প্রচ্ছদগল্পউপন্যাসএকজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

ধারাবাহিক উপন্যাস: নেয়ামত ইমাম

একজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

নেয়ামত ইমাম 

দ্বিতীয় খণ্ড

১.

আরামবাগে রফিকুল্লার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরে আসার চার ঘন্টার মধ্যে আমাকে আটক করা হয়। তখন রাত নেমে এসেছে এবং দক্ষিণ পাইকপাড়ায় কমে এসেছে মানুষের হাঁটাচলা। সামিয়ানা তখনো ফেরেনি। কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খুলতেই দেখি চারজন লোক আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের একজন আমাকে আমার নাম জিজ্ঞাসা করে এবং বলে আমাকে তাদের সঙ্গে এখনি যেতে হবে। “আপনারা কে?” এ কথা জানতে চাইলে দ্বিতীয় লোকটি বলে, “আপনিই বলুন না কেন আমরা কে?” “তাই নাকি?” আমি বলি। “আপনারা আমার বাসায় এসেছেন, আমাকে আপনাদের সঙ্গে যেতে বলছেন, কিন্তু বলছেন আমাকে বলতে হবে আপনারা কে? কি আজব ব্যাপার।” “আমরা কে সে সম্পর্কে আপনার খুব ভালো ধারণা আছে,” প্রথম লোকটি বলে। “যদি না থাকতো, তাহলে আপনি এতক্ষণ শান্ত থাকতেন না।” তার কথার জের ধরে দ্বিতীয় লোকটি বলে, “আপনি নিশ্চয়ই জানতেন আমরা আসছি। আপনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।” “আপনারা কি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোক?” একথা জিজ্ঞেস করলে তারা কোনো জবাব দেয় না। “কি কারণে আমাকে আপনাদের সঙ্গে যেতে হবে?” এমনটি জিজ্ঞেস করলেও ওই একই ফল হয়। তাদের দুজন আমার বাহুতে ধরে টানে, বলে, “আসুন।” আমি শুধু একটি প্যান্ট পরে ছিলাম। “আমাকে অন্ততঃ একটি জামা গায়ে জড়াবার সুযোগ দিন,” আমি বলি। “কেমন শীতের দিন। তা ছাড়া, খালি গায়ে আমি কখনো ঘরের বাইরে যাই না।” তখন তৃতীয় একজন লোক আমার পাশ কাটিয়ে দ্রুত ঘরের ভেতরে যায় এবং চেয়ারের পিঠ থেকে আমার জামাটি তুলে আনে। দরজায় দাঁড়িয়ে জামাটি গায়ে জড়াবার সময় আমি বলি, “কোথাও নিশ্চয়ই ভুল হয়েছে। আমি এমন কোনো অপরাধ করিনি যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোক আমার দরজায় এসে হাজির হবে। তাও আবার রাতের বেলায়।” তৃতীয় লোকটির উচ্চতা হবে আমার চেয়ে বেশি। সে আমার মুখের খুব কাছে চলে আসে, তারপর বলে, “এরকম কথা প্রায় সবাই বলে। এরকম কথা আজও কেউ বলেছে।” তাতে বাকিরা হেসে ওঠে। তার পেছনের লোকটি বলে, “যেমন পল্লবীতে, সকাল নয়টায়। তালতলায়, বিকেল আড়াইটায়।” “এসব বলে পার পাওয়া যাবে না, বুঝতে পেরেছেন?” তৃতীয় লোকটি বলে। “আমি তো পার পেতে চাই না,” আমি বলি। “আমি শুধু আমার অপরাধ কি তা জানতে চাই। দেশে কি আইন-কানুন কিছু নাই নাকি? একজন সাধারণ মানুষকে এভাবে হেনস্থা করার কী অর্থ থাকতে পারে!” তৃতীয় লোকটির ইশারায় সিনা ধরে ধাক্কা মেরে প্রথম ও দ্বিতীয় লোক আমাকে পথে নামিয়ে আনে। সেখানে আমি আরো কয়েকজন লোককে দেখতে পাই। তাদের সঙ্গে দাঁড়ানো থাকে তিনটি গাড়ি। তারা আমাকে মধ্যের গাড়িটিতে তুলে নেয় এবং নতুন বাজারের মধ্য দিয়ে চলে মিরপুর রোডের দিকে যেতে থাকে। 

