নাবিল নিশাত
বিপ্লবের জন্ম
………………..
বিপ্লবীরা জন্মায় না গর্ভে—
জন্মায় গর্জনে,
যেখানে বুলেট আর রক্তধারা
একই বর্ণমালা লেখে পাথরে।
তারা শিশু নয়,
তারা আগ্নেয়গিরির সন্তান—
জন্মমুহূর্তেই বয়স্ক,
জানে মৃত্যু একমাত্র আপসহীন সত্য।
রাজপথ তাদের জন্মভূমি,
প্রতিটি পদক্ষেপ এক একটি সমাধি,
প্রতিটি শ্বাস এক একটি ইশতেহার—
বাঁচার নয়, জ্বলে যাওয়ার।
তারা পড়ে না মৃত্যুর কোলে,
তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে—
যেমন পতঙ্গ আলোর দিকে,
জেনেও যে আলোই তার শেষ ঠিকানা।
বিপ্লব মানে আপস না করা
নিজের সাথেও নয়,
ইতিহাসের সাথেও নয়,
এমনকি ভবিষ্যতের সাথেও নয়—
শুধু বর্তমানের অগ্নিকুণ্ডে
নিজেকে জ্বালানি বানানো।
জুলাই ১৯৫২
………………..
জুলাই যখন নামে,
আমি দেখি রফিকের চোখ
ভেদ করে তাকিয়ে আছে আজকের রাজপথে।
শফিকের পায়ের ছায়া পড়ে টিনের ঘর,
দরিদ্র উঠোন,
ছোট শহরের অর্ধউলঙ্গ প্রতিবাদে।
তারা ফিরে আসে বার বার—
নতুন নামে, নতুন মুখে,
তবু একই ধ্বনিতে:
“এই দেশ আমার—
এই ভাষা, এই বাতাস, এই প্রতিবাদও!”
যখন ঢাকায় জ্বলে ওঠে আগুন,
চাঁদপুরে ছুটে যায় ছাত্রীর আর্তনাদ,
নোয়াখালীর গলিতে ঘুরে বেড়ায়
একটি ব্যাগভর্তি স্বপ্ন আর একটা রক্তমাখা খাতা।
তখনই আমি শুনি—
১৯৫২-এর কণ্ঠে বাজে ২০২৪-এর ঢোল।
শহীদ মিনারের শিরা বেয়ে বয়ে আসে
ভাঙা শব্দ,
ভাঙা বুক,
ভাঙা রাষ্ট্রযন্ত্র।
তুমি ভাবো, ইতিহাস পেছনে ফেলে আসে?
না,
ইতিহাস প্রতিটি মৃত্যুকে
নতুন নামে পুনরাবৃত্তি করে—
জুলাই তাই ফিরে আসে,
দুপুরের ক্লান্ত রোদে,
ক্যাম্পাসের নীরব গেটে,
মায়ের চোখে ছেলের ছবি হয়ে।
যতবার কেউ গুলি খায়,
একটি মিছিল এগিয়ে যায়,
একটি কণ্ঠ থেমে গিয়ে
হাজার কণ্ঠকে জাগিয়ে তোলে—
ততবার আমি শুনি
শহীদের ভাষা জেগে ওঠে
আমাদের রক্তে,
আমাদের ঘুমহীন প্রতিবাদে।
এ কবিতা কোনো অলংকারে বাঁধা না,
এটি খোলা আকাশে
তাকিয়ে থাকা এক প্রহরীর উচ্চারণ—
যে জানে,
স্বাধীনতা কোনো ঘোষণাপত্রে লেখা যায় না,
তা লেখা হয় শুধু
রক্তে, সাহসে,
আর শব্দে।
রফিকের রক্ত আর সাঈদের চোখ
একই ভাষায় কথা বলে—
যেখানে ব্যথা মানে প্রতিবাদ,
আর প্রতিবাদ মানেই ভালোবাসা।
আমরা কাঁদি না, আমরা জ্বলি।
আমরা ঝরে না, আমরা বৃষ্টি হই
এই দেশের শুকিয়ে যাওয়া জমিনে।
আমরা বলি না “ভবিষ্যৎ”
আমরা বলি “এখনই”।
আমরা হেঁটে চলি
ভাষার ভিতর দিয়ে,
আত্মার ভিতর দিয়ে,
বাংলার ভিতর দিয়ে।
জুলাই ১৯৫২
আজও লিখে চলে
প্রতিটি শহীদের নাম,
প্রতিটি আন্দোলনকারীর স্বপ্ন,
প্রতিটি নীরব বুকের মধ্যরাতের আর্তি।
এ কবিতা শেষ হয় না—
এ চলতে থাকে,
যতদিন কেউ বলে
“বাংলা আমার, এবং আমি বাংলার।”
৩৬শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭১
…………………………….
একুশের নিকোটিন শিরে বনসাই,
জীবনের গান ভুলে, ভুলে গেছে পথ।
ইতিহাস দেখো, দেখো দৃপ্ত শপথ —
স্তব্ধ নীলিমা আলোর ঝলকে গায়।
রক্তের স্রোতে কারা আনলো বিজয়?
জীবন বিলিয়ে দিয়ে গেলো কারা ভাষা?
পথহারা তরুণেরা কী সর্বনাশা!
ঘরকোণে ডুবে থাকা জেন-জি সুজয়।
শিকল ছিড়লো, জ্বেলে আগুন মশাল,
চব্বিশে নেমে এলো রফিক – সুজয়
পূর্বসূরীর রক্ত হটালো ভয়—
ভেঙে গেলো হায়েনার স্বৈর ত্রিসাল।
একুশের বুকে ষোলো হতে ছত্রিশ
এক গাথুনির ভিন্ন ভিন্ন শিষ।







