প্রচ্ছদগল্পডানাকাটা পরী

লিখেছেন : শাহানারা স্বপ্না

ডানাকাটা পরী


শাহানারা স্বপ্না

খুব ভোরেই সুমনা’র চোখের ঘুম ছুটে যায়। আজন্ম কালের অভ্যাস। ছোটবেলায় বাবা ফজরের নামাজ শেষে মসজিদ থেকে এসেই বলতেন–
–-’কে কে নামাজ পড়বে না, সে আমার ঘর থেকে বের হও’!
শোনা মাত্র সুমনাদের হৃৎকম্প শুরু হতো! আল্লাহ! কোথায় যাবে? কি যে ভয় পেতো তারা! ভাইবোনরা সবাই আরামের লেপমুড়ি ভেঙ্গে অনেক কষ্টে ছাড়তো বিছানার মায়া। ঘুম জড়ানো চোখে ঝিমুতে ঝিমুতে বেসিনের কাছে ছোটো। কোনোমতে! ঠান্ডা পানির ঝাপটা চোখে পড়তেই ঘুম উদাও। মা বলতেন–
— ’সকালের পড়া মনে থাকে। সকাল হলো দিনের সবচেয়ে ভালো সময়, আল্লাহর রহমতের সময়। এ সময় তুমি যা পড়বে ভুলবে না। পরীক্ষায়ও তাই পাবে’।
স্কুল-পরীক্ষার পুলসেরাত পাড়ি আর পড়ার টেবিলে বসানোর এ এক অব্যর্থ দাওয়াই। সুমনা বড় হয়ে ভোরে ওঠার পেয়েছে হাজারো সুফল। সত্যি ভোরে উঠলে যেন দিনটা অনেক বড় হয়ে যায়, কাজও ছাড়ে খুব সহজে। মা,বাবা শাসনচ্ছলে এ অভ্যাসগুলো রপ্ত করিয়ে যদি না দিতেন, সুমনার মনে হয় স্বচ্ছন্দ জীবন-যাপনে বেগ পেতে হতো!
বেডরুম লাগোয়া খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ায় সে। আ: ! কি ঠান্ডা বাতাস! ভোরের বাতাসের এমন মেহনীয় কোমলতা দিনের বেলায় কোথায় হারায়? সুমনার অবাক লাগে। কিভাবে ভোরের স্বর্গীয় মাদকতা লুকিয়ে পড়ে রোদের বুকে! চারদিকের হিমহিম ভেজা কুয়াশা কি সুন্দর স্নিগ্ধ! তখনো সূর্য মেঘের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে আছে ডিমের কুসুমের মতো। নরম সাদা তরল মেঘের ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরুবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দূরে আকাশের ওপারে দিগন্তের কোনে সাদা কুজ্ঝটিকায় টগবগে সিঁদুর মাখা। বিন্দু বিন্দু আলোর ফুলকি বেরুচ্ছে তার গা থেকে। ধীরে ধীরে সূর্যের লাল গোলকটি সচল হচ্ছে। দরিয়ার তাজী ঘোড়া’র মত ছুটছে মেঘমুলুক পার হয়ে। সেই কুমকুম রঙ মোহনী মায়ার দিকে অপলক চেয়ে থাকে সুমনা।
দুম, দুম,দুম!!
হঠাৎ কলিংবেলের সাথে সাথে মেইন দরজা পেটানোর শব্দ। ভীষণ চমকে ওঠে সুমনা। কে এলো এ সময়? এমন করে দরজা পেটাচ্ছে? আশ্চর্য! ঘরের সবার ঘুম ভেঙ্গে যাবে যে! এতো ভোরে তো কারো আসার কথা নয়! দ্রুত বারান্দা পেরিয়ে ছুটে আসে সে। দীর্ঘদিনের কাজের সহকারী বাদলও দৌড়ে যায় দরজার দিকে। সুমনা তাকে ইশারায় থামতে বলে। দরজার কী-হোলে নিজেই চোখ রাখে।
বাইরে ও কে দাঁড়িয়ে? উস্কোখুস্কো চুলে খসরু সাহেব? কিন্তু কেন? তাও এতো ভোরে?
খসরু তাদের পারবিারিক বন্ধু। সুমনার স্বামী মিলনের দেশালী ভাই। এছাড়াও খুব কাছের লোক। কি হয়েছে তার, যে জন্যে এত ভোরে দিশেহারার মতো ছুটে আসলো? সুমনার মনে বিপদের ঢাক গুড়গুড়িয়ে ওঠে। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেয় সে নিজেই। একরাশ বিষ্ময় আর আতংক নিয়ে জিজ্ঞেস করে–
–’কি হয়েছে ভাই’?
–‘কিছু না’! বলে টলতে টলতে ভেতরে ঢোকে খসরু । সুমনা ছুটে গিয়ে তার বসার জন্য সোফাটা ঝেড়ে দেয়। কোনোদিকে দিকপাত না করে দপ্ করে বসে খসরু। সদ্য উপড়ানো গাছের মতো সোফার ভেতর দুমড়ে মুচড়ে দলা পাকিয়ে পড়ে থাকে! ঘুম-নিদ্রাহীন শুষ্ক চোখ মুখ, বিষণ্ণ চেহারা।
ব্যাপার কিছু বুঝতে না পেরে সুমনা বেডরুমে ছোটে। ডেকে তোলে মিলনকে–
‘–এই? দ্যাখো তো, তোমার বন্ধু খসরু সাহেব এসেছে”!
–”খসরু? সে কি’?
মিলনের চোখের ঘুম পালায়। মূহুর্তে লাফ মেরে বিছানা ছাড়ে। খসরু কাস্টমসের সহকারী কমিশনার, সরকারী শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজন। অফিসে না গিয়ে এ অসময়ে এখানে? মনে মনে প্রমাদ গোনে মিলন। নিশ্চয়ই কিছু অঘটন ঘটেছে। কোনমতে হাত-মুখ ধুয়েই সে ছোটে ড্রয়িংরুমে।
এভাবে একা একা খসরুর ছুটে আসায় সুমনার মনে খটকা খটকা লাগে। এর আগে সব সময় তার স্ত্রী লিমা সাথে থাকতোই। লিমাকে ছাড়া কোথাও খসরুর একা যাওয়ার অনুমতি নেই, এমনকি সে এটা ভাবতেও পারে না। লিমা জানতে পারলে নানা রকম সন্দেহের তীর ছুঁড়ে রক্তাক্ত করে দেবে। ভীষণ সন্দেহ বাতিক মেয়ে লিমা।
সেই কতবছর আগের কথা। সুমনা তবু ভোলে না। ধানমন্ডির নতুন বাসায় উঠেছে তখন সুমনারা। বাসা পাল্টানোর ধকলে সুমনা কাহিল। গোছ-গাছের শেষ নেই। মিলন তেমন সময় দিতে পারে না। সারাদিন ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। সুমনা কাজের সহকারীদের নিয়ে জিনিসপত্র সাজিয়ে তুলতে হিমশিম খাচ্ছে। বাসাও বড়সড়। কোথায় কি হবে না হবে ভেবে আকুল। একবার খাট এদিকে দেয় তো আবার আরেকদিকে। সকাল-সন্ধ্যা কাজের ফাঁক গলে উড়ে উড়ে পার হচ্ছিল সময়। কাজের ধুমে দম ফেলার ফুসরত নেই। এমনি এক আধ-গোছালো সন্ধ্যায় খসরু বেড়াতে এলো স্ত্রীকে সাথে নিয়ে।
সুমনা যথেষ্ট বিব্রত বোধ করলেও হাসি মুখেই সাদর অভ্যর্থণা জানালো। সেদিন মিলন বাসায়ই ছিলো। হয়তো সেজন্যেই বেড়াতে এসেছে। লিমাকে দেখিয়ে খসরু সাহেবই পরিচয় করিয়ে দিলেন–
–-’আমার স্ত্রী লিমা’!
সুমনা লিমার দিকে তাকিয়ে হকচকিয়ে গেলো। ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো যেন! কি অদ্ভুত সাজ-পোশাক মহিলার। মুখে পুরু মেকাপের গাঢ় আস্তরন এনামেল পেইন্টের মতো লাগছে। মাথার চুলের সামনে দৃষ্টিকটুভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উঁচু ঢিবি করা, সঙ্গে পরচুলা লাগানো বিশাল বেনী। উৎকট উঁচুনিচু বুকের ওপর দুলছে দুটো সাপের মতো। পুরো বেনী জুড়ে নায়িকাদের স্টাইলে ফুল গোঁজা। দুই হাতের কনুই পর্যন্ত মেহেদীর রঙিন ডিজাইন আঁকা। পরনে দামী সিল্কের ওপর ঝকমকে পাথরের কাজ করা ডিপ মেরুন জর্জেট শাড়ি। এমনভাবে পেঁচিয়ে গায়ের সাথে সেঁটে পরেছে, যেনো সুটিংয়ে এসেছে। নাভিসহ ফর্সা পেট উদোম, বুকের কাপড়ও অর্ধেক সরানো। একটা বিতৃষ্ণা বমির মতো উদগদ ঠেলে উঠলো সুমনার মনে। বন্ধুর বাড়িতে বিকেলের বেড়ানোয় এমন বিদঘুটে সিনেমাটিক সাজের অর্থ কি! কেমন যেনো চোখ নাচিয়ে কৃত্রিম হেসে উঠে লিমা–
–’ভাবি, ভালো আছেন’?
তার সে হাসিতে চোখের নকল আইল্যাশ কেঁপে কেঁপে খুলে পড়ার দশা ! সুমনা তাজ্জব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। বন্ধুর আসার সাড়া পেয়ে ওঘর থেকে ছুটে এলো মিলন–
–-’আরে আয় দোস্ত! ওমা, দোস্তাইন যে? বসেন বসেন!
মিলন ব্যস্ত হয়ে পড়লো বন্ধু-পত্নীর তোয়াজে।
তাদেরকে গল্প করতে দিয়ে সুমনা রান্নাঘরে ঢুকলো। সুমনার মাথায় চিন্তার মেশিন ঘুরতে লাগলো—কি নাশতা বানানো যায়? মিলন মুখরোচক ঝাল নাশতা পছন্দ করে। চটজলদি কিছু বানিয়ে ফেলতে হবে। এক চুলায় দুটো ডিম সেদ্ধ বসিয়ে আরেক চুলোয় তেলের কড়াই চাপালো। বাঁধা কাজের সহকারী রুমাকে বসিয়ে দিয়েছে গোল গোল চাকা করে বেগুন কাটতে। ফালি ফালি করে বেগুন কেটে লবন মাখিয়ে রাখলো সে। সেদ্ধ ডিম ছুলে চার ফালি করে কেটে নিলো। রুমা দ্রুত ঘিয়ের ভেতর সুজি টেলে, বেসন গুলে সব গুছিয়ে দিল। সুমনা খুব তাড়াতাড়ি বেগুনি, ডিমের পাকোড়া ভেজে ওপরে বিটলবন ছিটিয়ে দিল। সুজির হালুয়াসহ ট্রে সাজিয়ে বাদলের হাতে পাঠিয়ে দিল। সবার জন্য চায়ের পানি বসিয়ে কাপ-পিরিচ সাজিয়ে রাখলো। কেটলিতে চা ঢেলে দেয়ার নির্দেশনা বার বার করে বুঝিয়ে গিয়ে বসল মেহমানদের সাথে।
কথায় কথায় আদুরে গলায় অদ্ভূতভাবে শরীর ঝাঁকিয়ে হেসে উঠছে লিমা। তার এলোমেলো আঁচল ক্ষণে ক্ষণে খসে পড়ছে উদাসীন অবহেলায়। আসলে মোটেও উদাসীনতা নয়, ইচ্ছে করেই ভান করছে বলে মনে হলো সুমনার। লিমা খুব আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে দেখে সুমনার ভালো লাগলো। উচ্ছসিত আনন্দে প্রশংসা করছে সুমনার—-
”ভাবী! কিভাবে এতো মজাদার করে বানালেন?
-’কি?’
-’এই যে পাকোড়া, বেগুনী! জানেন আমার এতো প্রিয়! কিন্তু এমন করে তো জীবনেও পারবো না’!
ওর সরলতায় সুমনার মনের বিরূপতা কিছুটা কাটলো। হাসিমুখেই বলল–
–’কি এমন নাশতা, এ তো সবাই পারে। চাইলে আপনিও পারবেন, একদম সহজ’!
— ‘না না না’! অবুঝ বাচ্চার মতো মাথা ঝাঁকিয়ে প্রতিবাদে মেতে উঠলো লিমা। হঠাৎ সুমনার মনে হলো ফ্রীজে তো মিষ্টি রয়েছে! দু’দিন আগে তার বোন পাঠিয়েছিল। সুমনা দৌড়ে গিয়ে সাদা কাঁচের বাটিতে মিষ্টি সাজিয়ে আনলো। খসরু আপত্তি করে উঠলো–
–’আবার মিষ্টি কেন ভাবী, এইতো যথেষ্ট!’
–নতুন বাসায় প্রথম এলি, মিষ্টিমুখ হবে না? আর প্রথমদিন মিষ্টিমুখ না হলে পরে যদি তোর ভাবীর বদনাম করিস’!
মিলন ফোঁড়ন কাটলো। সুমনা লাজুক মুখে অনুচ্চ স্বরে বলে–
–’হ্যাঁ, তোমাকে বলেছে’! লিমা বলল–
–আমি কিন্তু ভাবীর ফ্যান হয়ে গেলাম, তোমরা যাই বলো!
খসরু ছাড়ল না, সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো–
–’বেগুনীর লোভে’? লিমা খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়লো! —
–’একদম’!
খোশগল্পে চা খাওয়া হলো। বিদায় নেবার আগে অচমকা লিমা এক কান্ড করলো। ওয়াশরুমের বেসিনে গিয়ে দাঁড়ালো। গলার ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিল সে। যা কিছু খেয়েছিল সব হড়হড় করে বের করে দিল। ঘটনার আকষ্মিকতায় সুমনা আর মিলন বিষ্ময়ে হতবিহব্বল! এমনও কেউ করতে পারে ?
বিব্রত বোধ করলো খসরু। সে বিমূঢ় মিলনের হাত ধরে বারান্দায় টেনে নিলো। ফিসফিস করে অপরাধী গলায় বলতে লাগলো—-
–’ভাই, তোকে তো বলতে পারিনি। এ এক যন্ত্রনা। লিমা স্লিম থাকতে চায়, ওদিকে আবার খেতেও ভালোবাসে। তাই খাওয়ার পরপরই এমন করে। কিছু মনে করিস না। ভাবীকে একটু বুঝিয়ে বল্”!
মিলন বেদনাহত। একটা মানুষ কিভাবে নিজেকে এমন করে কষ্ট দেয়? তার বুঝে আসে না।
সুমনা শুনে হাসবে না কাঁদবে ভেবে পায় না। নিজের ওপর একি অদ্ভূত শাস্তি! তিন বাচ্চার মা’র কেন এমন আদ্যিখ্যেতা!
তারপর থেকে গত কয়েক বছর ওদেও যুগল বেড়ানো রুটিনে পরিণত। প্রায়ই খসরু-লিমা সন্ধ্যায় বেড়াতে আসে, এবং বেশ ঘন ঘন। খসরু জানিয়েছে, লিমার নাকি মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই ডাক্তার প্রতিদিন ওকে নিয়ে বেড়াতে বলে দিয়েছে। সারাদিন অফিস শেষে ক্লান্ত খসরু আর কোথায় যাবে? তাই বন্ধুর বাড়ি এসে হানা দেয়! তবে তারা কখনো বাচ্চা-কাচ্চা সঙ্গে আনে না। সুমনা জিজ্ঞেস করায় খসরুর জবাব হলো লিমা পছন্দ করে না। ওদের লেখা-পড়া আছে। সন্ধ্যায় ওরা গৃহশিক্ষকের কাছে পড়ে। ব্যাখ্যা শুনে সুমনা আকাশ থেকে পড়লো! শিক্ষক বাসায় আর তাদের মা সাজগোজ করে বাইরে? টিচার সে যতই ভালো হোক–বাইরের একজন বই নয়! একজন আগন্তুকের কাছে বাচ্চাদের রেখে সুমনা তো কিছুতেই যেতে পারতো না। কি জানি, এ আবার কেমন ধারা! সুমনা নিজের কাজে মন দেয়।
প্রায় সময় খসরু তার নানান সমস্যার কথা মিলনকে বলে। দু’বন্ধু মনের সুখ-দু:খের কথা শেয়ার করে। কিছু কিছু কথা মিলন খুব সাবধানে সুমনার সাথেও আলাপ করে। সব কথা বলে না।। সুমনা খসরুকে ভুল বুঝুক সে এটা চায় না। নিজেদের মধ্যে আলাপকালে লিমার উল্লেখে মিলন কৌতুক করে ডাকে ‘ডানা কাটা পরী’! সুমনার মনে সুক্ষ্ম অসন্তোষ দানা বাঁধলেও বেশীক্ষন থাকে না। মিলনের মনোভাব সে ভালো করেই জানে। তবু অকারন সন্দেহ দূর করতে পারে না। ধোঁয়ার পাক তুলে সাপের মতো পেঁচিয়ে ওপরে উঠতে চায়। আগ বাড়িয়ে মনের ভেতর প্রশ্ন উজিয়ে তোলে– লিমা এখানে বেড়াতে এলে চড়া মেকআপ করে কেন? সব সন্ধ্যা কেবল এখানেই কাটাতে চায় কেন ? বুড়বুড়ি তোলা নানা প্রশ্ন যেমন উঁকি মারে, মিলনের নিষ্পাপ কথায় সেগুলো আবার দ্রুতই মিলেয়েও যায়।
এক শনিবার সন্ধ্যায় বেড়াতে আসা লিমার কথায় বেশ অবাক হলো সুমনা। কিছু বলার জন্য সুমনাকে সে হাত ধরে টেনে ভেতরের রুমে নিয়ে এলো। সুমনা ভেবেছিল হয়তো কোন পারিবারিক সমস্যূার কথা বলবে। আলমারির পাল্লার সাথে লাগানো মস্ত বড়ো আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে লিমা তার স্বভাবসুলভ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
‘ভাবী দেখো, দেখো! আমার মুখে না বয়সের ছাপ পড়ছে। আমি এখন কি করবো’?
বলে সে আয়নার একেবারে কাছে গিয়ে নিজের মুখের চিবুকের নিচটা তুলে ধরলো। সুমনা চুপ থাকে। মনে মনে যথেষ্ট বিরক্ত হয়। বয়স বাড়লে বুড়ো হবে–এ মহিলা বলে কি? চিরদিনই খুকী হয়ে থাকবে নাকি! ন্যাকা আর কাকে বলে! মুখে বলে —
–’একদিন তো সবাইকেই বুড়ো হতে হবে’!
লিমা আঁতকে উঠলো যেন! হাহাকার করে উঠলো—
–’না, না আমি বুড়ো হতে চাই না’!
সুমনার অসহ্য ঠেকে লিমার ন্যাকা ন্যাকা ফিল্মিভাব। দাঁতে দাাঁত চেপে অনুচ্চ কন্ঠে স্বগদোক্তি করে সে–
–’পাগল’!
একটা কড়া কথা মুখে ফসকে বলে ফেলেছিল প্রায়। মিলনের বন্ধুত্বের খাতিরে অতিকষ্টে নিজেকে সামলে নিল। দু:খ লাগলো বেচারা ভালো মানুষ খসরু ভাইয়ের জন্য। লিমাকে মনে হলো আসলেই মানসিক রোগি!
সুমনা কখনো খসরুদের বাসায় যায়নি, ইচ্ছেও হয়নি। এক ছুটির দিনে মিলন জানালো তারা আজ একসঙ্গে খসরুর বাসায় বেড়াতে যাবে। সে যেন বিকেলে রেডী থাকে। দুপুরে ঘুমিয়ে ফ্রেশ হয়ে মিলন তাগাদা দিতে লাগলো বার বার। সুমনা ঠোঁটে বিদ্রুপ হেনে ভ্রু বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
–’খুব যে তাড়া দেখছি’! ইঙ্গিতটা বুঝতে দেরী হয় না মিলনের । সে সেটাকে আরেকটু উস্কে দেয়-
–’ডানাকাটা পরী’ বলে কথা’!
–’তুমিই যাও তোমার পরীর কাছে, আমার গিয়ে কাজ কি’?
–’আরে, পরীর নাচ একা দেখে সুখ আছে? চল তো’!
সুমনার আসলেই কেন যে যেতে ভালো লাগছে না। দুনিয়ার আলস্য যেন দুপায়ে বেড়ী দিয়েছে। কিছুক্ষণ দোটানায় থেকে শেষে তৈরী হয়ে নেয়। হালকা সাজগোজে সাধারন মানের শাড়ি। একবার ভাবে, ঐ চলন্ত ড্রেসিং টেবলের সামনে তাকে পানসে লাগবে! তা লাগুক, সুমনা কখনো জবরজং সাজতে পারবে না। মিলন একবার ভেতরে এসে আড়চোখে তাকালো। সুশ্রী সুমনার মুখে ফুটে উঠেছে দ্বিধা-দ্বন্ধের ছাপ। সে যেন টের পেয়েছে সুমনার মনের কথা– এমন ভঙ্গিতে চোখ মটকে দুষ্টু হাসলো। তাতে সুমনার রাগ আরো বাড়ছে বই একটুও কমেনি।
খসরুর কাস্টমস হাউসের বেশ বড়সড় সরকারী বাসা। পুরনো বাড়ি নয় নতুনই। হাল আমলের বাসার চারদিকে ফুলের কেয়ারী করা। বেশ খানেকটা পথ পেরিয়ে বাসায় যেতে হয়। বাসার ভেতরে এসে সুমনা লক্ষ্য করলো বাইরেটা সাজানো গোছানো হলেও ভেতরটা মোটেও পরিপাটি নয়। চারদিকে অগোছালো, এলোমেলো আর ময়লার ছাপ। সুমনা বুঝে গেলো লিমা সংসারে মনোযোগি নয়, যতটা সাজ-সজ্জায়। মনে মনে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। এইখানে তুলনায় সে লিমাকে হারিয়ে দিলো! একে সুন্দরী তার ওপর প্রসাধন পটিয়সী লিমাকে কি সে ঈর্ষা করে? এখন ওর একটা ত্রুটি দেখে সে আরাম বোধ করছে!
লিমা একের পর এক গল্প করে যাচ্ছে। কলকলিয়ে ছুটছে ঝর্ণাধারার মতো কথার কাকলি। সুমনার কোষে কোষে আবার একটা অস্বস্তি লুকানো অনুজীবের মতো হেঁটে বেড়ায়। অদৃশ্য একটা প্রতিযোগির মুখোমুখি যেন সে! লিমা’র মতো এমন গল্পের ফোয়ারা তো সে ছোটাতে পারে না! মনে মনে নিজেকে সতর্ক করে– এ ধরনের সংকীর্ণ চিন্তাা করা তার মোটেও উচিত নয়! একটু পর লিমা উঠে গিয়ে তাদের সহকারি কাজের ছেলেটাকে নাশতা আনতে পাঠালো। লিমা সবাইকে নিয়ে গেলো খাবার টেবিলের কাছে। লম্বা ডাইনিং টেবলটার দিকে চেয়ে সুমনা হোঁচট খেলো! টেবিল ক্লথের ওপর পলিথিনের ঢাকনা দেয়া। আর সেটা যেমন লালচে তেমনি নোংরা। একটা লবন দানি, তা যে কতকাল অব্দি ধোয়া হয়নি আল্লাহ্ মালুম! ছেলেটা গরম একঠোঙা সিঙ্গাড়া এনে টেবিলে রাখলো। সেটা যে একটা বাটি বা পাত্রে রাখতে হবে তা কারোর মনে নেই। কাগজের ঠোঙ্গা থেকেই হাতে হাতে নিয়ে খাওয়া চলল। সুমনা কিছুতেই মেলাতে পারে না। এমন টিপটপ সাজের নারীর ঘরদোর, খাবার পরিবেশনে এতটুকু যত্ন নেই কেন?
তারপর থেকে আর কখনো খসরুর বাসায় যাওয়ার উৎসাহ বোধ করেনি, মিলনও কখনো বলেনি। তারাই বেড়াতে আসে সপ্তাহান্তর। লিমার অসুস্থতার খাতিরে সুমনা তা মেনেই নিয়েছে।
দু’হাতে কপালে রগ টিপে মাথা নীচু করে বসেছিল খসরু। তার যেন বাহ্য-জ্ঞান লুপ্ত। মিলন উদ্বিগ্নভাবে আন্তরিক গলায় জানতে চায়–
–’কি হয়েছে বলতো ? “
–’গতকাল থেকে লিমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!’
–’সে কি ? কোথায় গেছে ?’ খসরুর মুখে জবাব নেই। চুপ করে আছে। সে যেন বোবা হয়ে গেছে, মুখে কোন কথা নেই!
–‘ওর বাবার বাসা, আত্মীয় স্বজনের বাসায় খোঁজ করেছিস? সেখানে কোথাও যায়নি তো?’
অনেকখন পর মাথা তোলে খসরু। বাজ পড়া খসখসে শুকনো দৃষ্টি! চোখের সমুদ্রে ঘুরছে রক্তলাল পলাশ–কোথায় যেন জ্বলছে বুড়ো পাতার রাশ। নদীর টালমাটাল ঢেউয়ের ধাক্কায় চৌচির সংসার-নৌকা। উদ্গত বাহু মেলা কষ্টকর কান্নার দলা গলা ছিঁড়েখুঁড়ে নিচ্ছে। ঘৃনায় লজ্জায় তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছে তার। লিমা তাকে খড়ের গাদার উচ্ছিষ্টের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিল? কিন্তু কেন ? লিমার চাহিদার কোন কিছুই তো সে অপূর্ণ রাখেনি! শত অন্যায় আবদার মাথা পেতে নিয়েছে। তাহলে লিমা কি চায়?
— ‘আমার সব ব্যাংক ব্যালেন্স আর বাড়িটা যে ওর নামেই’! আর্তনাদ করে ওঠে খসরু
মিলন ভেবে পায় না লিমার তো আ্যাকসিডেন্ট বা কোন বিপদ হতে পারে। খসরু এ সময়টায় টাকার কথা ভাবছে কিভাবে! বন্ধুকে শান্তনা দিয়ে বলে—
’চল, হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে দেখি, প্রয়োজনে থানায় জানাতে হবে।’
–’ খসরু এতোক্ষণে বন্ধুর চোখের দিকে তাকালো। তার দুই চোখে রাজ্যের শুন্যতা। একটুক্ষন চুপ থাকলো, যেন নিজেকে প্রস্তুত করে নিল। কঁকিয়ে উঠলো সিডরের ঝড়ে সর্বস্ব হারানো আর্তস্বর! ফিস্ফিসানো গলায় শোনা গেলো—

–’সে বাসার প্রাইভেট টিউটরের সাথে চলে গেছে!’

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা