মঈনুস সুলতান
বৃক্ষের বর্ষপঞ্জিকা
…………………
গেল রাতে খেয়াল করিনি— তাঁবুর সামনে ঔক বৃক্ষের কর্তিত গোড়া
সারফেসের বেশ কিছুটা প্রকাশ্যে এসেছে— খেলছে ভোরের নওল আলো,
বাকিটুকু শ্যাওলার সবুজ জমিনে বুটিদার শিশিরের রূপালিতে মোড়া—
করতলে বৃহষ্পতির ক্ষেত্র জুড়ে চতুর্ভুজ ও আয়ুরেখা যেন যুগপৎ চমকালো!
ফের নিরিখ করে তাকাই তরুবরের কান্ডহীন দেহাবশেষের দিকে
ফুটে উঠে ক্রপ সার্কোল— ফসলি মাঠের রহস্যময় চক্র,
রেখাবিভঙ্গে তৈরী হয় একাধিক চোখ— তাকিয়ে থাকে অনিমিখে
কিছু আকৃতি সৃষ্টি করেছে আদিবাসীদের বুমেরাং এর অনন্ত রেখা বক্র;
রেখাগুলো থাকে না আর বৃক্ষের দেহাবশেষে স্থির
শুঁড় তুলে মাতে বৃংহিতে— হয়ে ওঠে ঐরাবত,
কররেখায় গ্রহমন্ডলীও হয়ে ওঠে পরিক্রমায় অধীর—
বৃক্ষের রেখানিচয় বিবর্তিত হয় গোলকধাঁধায় ঘেরা এক পথ;
ভোরের আলোয় উপত্যকার ঘাসফুলে ছড়ায় বর্ণালী
বৃক্ষের ছিদ্রে সন্নিহিত বিন্দুরাজি সৃষ্টি করে একাধিক বৃত্ত,
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সমাহরে বিম্বিত হয় পুরাণ যুগের আম্রপালি
আকার-আকৃতি ভেঙ্গেচুরে ফের জোড়া লেগে হয় মরমী চিত্র;
ফুটে উঠে হস্তলিপির অনুকৃতি— শব্দ-বাক্যের সমবায়ে পরিভাষা
বয়স-পঞ্জিকা বোধগম্য হলেও অনেক কিছু থেকে যায় অজ্ঞাত,
নির্নিমেষে তাকিয়ে আমি… অনুভব করি তরুবরের তীব্র মনীষা—
বিদুৎ চমকে জ্বলে ওঠে কিছু ভাবনা… উল্কা হয়ে ঝরে যায় তৎক্ষনাত।
পেরিয়ে তেরো নদী তেপান্তর
……………………………
সমুদ্রে তৈরী হয়েছে প্রবল নিম্নচাপ
পেরিয়ে তেরো নদী তেপান্তর—
এসকেপ করে যাপিত জীবনের মনস্তাপ,
কবে— কোন মাগি পূর্ণিমায় এখানে নিয়েছিলাম দ্বীপান্তর?
আউলা ঝাউলা ঝড়োজলে চরাচর হয়ে ওঠে ধূসর
আছড়ে পড়ে অশান্ত ঊর্মি—জলোচ্ছ্বাসে ভাসে আঙ্গিনা
ডুবে যায় পরিজাত পুষ্পে প্রিয় পরিসর,
এবার ডুবলো বুঝি চিলতে দ্বীপের এক রত্তি বিমান ঘাঁটি
ভেসে যাচ্ছে বালুচরে পুঁতে থাকা মৃত তিমিমাছ—
ছত্রভঙ্গ হবে মনে হয় যা ছিলো নিরবচ্ছিন্ন পরিপাটি,
প্যাঁচার সংসার ছত্রখান করে উপড়ে পড়ে শতবর্ষী গাছ;
সুদূর এ দ্বীপদেশে আবহাওয়া হলো এলো আজ সঙ্গীন,
জ্যামিতির রেখাচিত্রে লাফায় দ্যাখো বেহুঁশ ডলফিন;
অপেক্ষায় থাকি— কখন নেমে আসবে পুরোদমে দুর্যোগ
দুলে ওঠে দ্বীপখানি কচ্ছপের পিটের মতো—
বিচ্চিন্ন হয়েছে সংযোগ,
লাইফ সাপোর্ট হারানো রোগীর অন্তিম নিঃশ্বাসে
ম্রিয়মান হয়ে আসে রেডিও সিগনাল,
ইরোশনে কবরের কপাট খুলে বেরিয়ে পড়েছে কংকাল;
আঁজলা ভরে তুলি সমুদ্রের লবনাক্ত সারোৎসার
জলকণায় মিশে আছে কী মিসিসিপি
মিশে আছে কী করোতোয়া,
অতিক্রম করে গোধূলি— প্রগাঢ় হয়ে ওঠে সাঁজ
সফেন জল চাঁদনীতে হয় ধোয়া,
জড়ো করি পান্ডুলিপি— জড়ো করি মোমেন্টো
দ্বীপের স্মৃতিময় আলোকচিত্র,
কোন কাকতালে যদিবা নোঙর ফেলে বোট বোঝাই ত্রাণ
নিতে হয় বিদায় আছে যারা দ্বীপসখা পরাণের পরম মিত্র,
বর্ষার জলে টইটুম্বর কেতকী কদম্ব ছড়ায় সুঘ্রাণ।
ইউক্লিডের ঈর্ষা
………………
ইউক্লিডের ঈর্ষা হয়ে বিস্তৃত হয়েছে এ কানন
আমগাছের শৃঙ্খলাবদ্ধ সারিতে হয়ে আছে পত্রপল্লবে সুবিন্যস্ত,
মসলিনের মিহি বস্ত্রখন্ডের স্মৃতি হয়ে ছড়িয়ে আছে
অপরাহ্ণের রোদ—
উড়ে যায় জোড়া নীলকন্ঠ… উড়ে আশ্চর্য পাখি সন্ত্রস্ত,
করোটিতে ফিরে আসে ইতিহাসপ্রিয়তা
খেলে যায় সংশয়ের মেঘমল্লারে কৌতুহলের বিজুরি-বোধ,
ভাবি…এ তল্লাটে নীলচাষের প্রাদুর্ভাব
ঠিক কত বছর আগের কথা?
শরীর না অশরীরি বুঝতে পারি না—
কী যেন একটা চকিতে করি চাক্ষুষ!
আলানার হুকে ঝুলানো অভারকোটের মতো গাছের ডালায়
ঝুলছে সাহেবের মৃতদেহ,
কী তার কীর্তি কেন মেতেছিল নীলচাষে …জানে কী কেহ—
দাদন-চাষীদের কর্তিত চুলে সত্যি কী সে তৈরী করেছিল পাপোষ?
এসে দাঁড়াই অবশেষে নীলকুঠির আঙ্গিনায়
বাগিচাটির পরিচয় যেহেতু আমঝুপি—
হাজামজা কাজলা-নদীতে কে যেন ভাঙ্গা নৌকা বায়,
প্রসঙ্গিক হতো দেয়ালে মোষের শিং এর পাশে
ঝুলিয়ে দিলে শোলার সাহেবী টুপি;
শোনা যায় একদিন নিশিরাতের নীরব আঁধারে
এসেছিল মীরজাফর…মেতেছিল গুঢ় ষড়যন্ত্রে,
বুঝেও ঠিক বুঝতে পারি না—
শ্রীরামপুর সুতানুটির বাবু-বিবিরা বশ মেনেছিল কী মন্ত্রে?
নাচঘর থেকে বেরিয়ে এসে জামদানীর পাখনায় পরি-সাজা
নারী এক দাঁড়ায় কাঠের পুলে,
হাতে তার পট্টবস্ত্রে মোড়া শোলার ভাঙ্গা ডানা,
অপরাহ্ণের মিহি রোদ ঝিলমিলিয়ে ঝরে তার খোলা চুলে—
ভাঙ্গা নায় বসে ভুলবাল সুরে ভাটিয়ালী গায়
কে সে তালকানা?
কাজলা নদীর সিনা-বরাবর পুলখানি
বর্ণীল হয়ে আছে গোধূলির বিঁধুর ফাগে,
কথা ছিলো আমঝুপিতে আসার—
জুটিয়েছি রাহাখরচ কেটেছি রেলের টিকিটও
বুঝতে পারি না আসিনি কেন আগে। ।








অভিনন্দন সুলতান ভাই। খুব সুন্দর কবিতাগুলো। নীলকুঠি কবিতায় উল্লেখিত আমঝুপি কি মেহেরপুরের আমঝুপি। ভাল থাকবেন। জন্মদিনে অনেক শুভেচ্ছা রইলো।