হিমেল রিফাত
আমরা চাই–কেউ কথা বলুক। কথা বলুক পথ, হৃদয় কিংবা তৃতীয় চোখ। চোখ ও ঠোঁট সবারই আছে; কিন্তু সবার কি আছে সেই তৃতীয় চোখ, যা চিন্তা ও চেতনার জগতে শুদ্ধতার প্রশ্ন তোলে? এমন হৃদয় ও চোখের প্রত্যাশাতেই তরুণ প্রজন্মের কলমি রাহবর হিসেবে আরিফ আজাদকে দেখা যায়। তিনি মূলত গল্পকার ও গদ্যকার; নির্জলা শব্দের বুননে সত্য ও সুন্দরের বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান নির্মাণ করে ২০১৭ সালে ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ প্রকাশের পর পাঠকের হৃদয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর সুপ্ত স্বপ্ন–তরুণরা দুনিয়ার রঙে রঙিন হিমু না হয়ে সত্য ও সুন্দরের রঙে রঙিন সাজিদ হয়ে উঠুক। সেই লেখক এবার কবিতার কিতাব হাতে হাজির হয়েছেন–“কথা বলো জয়তুন বৃক্ষ”।
গ্রন্থের সূচনায় কবি ও চিন্তক মুসা আল হাফিজ বলেছেন, “ভালোবাসা কবির চিরায়ত খাবার।” আরিফ আজাদও গদ্যের পরিচিত সরলতা ও ভালোবাসার আবহ নিয়েই কবিতায় প্রবেশ করেছেন। ত্রিশটি কবিতায় সাজানো গ্রন্থের সূচনা ‘আকুতি’ দিয়ে। ‘স্মৃতির প্রতারণায়’ কবি হযরত বিলাল (রা.)-এর জীবনকে এমন গল্পময় সরলতায় হাজির করেন, যেন পাঠকের চোখের সামনে জেগে ওঠে সেই আদিম যুগ এবং অন্তরে উচ্চারিত হয়–“ফিদকা আবি ওয়া উম্মি ইয়া রাসূলুল্লাহ।” একই সঙ্গে কবিতাটি স্মরণ করিয়ে দেয় কবি ও গবেষক বাপ্পা আজিজের ‘মুয়াজ্জিন’ গ্রন্থকে।
‘প্রার্থনা’য় দুনিয়ার সুখের পরিবর্তে রবের স্মরণময় জীবন কামনা করেছেন কবি। ‘অপেক্ষা’ কবিতায় তাঁর সত্যপন্থী অবস্থান উচ্চারিত হয়েছে—-
“আমাদের শেকড় বড় গভীরে…
পৃথিবীর ইতিহাসে / আমরা বরাবরই ছিলাম সত্যের পক্ষে।
আমরা তলোয়ারের নিচে গর্দান পেতে দেওয়া / নবি ইবরাহিমের সন্তান।”
ফিলিস্তিন, মজলুম মানুষের মুক্তি ও প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা গ্রন্থটির গুরুত্বপূর্ণ সুর। ‘ইয়াহইয়ার লাঠি’তে ইয়াহইয়া সিনওয়ারের হাতে থাকা লাঠিকে কবি নবি মূসার লাঠির প্রতীকে পরিণত করেছেন। ‘প্রাচীন কিবলা’য় বায়তুল মাকদিসের প্রতি ভালোবাসা উচ্চারিত হয়েছে–“আমি তো তোমার দিক হতে কপাল ফিরিয়েছি / অন্তর কখনো ফিরাইনি।” আর ‘কথা বলো জয়তুন বৃক্ষ’ কবিতায় নিশ্চুপ পৃথিবীর বিবেককে জাগাতে কবি আহ্বান করেন–
“আজ তুমি কথা বলো হে যয়তুন বৃক্ষ;
আজ তুমি চিৎকার করে বলে দাও– ফিলিস্তিন শুধু ফিলিস্তিনিদের।”
এখানেই যয়তুন বৃক্ষ হয়ে ওঠে যুগের মুখপাত্র–নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং জালিমের বিরুদ্ধে বিবেকের প্রতীক।
জুলাই বিপ্লবের সময়ও কবির কলম নীরব থাকেনি। ‘আহ্বান’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেছেন–
“আজকে আসুন একসাথে হই, কণ্ঠে রাখি জোর / খুব দূরে নয়, খুব দূরে নয় আলোয় রাঙা ভোর।”
‘কেমন আছে আবু সাঈদের মা?’ কবিতায় ওয়াসিম আকরামের স্মৃতি আর ‘অভিশাপ’ কবিতায় স্বজনহারা মানুষের বেদনা জুলাইয়ের রক্তাক্ত বাস্তবতাকে ধারণ করেছে। ফলে গ্রন্থটি কেবল ধর্মীয় অনুভবের কবিতা নয়; এটি সময়, রাজনীতি, প্রতিরোধ ও মানবিক বেদনারও দলিল।
‘ব্যাপ্তি’ কবিতায় জীবন সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই মুসাফিরসুলভ জীবনবোধের সঙ্গে সুর মিলিয়ে কবি বলেছেন–“জীবন তো মাগরিবের আযান আর ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়ের মতোই সংক্ষিপ্ত।” (সহিহ বুখারি–৬৪১৬)। অন্যদিকে ‘কর্পোরেট ঈশ্বর সমীপে’ কবিতায় ভারতীয় আধিপত্যবাদ, পিলখানা ট্র্যাজেডি, সীমান্তহত্যা ও অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। ‘মহাকাব্যিক উপহাস’-এ জো বাইডেন ও নরেন্দ্র মোদির মতো ক্ষমতাধরদের মানবাধিকার ও শান্তির বয়ানের সঙ্গে বাস্তব পৃথিবীর যুদ্ধ-ধ্বংসযজ্ঞের বৈপরীত্যকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে।
‘শান্তির শর্তাবলী’তে কবি উপলব্ধি করেন–অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুধু সুমিষ্ট কবিতা যথেষ্ট নয়; সত্য ও ন্যায়ের জন্য প্রয়োজন প্রতিরোধের দৃঢ়তা। তাঁর উচ্চারণ–“শান্তির জন্য যুদ্ধ সর্বদা অনিবার্য”–আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আল মাহমুদের ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’র যুদ্ধচেতনার কথা।
তবে এই কাব্যের শেষ সুর কেবল প্রতিরোধ নয়; বরং প্রত্যাবর্তন। ‘এবার ভিন্ন কিছু হোক’ ও ‘জীবনের নোঙর’-এ কবি দুনিয়ার মোহ পেরিয়ে মদিনার প্রেমে আশ্রয় খুঁজেছেন–
“রোম, প্যারিস আর জাকার্তা চাই না / এই সবুজ গম্বুজের পাশে / আমি জীবনের নোঙর ফেলতে চাই।”
আরিফ আজাদের কবিতার সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এর ভাষার সরলতায়। কবিতার দুর্বোধ্যতার কারণে যে পাঠক কবিতাবিমুখ, তাঁর জন্য গল্পের মতো সাবলীল ভাষায় কবিতাকে হাজির করেছেন কবি। ফলে “কথা বলো জয়তুন বৃক্ষ” কেবল ত্রিশটি কবিতার সংকলন নয়; এটি সত্য, সৌন্দর্য, বিশ্বাস, প্রতিরোধ, স্মৃতি ও প্রত্যাবর্তনের এক সমবেত কাব্যিক উচ্চারণ। এক বোবা সময়ে কবি যখন একটি যয়তুন বৃক্ষকে কথা বলতে আহ্বান করেন, তখন প্রকৃতপক্ষে তিনি আমাদেরই বিবেককে ডাক দেন– কথা বলো, সত্যের পক্ষে কথা বলো।
………………………………
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক







