প্রচ্ছদসাম্প্রতিকজামায়াতের সাদা ভেড়ার পালে কালো ভেড়া

লিখেছেন : আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

জামায়াতের সাদা ভেড়ার পালে কালো ভেড়া


আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

একাত্তরের ব্যাখ্যা দিতে দিতেই জামায়াতের লবেজান অবস্থা। ভেতরের দ্বন্দ্বে জামায়াত ভেঙে একবার মাওলানা আবদুর রহিম ও মাওলানা আবদুল জব্বার গ্রুপ হয়েছিল। শিবিরও মাঝে মাঝে ভেঙেছে। সুকুমার রায়ের শিশুতোষ কবিতার মতো অবস্থা :
“ডাইনে বল্‌লে যায় সে বামে
তিন পা যেতে দুবার থামে ।
চল্‌তে চল্‌তে থেকে থেকে
খানায় খন্দে পড়ে বেঁকে।”
তার ওপর যদি সাদা ভেড়ার পালে দু’একটা কালো ভেড়া বেসামাল আচরণ শুরু করে, তাহলে আল্লাহর বান্দারা যায় কোথায়! চলতে গিয়ে খানাখন্দে পড়ে। ‘লিবিডো’ অর্থ্যাৎ যৌন আকাংখা থাকা সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। বৈধ উপায়ে লিবিডো’তে সাড়া দেওয়া দোষনীয় কিছু নয়। পঁচাত্তর বছরে কারও লিবিডো আরও স্বাস্থ্যকর। বৈধ হলে বয়স ফ্যাক্টর নয়। ইতিহাসজুড়ে সকল সভ্যতায়, সকণ ধর্মে বালিকা বিবাহের ভূরি ভূরি নজীর আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৯ বছর ৯ মাস বয়সী মৃণালিণীকে বিয়ে করেছিলেন। গান্ধীজি ১৩ বছর বয়সে ১৪ বছররের কস্তুরবাকে বিয়ে করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান ৮ বছরের ফজিলাতুন্নেসা রেনুকে বিয়ে করেছিলেন। বহু মহাজ্ঞানী মহাজন কিশোরী তো নয়ই, অবোধ বালিকাদের বিবাহ করেছিলেন।
জামায়াতের এক ব্যক্তির বালিকাঘটিত বিষয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার যে ঝড় বইছে, তাতে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক বিদ্বেষ সত্ত্বেও সমালোচকরাও জামায়াত সংশ্লিষ্ট কারও কাছে অন্তত যৌন আচরণ আশা করেন না।
ইসলামের চার মহান খলিফা প্রত্যেকে ৪ থেকে ৮টি বিয়ে করেছিলেন। তাদের স্ত্রীদের কারও কারও বয়স ১০ বছরের মধ্যে ছিল। হয়রত আলীর প্রথম পুত্র ইমাম হাসান বিয়ে করতেন আর ছেড়ে দিতেন। এভাবে তিনি ৬০ থেকে ৭০টি বিয়ে করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে আজকালকাল ইসলামী গবেষকরা এটি অস্বীকার করতে চেষ্টা করেন। পুরুষদের সেইসব সুখের দিনরাত্রি আর নেই। দেশে দেশে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েকে বিয়ে করার ওপর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় অনেক পুরুষের আফসোসের শেষ নেই।
বৈধ-অবৈধ বলে একটা ব্যাপার তো আছেই। বৈধ হলেও জায়গা-বেজায়গা এবং সময় অসময় একটা ব্যাপার। সামাজিক, রাজনৈতিক অবস্থানও মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পঁচাত্তর বছর বয়সে লিবিডোর ডাকে সাড়া দিতে পারা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হিতকর হলেও তা পরিত্যাগ বা পরহেজ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। পরহেজ না করতে পারলে কি হয়, তার খেসারত জামায়াতকে কতকাল দিতে হবে কে জানে।
গণতন্ত্রের অন্যতম দিক সকল নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং আইন লংঘন না করা পর্যন্ত সে স্বাধীনতা রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। ব্যক্তি যদি এককভাবে বা দ্বৈতভাবে আইনের সীমার মধ্যে থেকে তাদের সুগঠিত মোহনীয় দেহের মহিমাকে তাদের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ইচ্ছামতো ব্যবহারের ও উপভোগ করার অধিকার প্রয়োগ করে, তাহলে কারও মাথাব্যথার কোনো কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু বাদ সাধে তাদেরই আচরিত কর্ম ও প্রচারিত আদর্শ। দুটির মধ্যে মিল না থাকলেই প্রশ্ন উঠে। কেউ যদি তার অনুসারীদের অহর্নিশি কোরআনের বাণী: “ইয়াআইয়ুহাল্লা জিনা আ-মানূলিমা তাকূলূনা মা-লা-তাফ‘আলূন,” অর্থ্যাৎ “হে মু’মিনগণ, তোমরা এমন কথা কেন বল, যা নিজেরা করো না? “ (সুরা আস-সাফ: ২) শুনিয়ে বুঁদ করে রাখেন, এবং যা অন্যদের বলেন, তা নিজে পালন করেন না, তাহলে তিনি আল্লাহর কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেন, এবং মানুষের কাছে অবিশ্বাসীতে পরিণত হন।
আল্লাহ নি:সন্দেহে সানুষকে যৌনতার সুখ শুধু বিনোদনের জন্য, শুধু প্রজননের জন্য দেননি, নারী ও পুরুষের মধ্যে ভালোবাসার প্রকাশের জন্য এবং সামাজিক বন্ধন সৃষ্টির জন্যও দিয়েছেন। মানুষ অবশ্যই আনন্দ উপভোগের জন্য যৌন শক্তির ওপর বিশ্বাস করে, এবং সেই যৌনতায় বিশ্বাস করে না, যা ধর্ষণ, সন্ত্রাস ও নিপীড়নে রূপান্তরিত হয়।
উন্নত বিশ্বে যৌন-থেরাপির ব্যবস্থা রয়েছে। পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত যৌন উত্তেজনা থাকতে পারে। অনেক সময় তারা অতিরিক্ত ‘যৌন-আসক্তির’ কুফল আঁচ করে যৌন থেরাপিস্টের শরণাপন্ন হন। আবার এমনও হতে পারে, তারা কিছু আকর্ষণীয় কিন্তু হতভাগ্য ব্যক্তির সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পান — যেমন আমেরিকান অভিনেতা, পরিচালক ডেভিড ডুচভনি, অভিনেতা চার্লি শিন, ব্রিটিশ সঙ্গীত শিল্পী অ্যামি ওয়াইনহাউস বা আমেরিকান র‌্যাপার ও ফ্যাশন ডিজাইনার কানিয়ে ওয়েস্ট, অথবা জন এফ. কেনেডি বা বিল ক্লিনটনের মতো ক্ষমতাধর সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে—যাদের সবাইকে গণমাধ্যম সবচেয়ে বিকৃত, লজ্জাজনক এবং পাপপূর্ণ কলুষিত তকমা দিয়েছে।
আবার এমনও হতে পারে, তারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে থাকার ধারণায় মুগ্ধ—নিজেদের কামনা-বাসনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অথবা এমন এক প্রলুব্ধকর উপকরণ দ্বারা তাড়িত, যারা অন্যদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আসক্তি চরিতার্থ করার সুযোগ গ্রহণ করেন। গবেষকরা মনে করেন, যৌন কেলেঙ্কারি এখন শুধু ব্যভিচার নয়, বরং যৌন আসক্তি। এ বিষয়ক কিছু বিশেষজ্ঞ বলেছেন যে, বিবাহিত জীবনের একঘেঁয়েমিপূর্ণ একগামী যৌনমিলন ছাড়া অন্য যেকোনো ধরনের যৌনতার প্রতি আগ্রহ থাকলেই তা যৌন-আসক্তির মধ্যে পড়ে। পর্নোগ্রাফি উপভোগ, পতিতালয়ে গমণ পরকীয়ায় জড়ানো, নগ্ন নৃত্য, ফোনে যৌনালাপ, এমনকি প্রিয় মানুষ ছাড়া অন্য কারও বা অন্য কিছুর কথা কল্পনায় আনেন—তাহলে তাকেও যৌন-আসক্ত বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
যৌন-আসক্তি হাস্যরসের বিষয় নয়, গুরুতর এবং কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো জটিল সমস্যা। প্রকৃত যৌন-আসক্ত ব্যক্তি এমন সব অবাঞ্ছিত আচরণে লিপ্ত হয়, যা তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াই এখানে মূল বিষয়, যার ফলে এমন আসক্তরা কখনও কখনও বাজে অবস্থার সৃষ্টি করে, যা সংশ্লিষ্টদের পরিবার, সমাজ ও রাজনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলে। এই নিয়ন্ত্রণহীনতার মধ্যে ব্ল্যাকমেইল করার মতো ঘটনাও ঘটে। যৌন আসক্তরা এমন বেপরোয়া হয়ে যান যে তারা নিজেদের পরিবার, সামাজিক অবস্থান, পদমর্যাদা সবকিছু বিস্মৃত হন। তাদের আচরণে পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে যায়, পদ হারান, আর্থ সংকটে পড়েন, গ্রেপ্তার হন, দুর্ঘটনার শিকার হন এবং অপরাধবোধ, লজ্জা, আত্মসম্মানহীনতা, যৌন অক্ষমতা ও হতাশার মধ্যে ভোগেন। তবুও তারা যৌন আকাংখার বন্য প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন না। ধর্মবোধ ও ধর্মাচারও কাজে লাগে না।
বিশ্বজুড়ে রাজনীতি চলে গণতন্ত্রের ধারায়, যার সঙ্গে ধর্মীয় রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এখন আর বিশ্বাস করা হয় না যে, আধুনিক রাজনীতিতে আল্লাহ বা ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস প্রকৃত প্রেরণার কোনো উৎস নয়। রাজনীতিবিদরা এবং সকল দেশের সংবিধানে জনগণকে ক্ষমতার উৎস বলা হয়, কিন্তু যারা ক্ষমতায় যায়, তারা কোনো না কোনোভাবে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠে এবং জনগণকে দাবিয়ে রাখার জন্য যতরকম উপায় আছে তা প্রয়োগ করে। একথা সত্য যে, ধর্ম এখনও পশ্চাদপদ দেশগুলোতে একটি অপ্রকৃত বা কল্পিত প্রেরণা হিসেবে কাজ করে এবং বিশেষ করে শাসকরা ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। বিশ্বে এখনও এমন জনপদ ও জনগোষ্ঠী বিদ্যমান, যেখানে জার্মান দার্শনিক ফ্রেডারিখ নিটশের ভাষায় “ ঈশ্বরের মৃত্যু সংবাদ পৌঁছায়নি।”
এটাও স্পষ্ট যে, কিছু মানুষ এখনও এই ভেবে নিজেদের ও তাদের অনুসারীদের প্রতারিত করে যে, সর্বশক্তিমান তাদের ব্যক্তিগত বিষয়ে আগ্রহী। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা কঠিন। রাজনৈতিক সংগ্রামে সৃষ্টিকর্তা কোনো এক পক্ষ নেন না। যারা ভাবেন, সৃষ্টিকর্তা তাদের পক্ষে, তারা এখনও বিশ্বাসের অন্ধত্বে গভীরভাবে আচ্ছন্ন। এখন মানুষ তার জীবনের কোনো না কোনো স্তরে বুঝতে বাধ্য যে, আধুনিক রাজনীতির কোনোকিছুই বাস্তবে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে জড়িত নয়। যেকোনো রাষ্ট্রে জনগণের বিপুল অংশই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, পরকাল বিশ্বাস করে, কিন্তু জাগতিক কাজে, বিশেষ করে রাজনীতিতে সৃষ্টিকর্তা বা ধর্মের করণীয় কিছু আছে বলে বিশ্বাস করে না। রাজনীতিবিদরা মানুষের এই ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগাতে ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করা হয় মাত্র।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা