এইচ বি রিতা
আধুনিক সভ্যতার এক অনিবার্য নিয়তি হলো মানুষের এক ভূগোল থেকে অন্য ভূগোলে পরিযাজন। নিজ ভূমি, চেনা জল-হাওয়া আর পুরুষানুক্রমিক ঐতিহ্য ছেড়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গোলার্ধে গিয়ে থিতু হওয়ার এই যে মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া-তা-ই জন্ম দেয় এক বিশেষ ধারার সাহিত্যের, যা চ্যুতি ও অন্বেষণের দ্বন্দ্বে মুখর। আর এই রূপান্তরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লেখকের ভেতরের সৃজনশীল সত্তা যে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, তা কেবল ভৌগোলিক দূরত্বের নয়, তা আসলে এক গভীর আত্মিক ও আদর্শিক রূপান্তরের ইতিহাস। এই লড়াই একদিকে যেমন ফেলে আসা ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানের বিচ্ছেদের তীব্র আর্তি, অন্যদিকে তেমনই নতুন এক যান্ত্রিক ও ভিন্নধর্মী সংস্কৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার এক সচেতন মননশীল প্রয়াস। ব্যক্তিসংকটকে সামষ্টিক ও বৈশ্বিক ইতিহাসের ক্যানভাসে মিলিয়ে দেখার যে আধুনিক চেতনা, তার আলোকেই মূলত এই ঘরানার সাহিত্যের কবি-লড়াইকে চিনে নেওয়া সম্ভব।
নাগরিক সভ্যতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের ভেতরের বিচ্ছিন্নতাবোধ বা ‘অ্যালিয়েনেশন’। যখন একজন সৃষ্টিকারী তাঁর আজন্ম চেনা পরিবেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ এক নতুন গোলার্ধে গিয়ে পৌঁছান, তখন এই বিচ্ছিন্নতা আরও বেশি বাস্তব ও ধারালো হয়ে ওঠে। চারপাশের অচেনা ভাষা, ভিন্ন জীবনধারা এবং এক তীব্র যান্ত্রিক নাগরিকতা তাঁকে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক একাকীত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। কবি তখন অনুভব করেন এক বহুমাত্রিক আত্ম-বিচ্ছেদ।
এই একাকীত্ব কেবল কান্নাকাটি বা সস্তা স্মৃতিকাতরতা নয়; এটি এক ধরণের বৌদ্ধিক ও কাঠামোগত সংকট। প্রবাসের শীতপ্রধান, কুয়াশাচ্ছন্ন বা কৃত্রিম আলোয় মোড়া শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নগরীতে বসে কবি যখন ভাবেন ফেলে আসা রৌদ্রোজ্জ্বল নদীমাতৃক দেশের কথা, তখন সেই দুই বৈপরীত্যের ধাক্কায় কবির চেতনায় এক ধরণের ফাটল ধরে। চারপাশের জাঁকজমক ও প্রাচুর্য হয়তো তাকে টানে না, বরং এক ধরণের শূন্যতা তৈরি করে, যেখানে কবি নিজেই নিজের কাছে এক ‘আগন্তুক’ বা ‘পরবাসী’ হয়ে ওঠেন।
আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান শক্তি হলো অতীত ঐতিহ্যকে সমকালের সংকটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। অতীত কোনো স্থবির বিষয় নয়, তা প্রবহমান। একজন ঘরছাড়া কবির লড়াইটাও ঠিক এখানেই। তিনি যখন পরবাসে জীবনযুদ্ধ চালান, তখন তাঁর মনের অবচেতনে অবিরাম চলতে থাকে শিকড়ের সন্ধান এবং সেই শিকড়কে বর্তমানের মাটিতে রোপণ করার চেষ্টা।
কবি তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেন দেশের লোকগাথা, ইতিহাস, পুরাণ কিংবা কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের যৌথ স্মৃতি। কিন্তু এই স্মৃতিগুলো হুবহু ফিরে আসে না; এগুলো কবির বর্তমান প্রবাস জীবনের জটিলতার সাথে মিশ্রিত হয়ে এক নতুন রূপ ধারণ করে। কবিতায় তখন কোলাজ পদ্ধতিতে বিভিন্ন চিত্রকল্প জোড়া লাগতে থাকে। এক লাইনে যদি থাকে পাশ্চাত্যের কোনো ব্যস্ত সাবওয়ের বা বহুতল ভবনের যান্ত্রিক কোলাহল, পরের লাইনেই হয়তো ফিরে আসে গাঙ্গেয় বদ্বীপের কোনো মেঠো সুর বা ঢাকের আওয়াজ। অতীত ও বর্তমানের এই যে সহাবস্থান, তা লেখায় এক অদ্ভুত পরাবাস্তব মাত্রা যোগ করে। এটি কেবল স্মৃতির রোমন্থন নয়, এটি হলো পরবাসের মাটিতে নিজের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে কবিতার ভাষায় পুনর্নির্মাণ করার এক মরিয়া বৌদ্ধিক প্রয়াস।