“আমাকে আপনারা কেন নিতে এসেছেন,” আমি বলি, “তা কি এখন বলা যাবে? তাহলে আমি সত্যিই বুঝতে পারতাম আমার দোষ কোথায়।” গাড়ির চালক, আমার দুপাশে বসা প্রথম ও দ্বিতীয় লোক চুপ করে থাকে। সামনে যাত্রীর আসনে যে লোকটি বসা থাকে সে পেছনে তাকায় এবং নিজেকে মোহাম্মদ ইসহাক বলে পরিচিত করে। “সময়ে আপনাকে পুরো ফাইল দেখানো হবে,” সে বলে। “আগাগোড়া সব বিশ্লেষণ করে বলা হবে। আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে তখন তার উত্তর পাবেন।” তার গলার স্বর পরিষ্কার, কথা বলার ভঙ্গি বেশ মার্জিত। সে হতে পারে তাদের অধিকর্তা বা ব্যবস্থাপক। “আপনি শুরু থেকে আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন,” সে আরো বলে, “তা আমরা লক্ষ করেছি। আমাদের আসতে দেখে অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তি পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। অনেকে আবার হাতের কাছে থাকা যে কোনো বস্তু তুলে ভয় দেখায় এবং এভাবে পরিস্থিতি তাদের নিজেদের জন্য আরো জটিল করে তোলে। অনেকে আমাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়, যে জন্য দরজা ভেঙ্গেই তবে আমাদেরকে তাদের আটক করার ভয়ঙ্কর কাজটি করতে হয়। আপনি এসবের কিছুই করেননি। আপনার ফাইলে আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করবো।”

“আমি একজন বিক্রয় প্রতিনিধি,” আমি বলি। “আইন সম্পর্কে আমি তেমন কিছ্ইু জানি না। তবে আমি এটুকু জানি যে কোনো প্রকার কাগজপত্র যেমন কোর্টের নির্দেশ ছাড়া আপনারা কারো বাড়িতে এসে কাউকে এভাবে ধরে নিয়ে যেতে পারেন না। বুঝতে পারছেন?” তাতে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না বলে আমি আরো বলি, “আপনাদের বাসায় যদি এভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোক এসে হাজির হতো এবং আপনাদেরকে তাদের সঙ্গে যেতে বলতো, তাতে আপনারা কি যেতেন? আপনারা কি জানতে চাইতেন না আপনাদের অপরাধ কোথায়?” তাতে মোহাম্মদ ইসহাক আবার পেছনে তাকায়। “আমাদেরকে আইন শিখাতে আসবেন না,” সে বলে। “তা ছাড়া, এমন একটি পরিস্থিতিতে আমরা কি করতাম বা না করতাম, সে কথা উঠছে কেন? এখানে কি আমাদেরকে কেউ ধরে নিয়ে যাচ্ছে?”

হঠাৎ করে আমার মনে হয় এসবের পেছনে হয়তো ডা. শ্যামল দত্তের হাত রয়েছে। রফিকুল্লা আজ তাকে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য এক রকম জোর করে কমলাপুরে নিয়ে এসেছে। সেখানে আমার পৌঁছাবার আগে তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছে আমি তা জানি না। আমি জানি না ঠিক কোন শর্ত মেনে শ্যামল দত্ত আমাদের অফারগুলো গ্রহণ করতে রাজি হয়েছেন, যদিও জানি সেগুলো তিনি উপেক্ষা করে গেছেন মাসের পর মাস। হয়তো তিনি রফিকুল্লার চাপে পড়ে চুক্তির ব্যাপারে রাজি হয়েছেন, কিন্তু তার বাসা থেকে বেরোনোর পর সোজা চলে গেছেন থানায়, যেখানে কাগজপত্র তৈরি করতে কয়েক ঘন্টা লেগেছে এবং তারপর জরুরি ভিত্তিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোক নেমে গেছে আমার খোঁজে। একজন দুরূহ বিক্রয় প্রতিনিধির চাপ কিভাবে মোকাবিলা করতে হয় তা তার জানা থাকারই কথা। আমার জানামতে কয়েক বছর ধরে ডায়নামিক মোটর্স প্রতিষ্ঠানটি তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গেই চালিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে আমার পক্ষ থেকে রফিকুল্লা তাকে প্রচুর পরিমাণে চাপ দিলেও এবং সে চাপের কাছে সাময়িকভাবে মাথা নত করলেও রফিকুল্লার বাসা থেকে বেরিয়ে তিনি ফিরে গেছেন তার নিজস্ব অবস্থানে এবং ফল স্বরূপ এখন আমি বসে আছি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকের সঙ্গে। 

