সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ
সময়কাল ১৯৯৪। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে কলকাতায় গিয়েছিলাম বইমেলা দেখতে। তখন ময়দানে বইমেলা হতো। বিশাল বইমেলা। বাড়ির পাশেই এতো বড় একটা বইমেলা হয় আর সেটা দেখবোনা তা কী হয়! সেবার প্রায় একমাস কলকাতায় ছিলাম। সেটাই ছিল আমার প্রথম কলকাতায় যাওয়া। কলকাতা শহরটা আমার দাদা-নানাদের কাছে ডাল-ভাত ছিল। একটা গামছা কিনতে হবে, চলো কলকাতা। সিনেমা দেখতে হবে, দল বেঁধে কলকাতায় গিয়ে হাজির। আমার দাদা সৈয়দ রোস্তম আলী কলকাতায় ব্যবসা করতেন। তাঁর মৃত্যুও হয় সেখানে। গড়ের মাঠের পাশে তাঁকে কবর দেয়া হয়।
সেবার সেবার কলকাতায় যাওয়ার নেপথ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল প্রকাশকবন্ধু সিকদার আবুল বাশারের। বিশেষ করে তারই চাপাচাপিকে কলকাতায় যাওয়া। সেবার অনেক কবি-লেখকের সাথে দেখা করেছিলাম। তাদের মধ্যে দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ অন্যতম। আমি যখন কলেজে পড়ি সেসময় থেকেই দেশ পত্রিকা পড়া শুরু করি। তখন থেকেই এই কিংবদন্তি সম্পাদকের সাথে দেখার করার ইচ্ছে ছিল । আরো পরে তাঁর লেখা একটি পেরেকের কাহিনী ও হীরের নাকছাবি বই দু’খানা পড়ার পর থেকে আমি তার ভক্ত হয়ে যাই। সে কারণে কলকাতায় যাবার পর সাগরময় ঘোষের সাথে দেখা করার অভিপ্রায়ে একদিন কলকাতার ৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিটে আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। এটাই দেশ পত্রিকার অফিস। রিসিপশনে নিজের নাম-পরিচয় ও কার সাথে দেখা করবো সেটা বলে এবং খাতায় এন্ট্রি করে গলায় ভিজিটর্স কার্ড ঝুলিয়ে সোজা চলে গেলাম দেশ পত্রিকার অফিসে।
সাগরময় ঘোষের সাথে দেখা করার জন্য স্লিপ পাঠালাম। তিনি ব্যস্ত মানুষ, দেখা করতে রাজি হলেন না।
আমি পিয়নটাকে আবার পাঠালাম। বললাম– ওনাকে গিয়ে বলো, আমি ঢাকা থেকে এসেছি। জাস্ট পাঁচ মিনিট কথা বলবো।
ঢাকা থেকে গিয়েছি শুনে রাজি হলেন। পিয়নকে বললেন- ওনাকে বলবে আজ আমার একটা বিশেষ মিটিং আছে। পাঁচ মিনিট যেন পাঁচ মিনিটই হয়। সেটা যেন ছয় কোনভাবেই মিনিট না হয়।
আমি তাতেই রাজি হয়ে গেলাম। আমার তো কোন কথা নেই। এই কিংবদন্তী সম্পাদককে আমি তো শুধু সামনে থেকে দেখবো সেটাই আমার উদ্দেশ্য। পারমিশন নিয়ে ওনার রুমে ঢুকলাম। আমার দিয়ে না তাকিয়েই তিনি গম্ভীর গলায় বললেন– বসুন।
আমি ওনার উল্টোদিকের চেয়ারে বসলাম। উনি কাজপাগল মানুষ। ফাইলে মুখ রেখেই বললেন– আজকে আমি আপনাকে মোটেও সময় দিতে পারবো না। আমার একটা জরুরি মিটিং আছে। কাল বা অন্যদিন আসুন, জমিয়ে কথা বলা যাবে।
এরপর একটু থেমে আবার বললেন– বলুন কী দরকারে এসেছেন?
আমি বললাম– না, আমি কোন দরকারে আসিনি। কলেজে ওঠার পর থেকে দেশ পত্রিকা পড়ি। সেজন্যে আপনাকে একবার সামনে থেকে দেখবো বলে এসেছি।
এটা শুনে চোখ তুলে তাকালেন। আমাকে ভালো করে দেখলেন। তারপর বললেন– ও আচ্ছা।
পিয়নকে ডেকে চা-বিস্কুট দিতে বললেন। এরপর বললেন– ঢাকায় কোথায় থাকেন?
আমি বললাম– ঢাকার মেরাজনগর।
তিনি বললেন– এটা কোথায়?
আমি বললাম– যাত্রাবাড়ির দিকেশনির আখড়ার কাছে।
তিনি বললেন– ঢাকাটাকে আমার সেভাবে ঘুরে দেখা হয়নি। আর ঢাকা তো এখন অনেক বড় শহর হয়ে গেছে। আমরা চাঁদপুরের মানুষ। আমাদের বাড়িঘর তো এখন মেঘনার জলের তলে।
চা আর টোস্ট বিস্কুট এলো। সাগরময় ঘোষ তাঁর ছেলেবেলার কথা শুরু করলেন। তিনি বললেন– আমাদের বাড়িটা ছিল বিশাল। বড় পুকুর ছিল। কত যে মাছ ছিল সে পুকুরে। ফলের বাগান? আমাদের বাগানে ছিল না এমন কোন ফল ছিল না। বলতে গেলে জমিদার ছিলাম। সব ফেলে চলে এলাম এই দেশে, পরবাসে। এখনও পরবাসী হয়ে আছি। এখানে এখনও আমাদেরকে ‘রিফিউজি’ শব্দটা শুনতে হয়। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
আমার মনে হয়, বাকি আলোচনায় যাওয়ার আগে সাগরময় ঘোষ সম্পর্কে স্বল্প পরিসরে একটি আলোচনা করা দরকার। কেননা, সবাই যে তাঁর সম্পর্কে জোনেন তেমটিও নয়। সাগরময় ঘোষ একজন স্বনামখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক ও সম্পাদক। যাকে লিজেন্ড (কিংবদন্তী) সম্পাদক বলা হয়। তিনি প্রায় ষাট বছর কলকাতার দেশ পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন দীর্ঘদিন। পরিণত হয়েছিলেন একজন জীবন্ত কিংবদন্তী সম্পাদক হিসেবে। ১৯৯৯ সালে তার মৃত্যর পর লন্ডনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকা তাকে ‘বাংলাসাহিত্যের বাঘ’ হিসেবে অভিহিত করে।
সাগরময় ঘোষের জন্ম ১৯১২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশের চাঁদপুরের একটি বর্ধিষ্ণু পরিবারে। চাঁদপুরেই ছিল তাদের পৈতৃক ভিটা। কালের বিবর্তনে মেঘনা নদীর ভাঙনে হারিয়ে গেছে তাদের সেই পৈতৃক ভিটা। তার পিতা কালিমোহন ঘোষ ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সহচর। মা মনোরমা দেবীও ছিলেন একজন সাহিত্যমনা মানুষ। তাদের বাড়িটি ছিল সাহিত্যের একটি পীঠস্থান। নিয়মিত সাহিত্য আড্ডা বসতো। দেশের খ্যাতিমানকবি-সাহিত্যিকরা সে সাহিত্য আড্ডা সরগরম করে রাখতেন। সাগরময়ের জ্যেষ্ঠ্য ভ্রাতা (দাদা) শান্তিদেব ঘোষ ছিলেন রবীন্দ্র সঙ্গীতের একজন বিশিষ্ট সাধক। তিনি ভারতের ‘জাতীয় পণ্ডিত’ হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের পাঠ চুকিয়ে খুব ছেলেবেলায়ই সাগরময় ঘোষ পরিবারের সাথে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। কেন গিয়েছিলেন সে কথা বললেন সবিস্তারে। তখন সাগরময়ের বয়স খুব বেশি নয়। তারপরও সেসময়ের সেই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার নির্মম দৃশ্যগুলো কোনদিন ভুলতে পারেননি। তারপরও নজের দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবেসে গেছেন আমৃত্যু। চাঁদপুরের ছেলেবেলার দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কতোবার যে ওনার চোখ জলে ভিজে গেছে সেটা নাই বললাম। রুমালে চোখ মুছে তিনি বললেন– এই দেশে এতো বছর আছি। এতো নাম-ডাক, এতো যশ-খ্যাতি, প্রতিপত্তি– তারপরও বুকের ভেতরে একটা কষ্ট রয়েই গেছে। সবসময় মনে হয়, এ আমার দেশ নয়। এখনও মানুষ আড়ালে ‘রিফিউজি’ বলে। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে একথা শুনতে হবে। আমরা তো আমাদের বাড়ি-ঘর, সাজানো সংসার ফেলে দেশ ছেড়ে আসতে চাইনি। তারপরও আসতে হলো।
এ পর্যন্ত বলে একটা থামলেন। চুপ করে থাকলেন। একটু পরে আবার বললেন– শোনো, তোমাকে একটা কথা বলি। এই কথাটা আমি কোনদিন কাউকে বলিনি। বাংলাদেশ ছেড়ে যদি হিন্দুরা চলে না আসতো তাহলে ওই দেশটা আরো অনেক সমৃদ্ধ হতো। যাদের কারণে হিন্দুরা দেশ ছেড়ে চলে এসেছিল তাদের অনেকের সাথে পরে আমার কথা হয়েছে। পরে তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
সাগরময় ঘোষ পড়াশোনা করেন শান্তি নিকেতনে। তিনি রবীন্দ্রনাথের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন রবীন্দ্র গবেষক। শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নকালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে সাহিত্য ও সঙ্গীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ জন্মে এবং মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ ভক্ত। তিনি প্রায়শই বলতেন– ’আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে এই পৃথিবীতে জন্মে তুমি কী পেলে? তার উত্তরে আমি বলবো– ‘রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ।’
দেশ পত্রিকায় যোগদানের পর তার ওপর অর্পিত প্রথম দায়িত্ব ছিল, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে একটা কবিতা আর একটা গল্প সংগ্রহ করা। তিনি সেটা করতে পেরেছিলেন। কবিগুরুর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ১৯৩৯ সালে তিনি যে গল্পটি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন তার নাম ‘শেষ কথা’।
সাগরময় ঘোষ ছিলেন নারকেলের মতো একজন মানুষ। বাইরে থেকে গুরুগম্ভীর স্বভাবের মানুষ মনে হলেও ভেতরে ছিলেন কোমল প্রকৃতির। ভীষণ কাজপাগল হলেও আড্ডা দিতে খুব পছন্দ করতেন। ব্যবহারে ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ও বিনয়ী। দেশ পত্রিকা ছিল তাঁর ‘দ্বিতীয় ঘর’। নিয়মনিষ্ঠাকে তিনি জীবনভর কঠোরভাবে মেনে চলতেন। গুরুগম্ভীর দেখালেও সবসময় হাসিখুশি থাকতেন। যার কারণে ব্যক্তি জীবনে তিনি পেয়েছিলেন সুস্বাস্থ্য ও প্রসন্নতা। একদিন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছড়া কেটে বলেছিলেন–
‘সাগরদাদা আপনি বুড়ো হলেন না বিলকুল,
পঁচাত্তরেও তরতাজা মন, ভ্রমরকৃষ্ণ চুল।’
সাগরময় ঘোষের সাথের সেই পাঁচ মিনিট গিয়ে দাঁড়ালো প্রায় পাঁচ ঘন্টায়। তিনি সেদিনের মিটিং বাতিল করলেন। আমার জন্য খারার আনালেন। সারাটা দুপুর ফেলে আসা ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করলেন।
ওঠার আগে বললেন– জানিনা নিজের কাজ ফেলে আজ তোমার সাথে এতো কথা ক্যানো বললাম। আমার অনেক কাজের ক্ষতি হলো, তারপরও বলবো– অনেকদিন পরে তোমার সাথে একটা ভালো দিন কাটলো। মনের ভার অনেকটা লাঘব হলো। এখন নিজেকে অনেকটা হাল্কা লাগছে। কলকাতায় এলেই আমার সাথে দেখা করবে।
তার পরিবার কেন দেশ ছেড়েছিলেন যদিও এখানে সব কথা লেখা গেল না। ওনার কথা শুনে আমারও বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। আমার একটা কথায় মনে হলো, প্রতিটা মানুষের ভেতরে আরো একজন মানুষ থাকে। যাকে বাইরে থেকে দেখা যায় না। হাসির আড়ালে সে মানুষটা লুকিয়ে থাকে।
এরপর অনেকবার কলকাতায় গেলেও বিভিন্ন ব্যস্ততায় যাই, যাচ্ছি, যাবো করে সাগরময় ঘোষের সাথে আর দেখা করা হয়নি। ১৯৯৯ সালের ২২ জুন ৮৬ বছর বয়সে সাগরময় ঘোষ কলকাতায় মারা যান।
প্রিয় এই লেখকের ২৭তম মৃত্যুদিবসে তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা…