আবার এই সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে এক ধরণের ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা পরিচয় সংকট। কবি না পারেন সম্পূর্ণভাবে নতুন দেশের সংস্কৃতির সাথে বিলীন হয়ে নিজের আদি সত্তাকে মুছে ফেলতে, না পারেন দেশের মূল ধারার দৈনন্দিনতার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকতে। তিনি লটকে থাকেন এক মধ্যবর্তী শূন্যস্থানে যা অত্যন্ত দ্বান্দ্বিক।
এই মিশ্র বা ‘হাইব্রিড’ সত্তার কারণে কবির প্রকাশের ভাষায় এক ধরণের নিরন্তর নিরীক্ষা তৈরি হয়। তিনি হয়তো কবিতার চরণে এমন এক অবলীলাভঙ্গির বুনন তৈরি করেন, যেখানে ধ্রুপদী দেশজ শব্দের সমান্তরালে এসে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক কোনো শব্দ বা পারিভাষিক রূপক। এই লড়াইটা ভাষার স্তরেও ঘটে—মাতৃভাষার প্রতি গভীর টান এবং প্রবাসের কর্মক্ষেত্রের ভাষার চাপ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে কখনো কখনো কবির কলম থেকে বেরিয়ে আসে এক নতুন ধরনের আধুনিক ও জটিল বাকভঙ্গি। এটি একাধারে আত্মরক্ষা এবং আত্মপ্রকাশের লড়াই।
আত্মরক্ষা এবং আত্মপ্রকাশের এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের সমান্তরালে প্রবাস জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে যে চরম বাস্তবটি সবচেয়ে বড় সত্য, তা হলো হাড়ভাঙা খাটুনি আর সময়ের সঙ্গে এক নির্মম দৌড়। এখানে জীবনযাপনের এক একটি মুহূর্ত নিয়মে বাঁধা এবং ঘড়ির কাঁটায় নিয়ন্ত্রিত। এই পরিমণ্ডলে বাস করা লেখকদের জীবন দুই চরম সমান্তরালে বিভক্ত। কেউ হয়তো বহুজাতিক সংস্থায় করপোরেট সংস্কৃতির উচ্চপদে আসীন হয়ে মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, আবার কাউকে হয়তো টিকে থাকার তাগিদে সপ্তাহে ছয় বা সাত দিনই টানা দশ-বারো ঘণ্টা কঠোর শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
এই হাড়ভাঙা খাটুনির পর যখন পরিশ্রান্ত শরীরে ঘরে ফেরা হয়, তখনো মুক্তি নেই; সেখানে অপেক্ষা করে থাকে ঘরকন্না ও সংসারের দৈনন্দিন বাধ্যবাধকতা। এই যান্ত্রিক ক্লান্তি ও সময়ের তীব্র সংকটের ভেতর থেকেই একজন কবিকে তাঁর সৃজনশীলতার জন্য এক চিলতে অবসর ছিনিয়ে নিতে হয়। এটি এক ধরণের অলৌকিক লড়াই।
ডায়াসপোরা কবিদের মধ্যরাতের নিস্তব্ধতায় বা ভোরের আলো ফোটার আগে নিজের ক্লান্ত সত্তাকে নিংড়ে সাহিত্যের খনি থেকে শব্দ তুলে আনতে হয়। এই শ্রমের ক্লান্তি কবিতাকে কেবল ভাবালু হতে দেয় না, বরং তাকে দেয় এক ধরণের রুক্ষ, চাবুকের মতো বাস্তববাদী ভাষা। এই লড়াইটি কেবল মনের ভাব প্রকাশের নয়, এটি হলো যান্ত্রিক দাসত্বকে অস্বীকার করে নিজের ভেতরের মানবিক ও নান্দনিক সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার এক দৈনিক সংগ্রাম।
এই যে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রাত্যহিক সংগ্রাম, তা কবিকে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার সাথে একাত্ম করে দেয়। যখন একজন কবি নিজেই এই খাটুনি আর যান্ত্রিক শোষণের মুখোমুখি হন, তখন তাঁর দেখার চোখটি আর শুধু নিজের একার কষ্টের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না। নিজের যন্ত্রণার দর্পণে তিনি তখন দেখতে পান বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অভিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষের মুখ। ফলে ব্যক্তির এই যন্ত্রণা কেবল এক কোণে বসে চোখের জল ফেলার বিষয় নয়; একে দেখতে হবে সমাজমনস্ক এবং আন্তর্জাতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। এই লড়াইটা কেবল একজন ব্যক্তির ঘরের জন্য কান্নার লড়াই নয়। একজন প্রকৃত কবি যখন নিজের দেশ ছাড়েন, তিনি আসলে বিশ্বনাগরিক বা ‘কসমোপলিটান’ হয়ে ওঠেন।
তিনি নিজের দেশের দুঃখ-কষ্টকে যেমন দূর থেকে এক ধরণের নির্মোহ দূরত্বে রেখে দেখেন, তেমনই নতুন দেশের শ্রমজীবী মানুষের লড়াই, জাতিগত বৈষম্য এবং অভিবাসীদের অধিকারহীনতার কষ্টকেও খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন। ফলে তাঁর কবিতা ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে এক সামষ্টিক ও রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। তিনি তখন বুঝতে পারেন যে, প্রবাসের মাটিতে তাঁর যে একাকীত্ব বা শোষণের অনুভূতি, তা আসলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই এক বৈশ্বিক রূপ। ফলে কবির লড়াই তখন কেবল নিজের শিকড় খোঁজার থাকে না, তা হয়ে ওঠে বিশ্বজুড়ে সমস্ত বঞ্চিত ও ঘরছাড়া মানুষের অধিকার আদায়ের এক সামষ্টিক প্রতিরোধ।
চেতনার এই বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক বিস্তার কেবল কবিতার বিষয়েই প্রতিফলিত হয় না, কাব্যিক গঠনশৈলীর দিক থেকেও এই লড়াই অত্যন্ত মার্জিত এবং সুমিত। ছন্দের ওপর তীব্র দখল রেখেও সেই চেনা ছন্দের ভেতরেই আনা হয় আধুনিক মননের জটিল মোচড়। পরবাসে মাতৃভাষার চর্চা করা, নিজের হরফ ও শব্দের সাথে প্রতিদিনের ঘরকন্না করাটাই একটা বড় সংগ্রাম।
কবি যখন কবিতা লেখেন, তখন তিনি ভাষার ক্ল্যাসিকাল ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করেন, কিন্তু তাঁর প্রকাশের ভঙ্গিটি হয়ে ওঠে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক। তিনি প্রবাসের রুক্ষ বাস্তবতাকে প্রকাশ করতে গিয়ে ভাষার চিরন্তন মাধুর্যকে ভেঙে চুরমার করেন, গদ্যের ঠাসবুনন নিয়ে আসেন কবিতার শরীরে, আবার পরক্ষণেই এক গভীর মায়াময় ছন্দে ফিরে যান। ছন্দের এই ভাঙা-গড়ার খেলাই মূলত তাঁর ভেতরের অস্থিরতা ও সুস্থিতির মধ্যকার চিরন্তন লড়াইকে অবয়ব দেয়।
এই সাহিত্য আসলে এক ধরণের ‘প্রতিরোধের দলিল’। এটি সময়ের বিরুদ্ধে, ভূগোলের বিরুদ্ধে এবং বিস্মৃতির বিরুদ্ধে কবির এক নিঃসঙ্গ কিন্তু বীরত্বপূর্ণ লড়াই। একজন কবি যখন তাঁর শিকড় থেকে হাজার মাইল দূরে বসে শব্দ সাজান, তখন তিনি প্রমাণ করেন যে ভৌগোলিক সীমানা মানুষের চেতনাকে বেঁধে রাখতে পারে না। এই পরবাস-জীবন কবিকে কেবল নিঃস্বই করে না, বরং তাকে দেয় এক নতুন দূরবীণ—যা দিয়ে তিনি নিজের দেশ ও পরদেশকে এক সুষম দূরত্ব থেকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন। তাই এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোনো পরাজয়ের গল্প নয়; বরং এটি হলো ভাষার শক্তিতে, স্মৃতির শক্তিতে এবং সংস্কৃতির দ্বান্দ্বিক মেলবন্ধনে এক নতুন মানবতাবোধের জয়গান।







