেত্র হতে হবে বিশ্বব্যাপী, আমি যেখানেই থাকি না কেন আমি বিশ্ব সমাজেরই একজন। প্রযুক্তির কল্যানে আমার ভাবনাকে বিশ্বব্যাপী পৌছানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিজ ভূমিতে বসেই চিন্তাকে ছড়িয়ে দিতে হবে বিশ্ব পরিসরে। কবিতায় আনতে হবে প্রযুক্তি, আনতে হবে রিপ্রডিউসিবিলিটি (পুনঃউৎপাদনশীলতা), সংযুক্ত করতে হবে মননশীলতা, অন্তর্ভুক্ত করতে হবে বিশ্বাসের সুদৃঢ ভিত্তি। আধুনিকতাবাদের ফাঁকাবুলিতে মোহিত ও বিচ্যুত না হয়ে এর বিশ্বজনীনতাকে আপন বিশ্বাসের পোশাকে তুলে ধরতে হবে। তা হলেই সৃষ্টিশীল সাহিত্যের স্বার্থকতা দৃশ্যমান হবে। কবির রচনাকালটি হতে পারে বর্তমান কিন্তু কবির কল্পনায় তা যেন ভবিষৎকে দেখার ও ধরার প্রবণতা থাকে তা স্পষ্ট করতে হবে। মানব সভ্যতার অভিযাত্রা শুরু হয়েছিলো বিশ্বাসী মানুষের দ্বারা তাঁদেরই জয় হবে মানবিক পৃথিবীকে আলোকিত করার কাজে। বিশ্বাসী শিল্প-সাহিত্যই পরাভূত করবে সব ‘মহিমাতত্ত্ব’ আর ‘শ্রেষ্ঠত্ববোধ’কে।
………….
লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।







