নেয়ামত ইমাম
দ্বিতীয় খণ্ড
২.
২১৩ নম্বর কক্ষে আমার জন্য একটি বিছানা থাকে, থাকে একটি চেয়ার ও টেবিল, টেবিলের ওপর কিছু পানি। আমি কতক্ষণ শুয়ে-বসে কাটাই এবং সরদার আমিরুল ইসলামের শেষ কথাগুলোর অর্থ করার চেষ্টা করি। আমি বুঝতে পারি আমার অপরাধ গুরুতর, কিন্তু যা কোনোভাবেই বুঝতে পারি না তা হচ্ছে কোনটা আমার ক্ষেত্রে ছোট অপরাধ এবং কোনটা বড় অপরাধ হতে পারে। আমি জানি আমার জীবন খুব সরল। আমি কারো টাকা মেরে দেইনি, কাউকে অপমান করিনি, কোনো আইন ভাঙ্গিনি। আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার মতো এই শহরে কয়জন লোক পাওয়া যাবে, যদি একজনও পাওয়া যায়? পেশাগত জীবনে আমি লোভ দেখাইনি। আমি তা করিনি কারণ আমি আমাকে মিতব্যায়ী একজন মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে পেরেছি। এটি খুব কষ্টের একটি কাজ, সবাই তা পারে না। কিন্তু আমি তাতে সফল হয়েছি। একটি উদাহরন দেওয়া যাক। মাত্র দুটি প্যান্ট ব্যবহার করে আমি কাটিয়ে দিয়েছি গত আটটি বছর। আমার কোমর মোটা হয়ে যাতে এগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে না যায়, সে জন্য বিভিন্ন সময়ে আমাকে খাওয়া কমিয়ে দিতে হয়েছে এবং কাজটি আমি আনন্দের সঙ্গেই করেছি।
এজন্যই বোধ করি সামিয়ানার সঙ্গে আমার কিছু হয়নি। শুরু থেকেই তাকে আমার ভালো লেগেছে। সে যেভাবে কথা বলে, যেভাবে দাঁড়ায় বা বসে, যেভাবে কাপড় পরে, চুল আঁচড়ায় বা খোঁপা বাঁধে – সব আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু ইচ্ছা করেই আমি নিজেকে তার কাছ থেকে সরিয়ে রেখেছি। তার সামান্য চাওয়া-পাওয়া মেটানোর জন্য আমার কাছে বাড়তি টাকা ছিল না। তবুও হয়তো একদিন আমি তাকে আমার মনের কথাগুলো খুলে বলতাম, কিন্তু তাতে আমাকে আমার বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনের কঠোর প্রতিজ্ঞা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে হতো। এমন নয় যে এখনো আমি তার প্রতি আমার দায়িত্ব খুব করে পালন করছি। কখনো তাকে জানুয়ারিতে কয়েকটা টাকা পাঠালে ফেব্রুয়ারিতে কিছু পাঠাতে পারি না, ঔষধ কেনার জন্য ফেব্রুয়ারিতে তিনি অতিরিক্ত কিছু টাকা চেয়ে পাঠালে মার্চে তা করবো বলে অঙ্গিকার করবার পর মার্চে গিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। এরকম ছন্নছাড়া জীবন আমাকে প্রতিদিন কাঁদায়, কিন্তু তা শোধরাতে গিয়ে একটি দুর্বিসহ জীবনের কথা চিন্তা করতে গেলে আমার যন্ত্রণা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। না, আমি কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবো না। যে কোনো মূল্যে আমি নিজের জীবনকে একটু আরামদায়ক করতে চাই না — এটাই আমার শেষ কথা।
আমার দরজাটি বাইরে থেকে বন্ধ থাকে। দেয়ালের ওপর সুইচ টিপতেই কয়েক মিনিটের মধ্যে ছুটে আসে সাহাবুদ্দিন মিয়া, ভবনের রাত্রিকালীন পরিচর্যাকারী। “সাহাবুদ্দিন, আপনি কি আমাকে একটা ফোন করবার সুযোগ করে দিতে পারেন?” আমি বলি। “আমি যে এখন এখানে একজন লোককে তা জানাতে চাই।” “অবশ্যই,” সে বলে। “এটা কোনো ব্যাপারই নয়। কেউ ফোন করতে চাইলে তাকে ফোন করতে সুযোগ দেয়ার বিশেষ নির্দেশ আমাকে দেয়া আছে। ফোন করার জন্য এখানে একটা আলাদা কক্ষও আছে। সেখানে বসে আপনি প্রয়োজনমতো যাকে ইচ্ছা ফোন করতে পারেন। শুধু লক্ষ রাখতে হবে আপনার পরে কেউ ফোন করতে চাইলে তাদেরকে যেন বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে না হয়। আপনার ফোন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তাদের ফোনও হয়তো সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন রাতের বেলায় আপনি একটু বেশি সময় নিলে আমার মনে হয় কোনো অসুবিধা হবে না।”
আমার কক্ষ থেকে একটু দূরে একটি দরজা খুলে বাতি জ্বালিয়ে দেয় সাহাবুদ্দিন মিয়া। “ওই যে টেবিলের ওপর ফোন রাখা,” সে বলে। “যান, ডায়াল করুন। আমি আশেপাশেই থাকবো।” দরজাটি খোলা রেখে সে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়। আমি চেয়ারে বসি এবং রফিকুল্লার নম্বরে ফোন করি। রাত এখনো বেশি হয়নি। তার জেগে থাকার কথা। কয়েকবার রিং করে ফোনটি কেটে যায়। আমি আবার ডায়াল করি। এবার ফোনটি ধরে মাহরুবা। আমি তাকে এসব বিষয় জানাতে চাই না। মান-সম্মানের ব্যাপার। তা ছাড়া, হয়তো সে ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করবে। কে জানে। তাই “কেমন আছেন?” বলার পর বলি রফিকুল্লাকে একটু ডেকে দেয়া যাবে কি না। সে জানায় রফিকুল্লা ঘুমিয়ে পড়েছে। বিকেলের দিকে তার একটু শরীর খারাপ করেছিল, যে জন্য সে আজ একটু আগে বিছানায় চলে গেছে। একবার ভাবি তবুও তাকে ডেকে দিতে বলি, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় আমি এখনো জানি না কেন আমাকে তুলে আনা হয়েছে। কারণটি জানার পর যদি মনে হয় তাকে জানালে সে আমাকে সাহায্য করতে পারবে, তবেই তাকে কিছু জানানো ভালো, তার আগে নয়। সে আমার বন্ধু হলেও নিরাপত্তার খাতিরে এসব ব্যাপার যত কম সংখ্যক লোকের মধ্যে সীমিত রাখা যায় ততই ভালো।
আমাকে টেলিফোনটি নামিয়ে রাখতে দেখে সাহাবুদ্দিন মিয়া এগিয়ে আসে। “আজকের মতো আমাদের রাতের খাবার দেয়ার সময় পেরিয়ে গেছে,” সে বলে। “আপনি যদি এখানে আসার আগে কিছু না খেয়ে থাকেন, তাহলে আমি আপনাকে কিছু খেতে দিতে পারি।” এতক্ষণে আমি মনে করতে পারি আমি রাতের খাবার খাইনি। আমি তাকে তা বলি। “আমাদের এখানে রান্নাঘর আছে,” সে বলে। “আছে চিড়া, মুড়ি, চানাচুর, বনরুটি, সামান্য কয়েকটা কলা এবং কয়েক হালি ডিম। চাইলে আপনাকে ডিম ভেজে দিতে পারি। খুব বেশি সময় লাগবে না।” “এগুলো কি আপনার নিজের জন্য,” আমি জিজ্ঞেস করি, “কর্মকর্তাদের জন্য, না কি আমার মতো যাদেরকে এখানে আনা হয় তাদের জন্যও?” সে হাসে, বলে, “এগুলো যে কারো জন্য। তবে কর্মকর্তারা যেহেতু বাড়িতে গিয়ে খেতে পারেন, তাই এখানে যাদেরকে অভিযুক্ত হিসাবে নিয়ে আসা হয়, এগুলো সচরাচর তাদের জন্যই রাখা হয়ে থাকে।” আমি তার কাজ বাড়াতে চাই না বলে বলি আমাকে বাটিতে করে কয়েকটা মুড়ি এবং সামান্য কিছু চানাচুর দিলেই চলবে। কোনোভাবে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারলে কাল না হয় পেট পুরে খাওয়া যাবে। আমরা রান্নাঘরে যাই। সেখানে সে বাটিতে মুড়ি ঢালে এবং তাতে চানাচুর যোগ করে। “একটু সরিষার তেল দেই?” সে জিজ্ঞেস করে। “সরিষার তেলও আপনার কাছে আছে না কি,” আমি বলি। “থাকলে একটু দিন।”
বাটিটি আমার হাতে তুলে দিয়ে সে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে এবং আমার সঙ্গে আমার কক্ষের দরজায় আসে। “সেই কখন থেকে একটা জিনিশ আপনাকে জিজ্ঞেস করবো বলে ভাবছি,” আমি বলি। “এই যে আপনি আমাকে এখান থেকে নিয়ে গেলেন কোনো শিকল বা হাতকড়া পরানো ছাড়া, আপনার কি মনে হয়নি আমি দৌড়ে পালিয়ে যাবো?”
সে হাসে। বলে, “এমন একটি প্রশ্ন প্রথম প্রথম সবাই আমাকে করে। খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কে আটক থাকতে চায় বলুন। কিন্তু আপনাকে শিকল না পরালেও ভবনের কলাপ্সিবল গেইটটা তো বন্ধ। সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে আপনি পালাবেনই বা কেন। এই পর্যন্ত এখানে আমি যত লোককে দেখেছি, যাদের সংখ্যা হবে কমপক্ষে কয়েক হাজার, মাত্র তিনজন ছাড়া কেউই পালাতে চেষ্টা করেনি। তিনজনের মধ্যে দুজনকে আবার তুলে আনা হয় চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে। একজন চলে গিয়েছিল মেহেরপুর পর্যন্ত। আরেকজন ডুমুরিয়ার শহীদ স্মৃতি মহিলা কলেজ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লাভ হয়নি। আপনি যদি জানেন পালিয়ে গেলে আপনাকে আবার এখানে ফিরে আসতে হবে, তাহলে যে কোনো মূল্যে এরকম চিন্তা থেকে দূরে থাকবেন।” “তৃতীয় জন?” আমি জিজ্ঞেস করি। “তার কি হয়েছে?” “তাকে তুলে আনা হয়নি,” সে জবাব দেয়। “কেন?” আমি জিজ্ঞেস করি। “সে নিশ্চয়ই নির্দোষ ছিল। গোয়েন্দারা ভুল করেছে। এমন কোনো অপরাধের অভিযোগে তারা তাকে তুলে এনেছে যার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না।” সে আবার হাসে, তারপর বলে, “হয়তো সে মরে গেছে। হতে পারে না? না, আমি জানি না। আমি কাউকে জিজ্ঞেস করিনি।”