তবে আমি এ কথাও নিশ্চিত করে বলতে পারি না আমার বর্তমান অবস্থার পেছনে সুমন এন্টারপ্রাইজের মোহাম্মদ আশরাফ খানের হাত নেই। যদিও আমাদের মধ্যকার চুক্তিপত্র পাকা হবার পর কয়েকটি দিন চলে গেছে এবং এ সময়ে তার কাছ থেকে আমি কিছু শুনতে পাইনি, এই মুহূর্তে আমার মনে হয় সুমন এন্টারপ্রাইজ থেকে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশা না করা হবে নিছক বালকসুলভ কাজ। চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে আশরাফ খান আমাদের অফিস পর্যন্ত এসেছেন – এর মধ্যে যদিও আমি তখন রফিকুল্লা এবং তার পরিচিতদের ক্ষমতার প্রতিফলন দেখতে পেয়েছি, আমার মনে হয় বিগত কয়েকটি দিনের মধ্যে তিনি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিভাবে আমাকে চূড়ান্তভাবে শাস্তি প্রদান করা যায় তার উপায় খুঁজে বের করেছেন এবং সেজন্য এখন আমাকে তুলে নেওয়া হচ্ছে। এজন্য হয়তো রফিকুল্লাকেও ইতোমধ্যে তুলে নেয়া হয়েছে, যা আমি জানি না। হয়তো থানায় গিয়ে আমি তাকে আমার সামনে একই অভিযোগে অভিযুক্ত দেখতে পাবো। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনে হয় চুক্তির কাগজপত্রগুলো বিবেচনা করলে সেখানে রফিকুল্লাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে শুধু আমাকে, যে কারণে তাকে হয়তো আটক করা হবে না। আবার ভাবি যেসব প্রভাবশালী লোকের সঙ্গে তার ওঠা-বসা, যাদের নাম-ঠিকানা আমার জানা নেই, তাদের হাত হয়তো এমন লম্বা যে তা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সে ক্ষেত্রে সে হতে পারে তাদের নিজস্ব লোক। যদি তাই হয়, তবে তাকে আটক করা হোক তারা নিশ্চয়ই এমনটি চাইবে না। এর অর্থ খুবই স্পষ্ট। এর অর্থ তাকে নয়, শক্তি খাটিয়ে চুক্তি পাকা করবার অপরাধে শুধু আমাকেই এর মাশুল দিতে হবে। 

