রাগীল
বিশ্বজিৎ মণ্ডল
প্রথম পর্ব
……….
পাড়ার লোকজন রাকেশ বিশ্বাসকে তার আসল নামের চেয়ে অন্য একটি নামেই বেশি চেনে—‘রাগীল’ বলে।
নামটা কে প্রথম দিয়েছিল, আজ আর কেউ মনে করতে পারে না। তবে নামটি এমনভাবে তার সঙ্গে মিশে গেছে যে, রাকেশ বিশ্বাস বললে অনেকে এক মুহূর্ত ভেবে নেয়, তারপর বলে—‘ওই যে রাগীল রাকেশ!’
রাকেশ অবশ্য এই নামটা পছন্দ করে না।
কেউ সামনে বললে চোখ দুটো কেমন কুঁচকে যায় তার। গলার স্বর ভারী হয়ে ওঠে।
—আমার নাম রাকেশ। রাগীল নয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই কথাটাও সে এমন রাগের সঙ্গে বলে যে, শুনে লোকজন আরও নিশ্চিত হয়—নামটা বুঝি ঠিকই দেওয়া হয়েছে।
রাকেশের বয়স এখন তেত্রিশ। ছোটখাটো ব্যবসা করে। খুব বড়লোক নয়, আবার সংসারে অভাবও নেই। স্ত্রী রূপসা, আর ছয় বছরের ছেলে অনিকেত—এই নিয়েই তার ছোট সংসার।
রূপসা শান্ত মেয়ে। বিয়ের প্রথম দিকে রাকেশের রাগকে সে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল, মানুষের স্বভাবের মধ্যে একটু-আধটু রাগ থাকতেই পারে। ভালোবাসা থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু বছর গড়াতে গড়াতে সে বুঝেছে, রাকেশের রাগ সাধারণ রাগ নয়। সামান্য কথায় তার মেজাজ বদলে যায়। কেউ তার কথা ঠিকমতো না বুঝলে রাগ, কেউ তাকে অপেক্ষা করালে রাগ, দোকানে ক্রেতা দরদাম করলে রাগ, বাড়িতে চা একটু দেরিতে এলে রাগ।
এমনকি কখনও কখনও নিজের ভুলের জন্যও সে অন্যের উপর রাগ করে বসে।
রূপসা তাই এখন মেপে মেপে কথা বলে।
কথা বলার আগে ভাবে—এই কথাটার কোন অংশে রাকেশ ভুল অর্থ খুঁজে নিতে পারে?
সেদিন সকালেও তার ব্যতিক্রম হল না।
অনিকেত স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বসেছিল। রূপসা তার টিফিনের বাক্সে খাবার ভরছিল। রাকেশ তখন বারান্দায় বসে মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছিল।
হঠাৎ সে চেঁচিয়ে উঠল—
—আমার কালো শার্টটা কোথায়?
রূপসা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল,
—কাল তো ধোয়ার জন্য দিয়েছিলাম। শুকোয়নি এখনও।
—শুকোয়নি?
—হ্যাঁ।
—তাহলে আগে বলোনি কেন?
রূপসা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
—তুমি তো জিজ্ঞেস করোনি।
কথাটা খুব স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু রাকেশের কাছে স্বাভাবিক থাকল না।
—সবকিছুর জবাব তৈরি থাকে তোমার! আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করলাম, তারও আবার যুক্তি!
রূপসা আর কিছু বলল না।
অনিকেত চুপচাপ বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার ছোট্ট মুখে একটা অদ্ভুত ভাব।
রাকেশ সেটা লক্ষ করল না।
সে আলমারি খুলে জামাকাপড় খুঁজতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পর অন্য একটি শার্ট বের করে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজাটা একটু জোরেই বন্ধ হল ।
অনিকেত ধীরে ধীরে মায়ের কাছে এসে দাঁড়াল।
—মা, বাবা আবার রাগ করেছে?
রূপসা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—না রে, বাবা একটু তাড়াহুড়োয় আছে।
অনিকেত কিছু বলল না।
শিশুরা বড়দের চেয়ে অনেক বেশি কিছু বুঝে ফেলে। শুধু তাদের বোঝার ভাষাটা আলাদা।
সেদিন স্কুলে যাওয়ার সময় অনিকেত মাকে বলেছিল,
—মা, বাবা কি আমাকে নিয়েও একদিন রাগ করবে?
রূপসার বুকটা কেঁপে উঠেছিল।
সে ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে বলেছিল,
—না, বাবা তোকে খুব ভালোবাসে।
কিন্তু নিজের মনকে সে কথাটা বলতে পারেনি।
কারণ রাকেশ ভালবাসে—এটা সত্যি। খুব ভালবাসে। অনিকেতের জন্য নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়েও খেলনা কিনে আনে, অসুখ হলে রাত জেগে থাকে, স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হলে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে।
তার ভালবাসায় কোনো খাদ নেই।
সমস্যা শুধু একটাই—রাগ উঠলে সে নিজেকে চিনতে পারে না।
রাগ কেটে গেলে আবার আগের রাকেশ। তখন নিজের আচরণের জন্য অনুতপ্ত হয়। কখনও রূপসার কাছে ক্ষমা চায়, কখনও ছেলেকে কোলে তুলে বলে,
—বাবা, আমি তোকে কষ্ট দিতে চাইনি।
অনিকেত তখন বাবার গলা জড়িয়ে ধরে।
কিন্তু রূপসা জানে, শুধু ‘দুঃখিত’ বললেই সব ক্ষত শুকিয়ে যায় না।
রাকেশের জীবনে এই রাগের জন্য অনেক ছোট ছোট অপ্রাপ্তি জমে আছে।
কেউ তার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে পারেনি। কেউ ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আত্মীয়দের মধ্যেও অনেকে তার সামনে কথা বলার আগে দুবার ভাবে।
একসময় যে মানুষটি খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যেত, আজ তার চারপাশে যেন অদৃশ্য একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
অথচ রাকেশ নিজে তা পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
তার ধারণা, পৃথিবীর মানুষই তাকে বুঝতে পারে না।
সন্ধেবেলা দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে পাড়ার মোড়ে কয়েকজন তাকে দেখে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। রাকেশ কাছে আসতেই তারা চুপ হয়ে গেল।
রাকেশ থেমে গেল।
—কী হলো? আমার সামনে কথা বন্ধ হয়ে গেল কেন?
লোকগুলো অপ্রস্তুত।
একজন হেসে বলল,
—না, কিছু না।
—কিছু না হলে চুপ করলে কেন?
পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠল।
রাকেশের রাগ আবার উঠছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে কিছু না বলে চলে গেল।
পেছন থেকে একজন খুব নিচু গলায় বলল,
—এই জন্যই তো ওর নাম রাগীল।
কথাটা রাকেশ শুনেছিল।
কিন্তু সেদিন আর ফিরে তাকায়নি।
বাড়ি এসে দেখল, অনিকেত পড়ার টেবিলে বসে ছবি আঁকছে।
রাকেশ ব্যাগ নামিয়ে ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
—কী আঁকছিস?
—আমাদের বাড়ি।
ছবিটা হাতে তুলে নিল রাকেশ।
একটা ছোট বাড়ি। সামনে তিনজন মানুষ—বাবা, মা আর অনিকেত।
রাকেশ হেসে ফেলল।
—আমাকে এত বড় করে এঁকেছিস কেন?
অনিকেত বলল,
—তুমি তো আমাদের সবার চেয়ে লম্বা।
রাকেশ ছেলেকে কোলে তুলে নিল।
কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটাই তার পৃথিবী।
তারপর হঠাৎ অনিকেত বলল,
—বাবা, তুমি রাগ করলে তোমাকে ভয় লাগে।
কথাটা খুব সরলভাবে বলেছিল ছেলেটি।
কিন্তু কথাটা রাকেশের বুকের কোথাও গিয়ে যেন আটকে গেল।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ছেলের মাথায় হাত রেখে বলল,
—আমি কি খুব রাগ করি?
অনিকেত মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—তুই কি আমাকে ভয় পাস?
ছেলেটি এবার উত্তর দিল না।
শুধু বাবার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
রাকেশ জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
বাইরে তখন সন্ধে নেমেছে। দূরের বাড়িগুলোতে একে একে আলো জ্বলছে।
রূপসা রান্নাঘর থেকে সব দেখছিল।
তার মনে হল , রাকেশের ভিতরে নিশ্চয়ই একটা নরম মানুষ আছে। খুব নরম। কিন্তু সেই মানুষটির উপর যেন প্রতিদিন রাগের একটা শক্ত আবরণ জমে যাচ্ছে।
কেউ যদি সেই আবরণটা সরিয়ে দিতে পারত!
রাকেশ সেদিন রাতে অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারেনি।
ছেলের কথাটা বারবার মনে পড়ছিল—
‘তুমি রাগ করলে তোমাকে ভয় লাগে।’
বালিশে মাথা রেখে সে নিজেকেই প্রশ্ন করল,
‘আমি কি সত্যিই এমন মানুষ হয়ে গেছি?’
কোন উত্তর এল না।
শুধু ঘরের অন্ধকারে দূরে কোথাও একটা ঘড়ির টিকটিক শব্দ হচ্ছিল।
আর সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে রাকেশের জীবনের পুরোনো কিছু সম্পর্ক, কিছু মুখ, কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষ যেন একে একে ফিরে আসছিল তার স্মৃতিতে।
সে জানত না, তার এই রাগের স্বভাবই একদিন তাকে আরও কয়েকজন আপন মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।
দ্বিতীয়
……..
স্কুলজীবনে রাকেশের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল বিনায়ক প্রামাণিক।
একই স্কুলে পড়ত তারা। একই বেঞ্চে বসেছে, একই মাঠে খেলেছে, পরীক্ষার আগে একে অপরের খাতা দেখে পড়া মিলিয়েছে। স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথটুকুও ছিল তাদের একসঙ্গে।
বিনায়ক ছিল শান্ত স্বভাবের ছেলে। রাকেশের উল্টো। কেউ কিছু বললে হেসে উড়িয়ে দিতে পারত। আর রাকেশ—সামান্য কথাতেও আগুন হয়ে উঠত।
তবু তাদের বন্ধুত্ব ছিল গভীর।
বন্ধুত্বের সেই দিনগুলিতে রাকেশের রাগ যেন বিনায়কের কাছেও খুব বড় সমস্যা বলে মনে হয়নি। বরং সে মজা করে বলত,
—তুই রাগ করিস কেন এত?
রাকেশ হেসে বলত,
—আমি রাগ করি না। আমি অন্যায় সহ্য করি না।
বিনায়কও হেসে উত্তর দিত,
—সবাই তো আর তোর মতো করে অন্যায় বোঝে না!
তারপর দুজনেই হেসে উঠত।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বভাবের ছোট ছোট দিকগুলোই কখনও কখনও সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়।
স্কুলের সেই শেষ দিকের একটা দুপুরের কথা।
টিফিনের ঘণ্টা পড়েছে। মাঠের একপাশে বড় আমগাছটার নিচে বসে টিফিন খাচ্ছিল রাকেশ আর বিনায়ক। বিনায়কের হাতে ছিল মুড়ি আর আলুর চপ। রাকেশ বাড়ি থেকে আনা রুটি-তরকারি খুলেছে।
সেদিন কোন একটা বিষয় নিয়ে রাকেশ সকাল থেকেই বিরক্ত ছিল। ক্লাসে শিক্ষক তাকে একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেছিলেন। উত্তর জানা থাকা সত্ত্বেও সে ঠিকমতো বলতে পারেনি। পরে কয়েকজন সহপাঠী মজা করেছিল।
তার মেজাজ তখন থেকেই খারাপ।
বিনায়ক বিষয়টা হালকা করার জন্য বলল,
—আরে, এত মুখ গোমড়া করে আছিস কেন? সামান্য একটা ব্যাপার!
রাকেশ বলল,
—তুই বুঝবি না।
—বুঝব না কেন?
—সবকিছু নিয়ে তুই হাসতে পারিস। আমি পারি না।
বিনায়ক একটু চুপ করে থেকে বলল,
—তোর একটা সমস্যা আছে রে।
রাকেশ তাকাল।
—কী সমস্যা?
বিনায়ক হাসতে হাসতে বলল,
—তুই ভীষণ বদমেজাজি। কথায় কথায় রেগে যাস।
কথাটা ছিল একেবারে সাধারণ। বিনায়ক বন্ধুর স্বভাব নিয়ে মজা করেই বলেছিল।
কিন্তু রাকেশের মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।
—কী বললি?
বিনায়ক বুঝতে পারল, কথাটা ঠিক জায়গায় লাগেনি।
—আরে, মজা করে বললাম।
—আমাকে বদমেজাজি বললি?
—রাগ করছিস কেন? সত্যিই তো—
বিনায়ক বাক্যটা শেষ করতে পারল না।
রাকেশ উঠে দাঁড়িয়েছিল।
—তুইও তাহলে আমাকে এই চোখে দেখিস?
বিনায়ক অবাক হয়ে বলল,
—এই সামান্য কথার জন্য এত রাগ করছিস?
রাকেশ আর কোন উত্তর দিল না।
টিফিনের বাকিটা সে একা বসে কাটাল।
সেদিন স্কুল ছুটির পরও বিনায়ক কয়েকবার তার কাছে এসেছিল। কিন্তু রাকেশ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
পরদিন বিনায়ক বলল,
—কালকের জন্য রাগ করে আছিস নাকি?
রাকেশ ঠান্ডা গলায় বলল,
—না।
—তাহলে কথা বলছিস না কেন?
—আমার সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই।
বিনায়ক প্রথমে ভেবেছিল, দু-একদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু ঠিক হল না।
দিন কেটে গেল।
একসময় তাদের একসঙ্গে বসা বন্ধ হল । মাঠে পাশাপাশি দাঁড়ানো বন্ধ হল। স্কুল ছুটির পর দুজন দুইদিকে হাঁটতে শুরু করল।
বিনায়ক কয়েকবার চেষ্টা করেছিল সম্পর্কটা আগের মতো করার। কিন্তু রাকেশ প্রতিবারই মনে করত, বিনায়ক তাকে অপমান করেছে।
অন্যদিকে বিনায়কেরও একসময় অভিমান জমতে লাগল।
‘একটা কথার জন্য এত বছরকার বন্ধুত্ব নষ্ট করা যায়?’
সে ভাবত।
কিন্তু রাকেশ নিজের ভিতরের কথাটাই শুধু শুনত।
‘ও আমাকে বদমেজাজি ভাবে।’
এই একটি বাক্য যেন তার মনে পাথরের মতো বসে গেল।
স্কুলের শেষ পরীক্ষার পর তাদের পথ আরও আলাদা হয়ে গেল।
বিনায়ক কলেজে ভর্তি হলো। রাকেশ অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যোগাযোগ ক্রমে কমে গেল।
কয়েক বছর পর পাড়ার এক অনুষ্ঠানে হঠাৎ তাদের দেখা।
বিনায়ক এগিয়ে এসে বলেছিল,
—কেমন আছিস?
রাকেশ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল,
—ভালো।
—অনেকদিন পর দেখা।
—হ্যাঁ।
কথা শেষ।
একসময় যে দুজনের কথা শেষ হতে চাইত না, তাদের মধ্যে সেদিন পাঁচটি বাক্যও হল না।
বিনায়ক চলে যাওয়ার সময় একবার পিছন ফিরে তাকিয়েছিল।
রাকেশ তাকায়নি।
তারপর জীবন আরও অনেক দূর এগিয়ে গেল।
বিয়ে হল রাকেশের। রূপসা এল তার জীবনে। অনিকেত জন্মাল।
বিনায়কের সঙ্গেও আর যোগাযোগ রইল না।
কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও তাদের স্মৃতি শেষ হয় না।
বছরের পর বছর পরেও কখনও কোন গন্ধ, কোন রাস্তা, কোন পুরোনো গান কিংবা স্কুলের পোশাকের মতো কোন দৃশ্য হঠাৎ অতীতকে সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
রাকেশের ক্ষেত্রেও তাই হলো।
একদিন দোকানে বসে পুরোনো এক ক্রেতার মুখে স্কুলের কথা উঠতেই তার মনে পড়ে গেল বিনায়কের কথা।
মনে পড়ল সেই আমগাছ।
টিফিনের বাক্স।
আর সেই একটি শব্দ—
‘বদমেজাজি।’
রাকেশের বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠল।
সে ভাবল, বিনায়ক কি সত্যিই তাকে অপমান করতে চেয়েছিল?
নাকি সত্যিই সে তার ভালো চেয়েছিল?
উত্তরটা তখনও রাকেশ জানত না।
সে শুধু জানত, একজন খুব কাছের মানুষ তার জীবন থেকে চলে গেছে।
আর চলে যাওয়ার কারণ ছিল খুব সামান্য।
কিন্তু সেই সামান্য কারণের ভিতরে লুকিয়ে ছিল রাকেশের নিজের স্বভাবের একটি বড় সত্য।
সে কাউকে নিজের ভুল ধরিয়ে দিতে দিত না।
কেউ তাকে ভালবেসে সতর্ক করলেও সে সেটাকে অপমান বলে মনে করত।
সময় তাকে সেই সত্যটা বুঝতে আরও কয়েক বছর সময় নেবে।
এর মধ্যেই তার জীবনে আরেকটি সম্পর্ক ভেঙে পড়ার অপেক্ষায় ছিল।
সম্পর্কটি ছিল আরও কাছের।
তার মামাতো ভাই প্রণয়ের সঙ্গে।
আর সেই ঘটনার সাক্ষী হবে শক্তিপুরের পুরোনো কালীবাড়ি।
তৃতীয়
……
রাকেশের মামার বাড়ি ছিল বাজারশো শক্তিপুরে। ছোটবেলায় ছুটির দিন মানেই তার কাছে ছিল শক্তিপুরের মামাবাড়ি। সেই বাড়ির উঠোন, পুকুরঘাট, আমগাছ আর বিকেলের আড্ডা—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল তার শৈশবের অনেকটা সময়।
তবে মামাবাড়িতে তার সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল মামাতো ভাই প্রণয়।
বয়সে সামান্য ছোট হলেও প্রণয়ের সঙ্গে রাকেশের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। দুজনের মধ্যে অনেক কথা হতো। জীবনের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করত। রাকেশ যখন নিজের সংসারের কোন বিষয় নিয়ে অস্থির হয়ে উঠত, প্রণয়ই তাকে শান্ত করার চেষ্টা করত।
প্রণয় জানত, রাকেশের রাগটা আসলে তার মনের পুরো পরিচয় নয়।
তবু সে এটাও জানত, রাগের মুহূর্তে রাকেশকে বোঝানো কঠিন।
এক শীতের বিকেলে দুজনে বেরিয়েছিল স্থানীয় কালীবাড়িতে। মন্দিরের চারপাশে তখন মেলা বসার প্রস্তুতি চলছে। দোকানিরা বাঁশের কাঠামো তৈরি করছে, কেউ আলো টাঙাচ্ছে, কেউ মাটির প্রদীপ সাজিয়ে রাখছে। মন্দিরের পাশ দিয়ে হালকা কুয়াশা নামছিল।
প্রণয় বলল,
—মনে আছে, ছোটবেলায় এখানে এসে তুই ঘণ্টা বাজাতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলি?
রাকেশ হেসে বলল,
—তুই ধাক্কা দিয়েছিলি।
—আমি? মিথ্যে কথা!
দুজনেই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর তারা মন্দিরের সিঁড়ির পাশে বসে চা খাচ্ছিল। কথায় কথায় প্রসঙ্গ উঠল রাকেশের ব্যবসা নিয়ে।
প্রণয় বলল,
—তুই একটু ধৈর্য ধরলে ব্যবসাটা আরও ভালো করতে পারবি।
রাকেশ বলল,
—আমি ধৈর্য ধরতে জানি।
—জানিস?
—অবশ্যই।
প্রণয় মৃদু হেসে বলল,
—তুই? তুই তো একটু কিছু হলেই রেগে আগুন হয়ে যাস।
কথাটা বলেই প্রণয় বুঝতে পারল, সে ভুল জায়গায় হাত দিয়েছে।
রাকেশের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—তুইও আমাকে রাগীল বলছিস?
প্রণয় অবাক।
—আরে, আমি তোকে অপমান করতে বলিনি।
—কিন্তু বলেছিস।
—সত্যি কথাকে অপমান ভাবিস না।
রাকেশ উঠে দাঁড়াল।
—তুই আমার স্বভাব নিয়ে বিচার করবি?
প্রণয়ও উঠে দাঁড়াল।
—বিচার করছি না রে। তোকে ভালোবাসি বলেই বলছি। তুই নিজেকে একটু সামলাস।
এই কথাটাই রাকেশের আরও খারাপ লাগল।
—আমাকে কীভাবে চলতে হবে, সেটা তোকে শিখতে হবে না।
প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—ঠিক আছে। আর বলব না।
দুজনেই নীরব হয়ে গেল।
মন্দিরের ঘণ্টা তখন দূরে কোথাও বেজে উঠেছিল।
কী আশ্চর্য—সেদিন চারপাশে এত শব্দ থাকলেও তাদের মাঝের নীরবতাটাই সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছিল।
ফেরার পথে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলেনি।
পরদিন রাকেশ মামার বাড়ি থেকে নিজের বাড়িতে ফিরে এল।
প্রথমে সে ভেবেছিল, দু-একদিন পর সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
কিন্তু তার ভিতরের অভিমান আরও শক্ত হয়ে বসে গেল।
প্রণয় ফোন করেছিল।
রাকেশ ধরেনি।
আবার ফোন করেছিল।
এবার রাকেশ ফোনটা কেটে দিয়েছিল।
প্রণয় একটি বার্তা পাঠিয়েছিল—‘রাগ করে থাকিস না। যা বলেছি, তোর ভালোর জন্যই বলেছি।’
রাকেশ বার্তাটি পড়েছিল।
কিন্তু উত্তর দেয়নি।
এরপর ধীরে ধীরে মামাবাড়িতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।
মামা একদিন ফোন করে বললেন,
—কী রে, আসিস না কেন?
রাকেশ বলল,
—সময় পাই না মামা।
—একদিন সময় করে আয়।
—দেখছি।
কিন্তু সে আর গেল না।
প্রণয়ও প্রথম দিকে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। তারপর সেও থেমে গেল।
একসময় যে বাড়িতে রাকেশ না গেলে সবাই অপেক্ষা করত, সেই বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কও স্মৃতির মধ্যে আটকে গেল।
রূপসা বিষয়টি জানত।
একদিন সাহস করে বলেছিল,
—প্রণয় কি সত্যিই এমন কিছু বলেছিল যে তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে না?
রাকেশ বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
—তুমিও কি আমাকে বদমেজাজি মনে কর?
রূপসা সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গিয়েছিল।
এই ছিল রাকেশের সমস্যা।
কেউ তাকে প্রশ্ন করলেই সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিত।
রূপসা আর কিছু বলেনি।
কিন্তু সেই রাতে রাকেশ একা বসে ছিল বারান্দায়।
তার মনে পড়ছিল মামাবাড়ির উঠোন।
প্রণয়ের সঙ্গে শৈশবের দিনগুলো।
কালীবাড়ির সেই বিকেল।
তারপর মনে হল, একটা শব্দই যেন তার জীবন থেকে মানুষ সরিয়ে দিচ্ছে।
‘রাগীল।’
বিনায়ক বলেছিল।
প্রণয়ও বলল।
পাড়ার মানুষ বলে।
এমনকি তার নিজের ছেলে পর্যন্ত তার রাগকে ভয় পায়।
তবু রাকেশ নিজেকে বদলাতে পারছিল না।
সে ভাবত, ‘আমি খারাপ মানুষ নই।’
সত্যিই সে খারাপ মানুষ ছিল না।
কিন্তু ভাল মানুষ হওয়ার পাশাপাশি ভালভাবে আচরণ করাও যে জরুরি, সেই কথাটা সে তখনও বুঝতে পারেনি।
বছর ঘুরে গেল।
মামার বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হল না ঠিকই, কিন্তু আগের উষ্ণতাও আর রইল না।
রাকেশ আর শক্তিপুরে গেল না।
একদিন বাজারশো শক্তিপুরের বাসে চড়ে কোন কাজে যেতে হয়েছিল তাকে। বাসটা মামাবাড়ির রাস্তার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল রাকেশ।
দূরে সেই পরিচিত রাস্তা।
সেই গাছ।
সেই মোড়।
তার মনে হল, একটু নেমে গেলে কেমন হয়?
মামার সঙ্গে দেখা করবে। প্রণয়ের সঙ্গে কথা বলবে।
কিন্তু বাস তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে।
রাকেশ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
তার ভিতরে একটা কণ্ঠ বলল—
‘নেমে যা।’
অন্য একটা কণ্ঠ বলল—
‘না। এতদিন পরে কেন যাবি?’
শেষ পর্যন্ত বাস চলতেই থাকল।
রাকেশও চলে গেল।
সেদিন সে বুঝতে পারেনি, মানুষের জীবনে কিছু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হয় না—ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে যায়।
আর কখনও কখনও সেই দরজার চাবিটাও মানুষের নিজের হাতেই থাকে।
শুধু অহংকার আর রাগের কারণে সে হাত বাড়ায় না।
রাকেশের জীবনেও সেই দরজাটি তখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু খুব শিগগিরই এমন একটি ঘটনা ঘটতে চলেছিল, যা তার ভিতরের সমস্ত কঠিন আবরণকে নরম করে দেবে।
সেই পরিবর্তনের সাক্ষী হবে তার নিজের ছেলে অনিকেত।
আর সেই দিন রাকেশ প্রথমবার বুঝবে—রাগ দিয়ে মানুষকে কাছে রাখা যায় না; ভালবাসা দিয়েই মানুষকে ধরে রাখতে হয়।
চতুর্থ
…..
সেদিন ছিল অনিকেতের স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান।
সকাল থেকেই ছেলেটার মধ্যে উৎসাহের শেষ নেই। কয়েক দিন ধরে সে মাকে বলে আসছিল, অনুষ্ঠানে সে কবিতা বলবে। বাবা যেন অবশ্যই যায়।
সকালে নাস্তার টেবিলে অনিকেত বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
—বাবা, তুমি আজ আমার অনুষ্ঠান দেখতে যাবে তো?
রাকেশ খবরের কাগজ থেকে চোখ না তুলে বলল,
—যাব।
—কথা দিচ্ছ?
—হ্যাঁ, কথা দিলাম।
অনিকেত খুশিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসল।
কিন্তু দুপুরে দোকানে একটি ঝামেলা হয়ে গেল। এক ক্রেতার সঙ্গে হিসাব নিয়ে রাকেশের তর্ক বাধল। সামান্য বিষয় বড় হয়ে উঠতে সময় লাগল না। রাকেশ রেগে দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
তারপরও মাথার ভিতর রাগ ঘুরছিল।
বাড়িতে ফিরে রূপসা শুধু জিজ্ঞেস করেছিল,
—অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য কখন বেরোবে?
রাকেশ বিরক্ত হয়ে বলল,
—এখন এসব জিজ্ঞেস করো না।
রূপসা চুপ করে গেল।
অনিকেত দরজার আড়াল থেকে বাবার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঘরে চলে গেল।
বিকেলে রাকেশের রাগ কিছুটা কমল। সে জামা বদলে অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।
—অনিকেত কোথায়?
রূপসা বলল,
—ও তো অনেকক্ষণ আগে স্কুলে চলে গেছে। বলেছিল তুমি পরে আসবে।
রাকেশের মনে পড়ল—সে কথা দিয়েছিল।
সে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল।
স্কুলের মাঠে তখন অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। অভিভাবকদের ভিড়। মঞ্চের সামনে চেয়ার পাতা। রাকেশ অনেকটা পিছনে দাঁড়িয়ে রইল।
একসময় ঘোষণায় অনিকেতের নাম শোনা গেল।
ছেলেটি মঞ্চে উঠল।
ছোট্ট হাতে মাইক্রোফোন ধরল।
রাকেশের বুকটা গর্বে ভরে গেল।
কিন্তু কবিতা শুরু করার আগে অনিকেত হঠাৎ দর্শকদের মধ্যে বাবাকে দেখতে পেল।
তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
রাকেশও হাত নেড়ে তাকে উৎসাহ দিল।
কবিতা শেষ হলে সবাই হাততালি দিল।
অনিকেত মঞ্চ থেকে নামল।
রাকেশ এগিয়ে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে চাইল।
কিন্তু অনিকেত একটু থেমে গেল।
—বাবা, তুমি আজ রাগ করোনি তো?
প্রশ্নটা শুনে রাকেশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
সে ছেলের মাথায় হাত রাখল।
—না।
অনিকেত বলল,
—তাহলে ভালো।
তারপর সে বাবার হাত ধরল।
ফেরার পথে রাকেশ খুব চুপচাপ ছিল।
অনিকেতের ছোট্ট হাতটি তার হাতের মধ্যে।
হঠাৎ ছেলেটি বলল,
—বাবা, তুমি রাগ করলে তুমি খারাপ হয়ে যাও?
রাকেশ এবার থেমে গেল।
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তারপর বলল,
—সব সময় নয়।
—তাহলে?
—রাগ করলে মানুষ এমন কথা বলে ফেলে, যেটা সে আসলে বলতে চায় না।
অনিকেত বলল,
—তুমি কি আমাকে রাগ করে কখনও কিছু বলেছ?
রাকেশের চোখের সামনে যেন অনেকগুলো ঘটনা একসঙ্গে ভেসে উঠল।
রূপসার নীরব মুখ।
বিনায়কের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব।
প্রণয়ের সঙ্গে দূরত্ব।
মামাবাড়ির বন্ধ দরজা।
আর সেই অসংখ্য মানুষ, যারা তার কাছ থেকে ধীরে ধীরে সরে গেছে।
সে বুঝতে পারল, এতদিন সে সবাইকে দোষ দিয়েছে।
কেউ তাকে বুঝতে পারেনি—এই অভিযোগ করেছে।
কিন্তু একবারও নিজেকে বোঝার চেষ্টা করেনি।
রাকেশ ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে বলল,
—অনিকেত, আমি একটা ভুল করেছি।
—কী ভুল?
—আমি খুব তাড়াতাড়ি রেগে যাই।
অনিকেত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তুমি তাহলে আর রাগ করবে না?
রাকেশ মৃদু হেসে বলল,
—চেষ্টা করব।
ছেলেটি বলল,
—চেষ্টা করলেই হবে।
এই সরল কথাটাই যেন রাকেশের ভিতরের কোথাও আলো জ্বেলে দিল।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে রাকেশ প্রথমে রূপসার কাছে গেল।
—রূপসা।
—হ্যাঁ?
—আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, তাই না?
রূপসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
এমন প্রশ্ন রাকেশের মুখে সে আগে কখনও শোনেনি।
—কিছু কিছু সময় দিয়েছ।
—আমি বদলাতে চাই।
রূপসা কিছু বলল না।
রাকেশ বলল,
—আমি জানি, শুধু রাগ কমানোর কথা বললেই হবে না। আমাকে শিখতে হবে কীভাবে রাগের সময় চুপ থাকতে হয়, কীভাবে অন্যের কথা শুনতে হয়।
রূপসার চোখ ভিজে উঠল।
সে শুধু বলল,
—তাহলে শুরু করো।
পরদিন রাকেশ প্রথম ফোন করল বিনায়ককে।
অনেক বছর পর।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।
রাকেশ বলল,
—বিনায়ক, কেমন আছিস?
—ভালো। তুই?
—আমিও।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর রাকেশ বলল,
—সেদিন টিফিনের কথা মনে আছে?
বিনায়ক হেসে বলল,
—অনেক বছর হয়ে গেছে।
—তুই ঠিকই বলেছিলি।
ওপাশে নীরবতা।
—কী বলেছিলাম?
—আমি বদমেজাজি ছিলাম।
বিনায়ক এবার কিছু বলল না।
রাকেশ ধীরে ধীরে বলল,
—তুই আমাকে অপমান করতে বলিসনি। আমি নিজের অহংকারে বন্ধুত্বটা নষ্ট করেছিলাম।
বিনায়কের গলা নরম হয়ে এল।
—সব কথা কি আবার নতুন করে শুরু করা যায়?
রাকেশ বলল,
—সবটা হয়তো যায় না। কিন্তু চেষ্টা করা যায়।
ফোনের ওপাশে বিনায়ক হেসে ফেলল।
কয়েক দিন পর রাকেশ গেল শক্তিপুরে।
অনেক বছর পর মামাবাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে তার বুক ধড়ফড় করছিল।
দরজা খুললেন মামা।
এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললেন,
—রাকেশ!
রাকেশ মাথা নিচু করল।
—মামা, অনেকদিন আসিনি।
মামা তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
ভিতর থেকে প্রণয় বেরিয়ে এল।
দুজনের চোখাচোখি হল।।
প্রণয় বলল,
—কেমন আছিস?
রাকেশ হেসে বলল,
—এবার একটু ভালো থাকার চেষ্টা করছি।
প্রণয় এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল।
সেদিন কোন পুরোনো হিসাব খোলা হল না।
কোন অভিযোগও নয়।
শুধু অনেকদিনের জমে থাকা নীরবতার ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে কথার সেতু তৈরি হলো।
ফেরার সময় রাকেশ একবার শক্তিপুরের কালীবাড়ির দিকে তাকাল।
সেই একই মন্দির।
সেই একই ঘণ্টা।
কিন্তু মানুষটি যেন আর আগের মানুষ নেই।
রাগ তার জীবন থেকে একেবারে চলে যায়নি।
মানুষের রাগ তো সুইচ টিপে বন্ধ করা যায় না।
তবে এখন রাকেশ রাগ উঠলে থামে।
চুপ করে।
জল খায়।
প্রয়োজনে সরে যায়।
তারপর কথা বলে।
পাড়ার লোকজনও ধীরে ধীরে পরিবর্তনটা লক্ষ করল।
একদিন মোড়ে একজন মজা করে বলল,
—কী রে রাগীল, আজ রাগ করছিস না?
রাকেশ একটু হাসল।
—নামটা বদলানোর চেষ্টা করছি।
লোকটি অবাক হয়ে বলল,
—কী নাম হবে?
রাকেশ অনিকেতের দিকে তাকাল।
ছেলেটি পাশে দাঁড়িয়ে বাবার হাত ধরে আছে।
রাকেশ বলল,
—মানুষ।
তারপর দুজনে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।
রাগ রাকেশের স্বভাবের অংশ ছিল, কিন্তু তার সমস্ত পরিচয় ছিল না। তার ভিতরে ছিল ভালবাসা, অভিমান, মায়া আর শিশুর মতো সহজ একটি মন। শুধু সেই নরম মানুষটিকে এতদিন রাগের আবরণে ঢেকে রেখেছিল সে নিজেই।
জীবন তাকে শিখিয়েছিল—রেগে যাওয়া অপরাধ নয়, কিন্তু রাগের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা সম্পর্কের প্রতি অন্যায়।
মানুষের জীবনে এমন মানুষও দরকার, যারা ভুল করলে ফিরে আসতে জানে; যারা রাগের পরেও ভালবাসতে জানে; যারা নিজের কঠিন মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শিশুটিকে একদিন চিনে নিতে পারে।
রাকেশও চিনেছিল।
সেদিন থেকে পাড়ার মানুষ তাকে আর শুধু ‘রাগীল’ বলে ডাকত না।
তারা জানত—রাগী মানুষটার অন্তরটা আসলে শিশুর মতোই কোমল।
আর সেই কোমলতাকেই বাঁচিয়ে রাখার নামই হয়তো মানুষ হয়ে ওঠা।
____________________________________
বিশ্বজিৎ মণ্ডল
এন ০০১৯, বেলপুকুর, পোস্ট বলরামপুর কলোনি, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ ৭৪২১৬৫, পশ্চিমবঙ্গ,
মোবাইল ৯৪৭৫ ৯৪৯৩৪২