মিরপুর রোডে থানা কমপ্লেক্সের দিকে না গিয়ে গাড়িগুলো বাঁক নেয় বিপরীত দিকে। লোকগুলো কোনো ইউনিফর্ম পরা ছিল না এবং তাদের গাড়িগুলোও পুলিশের গাড়ি ছিল না। ব্যাপারটি আমাকে শুরু থেকেই ভাবিয়ে তুললেও আমি তা ভুলে থাকতে চেষ্টা করি। আমি জানতাম গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা অনেক সময় ইউনিফর্ম পরে অভিযানে বেরোয় না। তাতে তারা সহজেই অপরাধীর খুব কাছে চলে যেতে পারে। কিন্তু গাড়িগুলো থানার দিকে যাচ্ছে না দেখে আমি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ি এবং মোহাম্মদ ইসহাককে জিজ্ঞেস করি, “আপনারা কি আমাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছেন না?” তাতে তিনি সামনের দিকে তাকিয়েই জবাব দেন, “আমরা কি বলেছি আমরা আপনাকে থানায় নিয়ে যাচ্ছি? কি রকম মানুষ আপনি? কিছুক্ষণ মুখ বন্ধ করে রাখতে পারেন না? তা পারবেন কেন। এটাই তো আপনার অভ্যাস।” “তো আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?” আমি বলি। “আমি যেহেতু এই থানার বাসিন্দা, আমার কোনো অপরাধ থাকলে আমাকে এই থানায় সোপর্দ করুন।” আমার ডান পাশের লোকটি এবার কথা বলে। “আপনাকে মাত্র বলা হলো আপনি আমাদের সঙ্গে শুরু থেকে সহযোগিতা করছেন এবং সেজন্য আমরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আপনি দেখছি আস্তে আস্তে সে অবস্থা থেকে সরে যাচ্ছেন। আপনাকে এই থানায় না কি অন্য কোনো থানায় সোপর্দ করা হবে বা আদৌ কোনো থানায় সোপর্দ করা হবে কি না তা আমাদের ব্যাপার। তা জানলে কি আপনার অপরাধের মাত্রা কমে যাবে?” বাম পাশের লোকটি এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে মুখ খোলে, বলে, “কথা না বলে চুপ করে বসে থাকলে আপনি হয়তো আমাদের সমর্থন পাবেন। আমাদের সমর্থন পাওয়াটাকে আপনি সম্ভবতঃ এখনও খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না। এখানে আপনার যে অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে তা ধরা পড়ে। আপনি আমাদের অনুগত থেকেছেন, আমাদের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াননি তা আপনার ব্যক্তিত্বের ওপর আলোকপাত করে। পুরো বিষয়টা কিভাবে যাবে তার ওপর এটা একটা তারকা চিহ্ন হিসাবে ঝুলে থাকে। ন্যায় ও সুবিচারের ক্ষেত্রে এমন ধরনের তারকা চিহ্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং কথা না বলে অপেক্ষা করুন।”

কেন আমাকে তুলে আনা হয়েছে – এই বিষয়ে তারা যেহেতু আমাকে কিছু বলছে না এবং যেহেতু আমাকে তারা থানায়ও নিয়ে যাচ্ছে না, তাতে এটুকু স্পষ্ট যে আমি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত নই। কয়েক  সেকেন্ডের জন্য আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। কিন্তু সামনের সিটের মোহাম্মদ ইসহাক বলে ওঠে, “আপনার মনে রাখা উচিত আপনার বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগগুলো গুরুতর না হলে এতগুলো লোক নিয়ে দিনের এই সময়ে আমরা আপনাকে তুলে নিতে আসতাম না। আমাদের মধ্যে অনেকগুলো দল রয়েছে যারা বেশি বা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলার জন্য কিংবা ঘন ঘন প্রশ্ন করবার জন্য অভিযুক্তদের মারধোর করে। এমন অনেক অপরাধীর কথা আমি জানি গাড়িতে তোলার আগেই যাদের হাড়গোড় ভেঙ্গে যায়, নাক ফেটে রক্ত বেরোয় বা দুই-তিনটা দাঁত পড়ে যায়। অনেককে এমনভাবে পিটানো হয় যে তাদের জ্বর উঠে যায়। গাড়িতে বসে তারা ভয়ে কাঁপতে থাকে। আপনার ভাগ্য ভালো যে আমাদের দলটা এরকম মারধোরে বিশ্বাস করে না। আপনি নিজেই তা দেখেছেন বা এখনও দেখছেন। আমাদেরও পরিবার-পরিজন আছে। আমরাও রাতে ভালো করে ঘুমাতে চাই। সুতরাং নিজেকে একটু সংযত করুন এবং আমাদেরকে রেহাই দিন।” তার কথা শুনে চুপ করে বসে থাকা ছাড়া আমার আর কিছু করার থাকে না।

গাড়িগুলো বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে, মহাখালী অতিক্রম করে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে চলে ২ নম্বর সেক্টরের ৮ নম্বর রোড ধরে উত্তর দিকে অগ্রসর হয় এবং আফতাবনগর লেকের ওপর নির্মিত বহুতল বিশিষ্ট একটি ভবনের গেইটে এসে থামে। ভবনের প্রহরিটি একটি চেয়ারে বসেছিল। সে উঠে আমাদের জন্য নীলাভ গ্রীলের কলাপ্সিবল গেইটটি খুলে একপাশে সরে দাঁড়ায়। গেইট দিয়ে ভেতরে ঢোকার পর আমাকে নিচতলার একটি সাজানো অফিস কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে সরদার আমিরুল ইসলাম নামক একজন কর্মকর্তার হাতে সোপর্দ করা হয়। আমি বুঝি সরদার আমিরুল ইসলাম একজন শান্ত মাথার লোক এবং তিনি এতক্ষণ ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তার সামনে বাদামী রঙের একটি ফাইল ছিল এবং সে ফাইলে ছিল মাত্র দুটি কাগজ। এর প্রথমটি হাতে নিয়ে তিনি আমাকে আমার নাম, আমার বাবার নাম ও আমার বর্তমান ঠিকানা জিজ্ঞেস করেন এবং কাগজে থাকা তথ্যের সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে নেন। কাজটি তিনি করেন আমার দিকে না তাকিয়েই। “আজ এর চেয়ে বেশি কিছু করা যাবে না,” তিনি আমার পাশে দাঁড়ানো মোহাম্মদ ইসহাককে বলেন। “সব কিছু ঠিক থাকলে আগামিকাল সকালে বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি শুরু করা হবে।” তিনি তার দিকে একটি চাবি এগিয়ে দেন এবং বলেন, “কক্ষ নম্বর ২১৩। দোতলা।” চাবিটি হাতে নিয়ে মোহাম্মদ ইসহাক আমাকে তার সঙ্গে আসতে বলেন। কিন্তু সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে আমি একটু উচ্চস্বরেই বলি, “বিচার! কিসের বিচার? আমার অপরাধ কি?” গাড়িতে আমার পাশে বসা লোক দুজন আমাকে বাহু ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইলে সরদার আমিরুল ইসলাম ইশারায় তাদেরকে থামতে বলেন এবং প্রথমবারের মতো আমার দিকে তাকান। “অভিযুক্তদের এখানে নিয়ে আসার পর আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তাদের অপরাধগুলোকে সনাক্ত করা,” তিনি বলেন। “প্রথমতঃ তারা এত বেশি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে যে সেগুলোর মধ্যে ঠিক কোনটির জন্য তাদেরকে এখানে আনা হতে পারে তা তারা বুঝে উঠতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ কখনো কখনো এমন হয় যে ছোট ছোট অপরাধগুলোকে তারা স্বীকার করে নিতে চায় না, যে কারণে বড় এবং অপেক্ষাকৃতভাবে গুরুতর অপরাধগুলোর প্রতি তারা যথাযথভাবে নজর দিতে পারে না। গত কয়েক বছরে আপনার কেইসের মতো অনেকগুলো কেইস আমার হাতে এসেছে। তার মধ্যে কয়েকটি কেইস আবার সারা জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেমন স্বাধীনতা দিবসের প্রোগ্রামে চাঁদপুর টাউনহলে জোড়া খুনের ঘটনা। গলাচিপায় এক রাতে আকস্মিকভাবে একই পরিবারের সাতজন লোকের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া। একজন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে আমি আপনাকে বলতে পারি আপনাকে কেন এখানে নিয়ে আসা হয়েছে এই প্রশ্নটি আমাকে জিজ্ঞেস না করে আজ রাতে আপনি বরং আপনার নিজেকে জিজ্ঞেস করুন। যদি তা করতে পারেন, তাহলে কালকের দিনটা আপনার জন্য কিছুটা সহজ হয়ে যাবে এবং আমাদেরকেও আপনাকে নিয়ে খুব বেশি সময় নষ্ট করতে হবে না। পরিষ্কার?” 

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা