প্রচ্ছদগল্পউপন্যাসএকজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

ধারাবাহিক উপন্যাস : নেয়ামত ইমাম

একজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

নেয়ামত ইমাম 

প্রথম খণ্ড 

২.

পরদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে কাপড় পরিবর্তন করবার আগেই দরজায় টোকা পড়ে। দরজা খুলে দেখি সামিয়ানা দাঁড়িয়ে। সে আমার ফ্ল্যাটের মালিক। অবিবাহিত হলেও সাবলেটটি আমার কাছে ভাড়া দিতে সে পিছ-পা হয়নি। আমার জন্য ভাড়াও সে কমিয়ে দিয়েছে মাসে দুইশ টাকা করে। বয়সে আমার চেয়ে কিছুটা বড় হলেও সে আমাকে “আপনি” করে সম্বোধন করে। আমার এখানে আসার পর থেকে এমন বিশেষ কিছু সে রান্না করেনি যা আমার সঙ্গে ভাগ করে খায়নি। তার আতিথেয়তা কখনো একটি নিরব অত্যাচার মনে হলেও এবং তাকে তা খুলে বললেও সে আবার এসে দরজায় হাজির হয়। আজও ভিন্নতর কিছু ঘটেনি। 

“গতকাল সামান্য পোলাও রান্না করেছিলাম,” সে বলে। “আপনার জন্য অপেক্ষা করেছি ঘুমাতে যাবার আগ পর্যন্ত। এখন গরম করে এনেছি। বাইরে যাবার আগে খেয়ে নিবেন।” কথা না বাড়িয়ে তার হাত থকে বাটিটি নেই, বলি, “একটু জরুরি কাজ ছিল। তাই ফিরতে দেরি হয়ে গেছে।” “সব ঠিক আছে তো?” সে জিজ্ঞেস করে। “হ্যাঁ, সব ঠিক আছে,” আমি জবাব দেই। “কাজের পরিমাণ একটু বেড়ে গেছে কি না, এই যা।” “কাজের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া তো খুব ভালো কথা,” সে বলে। “এতে করে বোঝা যায় কোম্পানির কাছে আপনার গুরুত্ব বেড়েছে। বেতন পাবেন বেশি।” তাকে বলতে পারি না একই পারিশ্রমিকের জন্য আমাকে এখন আগের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। অর্থাৎ কোম্পানি আমাকে আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে না। মার্কেটিং বিষয়ের ওপর নীলক্ষেত থেকে একটি বই কিনেছি, কিন্তু তাতে দেয়া পদক্ষেপগুলো আমার ক্ষেত্রে কেন যেন কাজ করছে না। 

তার চলে যাবার পর আমি পোড়ামাটির ব্যাংকটি ভেঙ্গে কয়েক বছরের জমানো টাকাগুলি বের করে আনি। একটু হিসাব করে খরচ করলে তাতে মাসের বাকি দিনগুলো চলা যাবে বলে মনে হয়। ভালো লাগে যখন ভাবি পাঁচ-দশ টাকা করে জমানো হলেও এ এখন এক বিশাল সঞ্চয় হিসাবে দেখা দিয়েছে। টাকাগুলো পকেটে নিয়ে হাত পরিষ্কার করে খাবারের বাটিটি সামনে নিয়ে বসে যাই। চমৎকার রান্না করেছে সামিয়ানা। কি প্রাণকাড়া ঘ্রাণ। তবে তাকে কিছু বলা যাবে না। তাহলে সে সোজা রান্নাঘরে চলে যাবে, একই খাবার রান্না করবে আবার। কে জানে, হয়তো সন্ধ্যা বেলায় ফিরে আসার পর তাকে আবার বাটি হাতে দরজায় দাঁড়াতে দেখবো।

তবে এই পরিকল্পনা আজ কাজ করে না। সামিয়ানা জানে আমি কখন বেরিয়ে যাই। সে অনুযায়ী সে তার দরজাটি খোলা রাখে এবং আমার পায়ের শব্দ শুনে বাইরে তাকায়। “বেরিয়ে যাচ্ছেন বুঝি?” সে জিজ্ঞেস করে। “জ্বি, একটু তাড়া আছে,” আমি বলি। “এক জায়গায় যেতে হবে।” তারপর সামনের দিকে চলতে শুরু করলে সে দরজায় আসে, তার চোখে একটাই প্রশ্ন থাকে, যে প্রশ্ন আমি এড়িয়ে যতে চাই : খাবার কেমন হয়েছে? কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আমি পেছনে তাকাই, বলি, “খাবার খুব ভালো হয়েছে। সন্ধ্যায় আপনাকে বাটিটা ফেরত দেবো।” তাতে তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

বাসে করে যাত্রাবাড়িতে পৌঁছার পর ষড়ঋতু খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয় না। ব্যবসার স্থানটি সহজেই চোখে পড়বার মতো, বিশেষ করে গাড়ি চালকদের। রাস্তা অতিক্রম করবার বাতিগুলোর কথা মনে রেখে পাশে তোলা হয়েছে ছয় ফিট বাই নয় ফিটের বিশাল সাইনবোর্ড। তাতে দুটি চকচকে গাড়ির ছবি, ওপরে বড় হরফে লেখা ‘আমরা পুনরুজ্জীবনে বিশ্বাস করি’। নিচে ব্যবসার ঠিকানা ও তারকাচিহ্ন দিয়ে নতুন কাস্টমারদের দশ ভাগ ভর্তুকি দেবার প্রতিশ্রæতি। তার নিচে একটি তীর চিহ্ন। চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হলে আগামি বছরগুলোতে এখানে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হয়।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলে ষড়ঋতুর নতুন মেকানিক আমাকে বসতে দেয়। “আজ সকালে আমার আসবার কথা,” আমি বলি। এই ব্যাপারে সে কিছু জানে না বলে জানায়। ম্যানেজার সাহেব জনাব মোয়াজ্জেম হোসেনের নাম উল্লেখ করলে সে বলে তিনি সচরাচর দুপুরের দিকে আসেন। “তিনিই আমাকে ফোন করে আজ সকাল নয়টায় আসতে বলেছেন,” আমি বলি। তা সে অস্বীকার করে না, কিন্তু বলে, “এরকম একটি ব্যবসা চালানোর জন্য ম্যানেজারের দরকার হয় না। একজন মেকানিক হিসাবে আমিই কাস্টমারদের সঙ্গে কথা বলি এবং সার্ভিস দেই।” “আমি কাস্টমার নই,” আমি বলি। বুঝতে পারি কোথায় ভুলটা হচ্ছে। “সাপ্লায়ারের প্রতিনিধি।” “তাই না কি?” সে বলে এবং আমাকে বসতে দেয়। আমি তাকে মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলি। সে ম্যানেজারের কাঁচবাঁধানো কক্ষে যায়, সেখান থেকে ফিরে এসে বলে, “উনি জানেন আপনি এখানে আছেন। বললেন এখনই রওয়ানা করবেন। আসতে কুড়ি মিনিট লাগবে। চা দেবো?”

চা হাতে নিয়ে আমি একটি প্রলম্বিত দিনের জন্য প্রস্তুত হই। কুড়ি মিনিটের অর্থ আমি জানি। কখনো এর অর্থ দুই ঘন্টা। কখনো ছয় ঘন্টা। বেশিরভাগ সময়েই এর অর্থ দাঁড়ায় আজ চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হবে না। তবে তা জানা যাবে শুধু দুই ঘন্টা বা ছয় ঘন্টা অপেক্ষা করবার পর। তার আগে নয়। আমি জানি একজন বিক্রয় প্রতিনিধিকে অল্পতে হাল ছেড়ে দিতে নেই, সেজন্য ব্যাপারটিকে আমি সহজভাবে নেই – এমনকি ঘড়ি ধরে পুরােপুরি দুই ঘন্টা পার হয়ে যাবার পরেও। আরো দুই ঘন্টা পার হবার পর যদি মেকানিক আমাকে বলে ম্যানেজার সাহেব আমাকে সন্ধ্যা বেলায় বা পরের দিন সকালে আসতে বলেছেন, তাহলে আমাকে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আমি চিৎকার করতে পারবো না, বলতে পারবো না এই কাস্টমার আমার দরকার নেই।

মোয়াজ্জেম হোসেন আসেন সাড়ে বারোটার দিকে। তিনি একজন অমায়িক লোক। ব্যবসায় ঢুকেই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। “আপনাকে আজ আমি খুশি করে দেবো, আসাদুজ্জামান সাহেব। দেখবেন,” চেয়ারে বসে তিনি বলেন। “ছেলেটাকে স্কুলে নিয়ে যেতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। সচরাচর কাজটি করেন আমার বেগম। কিন্তু আজ তিনি কি বুঝে যেন দায়িত্বটি আমার ওপর ছেড়ে দেন, এমনকি আপনাকে সকাল বেলায় আসতে বলেছি জেনেও। কি আর করা, তাকে তো আর ‘না’ বলা যায় না। দিন, আপনার কাগজপত্র দিন।” আমি ফাইলটি এগিয়ে দিলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে দুটি কপিতে সই করেন এবং একটি কপি আমার দিকে এগিয়ে দেন। “আমাদের চা দিন,” মেকানিককে উদ্দেশ্য করে বলেন তিনি। “আমাকে একবার চা দেয়া হয়েছে,” আমি বলি। “আর চাই না।” “সে কি, আমাদের অফিসে এসে চুক্তি পাকা করবার পর আপনি চা না খেয়ে চলে যাবেন, তাতো হয় না,” তিনি বলেন। “শুধু আজকে কেন, এই এলাকায় যখনই আসবেন, আমাদের অফিসে অবশ্যই পা রাখবেন এবং আমি না থাকলেও চা খেয়েই তবে যাবেন।” “ঠিক আছে,” আমি বলি। “মনে থাকবে।”

ষড়ঋতু থেকে বেরিয়ে আশেপাশের আরো কয়েকটি অটো বডি শপে ঢু মেরে বিকেলের দিকে আমি স্বাক্ষরিত কপিটি জমা দেবার জন্য কাকরাইলে যাই। সেখানে রফিকুল্লার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। চুক্তিপত্রটি স্বাক্ষরিত হয়েছে জেনে সে খুব খুশি হয়। “আজ আমিও বড় দাগের একটা চুক্তি করেছি,” সে বলে। “চলুন আজ সন্ধ্যায় একটু আনন্দ করা যাক।” মনে মনে খরচের কথাটি ভেবে আমি রাজি হই না। তা ছাড়া মাসের শেষে বাবাকে কিছু টাকা পাঠাতে হবে, যার আয়োজন এখনো হয়নি। সে ব্যাপারটা বুঝতে পারে, বলে আজকের আপ্যায়ন তার ওপর। কিছুটা আমতা আমতা করে আমি রাজি হই।

আমরা অতীশ দীপঙ্কর রোডে অবস্থিত দোতলা-বিশিষ্ট নীহারিকা রেস্টুরেন্টে যাই। সেখানে সে আমাদের জন্য দুটি খাশির রেজালা কেনে। খেতে খেতে সে মন্তব্য করে সারা জীবন বিক্রয় প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করলে আমাদের চলবে না। এই কাজে কয় টাকাই বা আয় হয়, কিছু জমানো তো দূরের কথা। সে আমার মনের কথা বলেছে। “অনেক অনেকদিন ধরে আমিও তাই ভাবছি,” আমি বলি, “কিন্তু অন্য কিছু করার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত আমাদেরকে বিক্রয় প্রতিনিধি হয়েই থাকতে হবে। কি আর করা।” তখন সে বলে বিক্রয় প্রতিনিধির সংজ্ঞাটা যদি একটু পাল্টে দেওয়া যায়, সামান্য একটু, তাহলে আমরা আমাদের জীবনকে কিছুটা হলেও উন্নত করতে পারবো। “তার মানে কি?” তার দিকে জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকালে সে বলে ষড়ঋতুর ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেন সাহেব যে আজ আমার চুক্তিতে সই করবেন তা আজ সকালে আমার যাত্রাবাড়ি যাবার আগেই সে জানতো। ব্যাপারটা আমার কাছে ভ‚তুড়ে মনে হয় এবং আমি তাকে তা স্পষ্ট করে বলি। “এই চুক্তির জন্য আমি মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে কয়েকবার আলাপ করেছি, তার ব্যবসার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছি, তার সঙ্গে বসে দরকারী মালপত্রের তালিকা তৈরি করেছি, তাকে বুঝিয়েছি আমরা কিভাবে তাকে সাহায্য করতে পারি। সব কিছু বিবেচনা করে তবেই তিনি চুক্তিপত্রে সই করতে রাজি হয়েছেন।” “এ সবই ঠিক আছে,” সে বলে, “কিন্তু তার মানে এই নয় যে কাজ করলেই সফলতা আসবে। অনেক ব্যবসার জন্য আমরা এরকম কাজ করে থাকি, কিন্তু মাত্র শতকরা পাঁচ ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সফল হই। তাই না?” আমি তার এই উপসংহার উড়িয়ে দিতে পারি না। কোনো কোনো বছর দেখা যায় আমি শতকরা পাঁচ ভাগ ক্ষেত্রেও সফল হতে পারি না। যদি এমন না হতো, যদি সফলতার পরিমাণ অন্তত দ্বিগুণ করা যেতো, তাহলে আমার দৈন্যদশা অনেক আগেই কেটে যেতো।

“কোনটা ভালো,” রফিকুল্লা এরপর বিশ্লেষণ করে বলে, “আমরা কুড়িটা ব্যবসায় যাই এবং সেগুলোর মধ্যে মাত্র একটা ব্যবসা চুক্তিপত্রে সই করে, নাকি আমরা যাই মাত্র পাঁচটা ব্যবসায় এবং সেগুলোর মধ্যে পাঁচটাই চুক্তিপত্রে সই করে?” অর্থাৎ শতভাগ সফলতা। আমি হাসি। মগের মুল্লুক নাকি। এই কাজে আমি যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। আমি মনে করি না এমন কোনো উপায় রয়েছে যা প্রয়োগ করলে শতভাগ সফলতা অর্জন করা যেতে পারে। মার্কেটিং বইটিতে যে ঐতিহাসিক ডাটা দেয়া হয়েছে, তাতে দেখানো হয়েছে বিভিন্ন দেশে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সার্বিক লক্ষ্যের শতকরা দুইভাগ পরিমাণ সফল হলেই যুগের পর যুগ লাভজনকভাবে বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি নতুন প্রজন্মের যেসব বিক্রয় প্রতিনিধি সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে আমাকে পেছনে ফেলে দিয়েছে, তারাও কখনো এই রকমের বিশাল সফলতার মুখ দেখেনি। 

“বিষয়টা বোঝার জন্য আমি কয়েক মাস আগে থেকে চেষ্টা করতে শুরু করি,” রফিকুল্লা বলে। “এক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট বলতে পারেন। তথ্য সংগ্রহ। হিসাব-নিকাশ। কিন্তু তার ফল পেতে শুরু করি মাত্র সম্প্রতি।” সে দুই কাপ দুধ চায়ের অর্ডার করে এবং আমার মুখের ওপর দৃষ্টি স্থাপন করে বলে, “আমার উপস্থিতিতে একজন প্রভাবশালী লোকের পক্ষ থেকে কাল রাতে মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে কথা বলা হয়। চুক্তিপত্রটা যে অবস্থায় আছে সে অবস্থাতেই অনুমোদন করবার জন্য তাকে জোর নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি রাজি না হওয়া পর্যন্ত তার ব্যবসায়ের বিভিন্ন বিভিন্ন দিক নিয়ে তুমুল আলোচনা চলে। যার কারণে আপনার আজকের এই সফলতা।” 

তার বক্তব্য মেনে নিতে কষ্ট হয় আমার। কিন্তু তার কথার মধ্যে কিছুটা যুক্তি খুঁজে পাই, যখন সে আমাকে বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলে। “মোয়াজ্জেম হোসেন আমাদের কাছ থেকে মাল কিনবেন মাত্র দুটি কারণে,” সে বলে। “এক, আমাদের মাল বিক্রি করে তার লাভ হয় বেশি, এবং দুই, আমাদের মাল না কিনে তার উপায় নেই। আমাদের মাল বিক্রি করে তার বেশি লাভ হয় কি না তা নির্ভর করবে অন্য কোম্পানির মালের পাইকারি দরের ওপর ও মালের খুচরা বাজার দরের ওপর। অন্য কোনো যন্ত্রাংশ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি তাকে দেখাতে পারে অমুক বা অমুক মাল সে তার কাছ থেকে কম দামে কিনতে পারে এবং পরে সেগুলো খুচরা কাস্টমারের কাছে একই বাজার দরে বিক্রি করতে পারে। তাতে আমাদের চুক্তিটি অনুমোদন করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। কিন্তু কেউ তাকে বোঝাতে পারে – যে হয়তো একজন বিক্রয় প্রতিনিধি নয়, অন্য কেউ, প্রভাবশালী কেউ – আমাদের চুক্তিটি অনুমোদন না করলে তার প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হবে, প্রতিষ্ঠানটি একদিন আস্তিত্বিক সঙ্কটে পড়বে। সোজা কথায় বলা যায় তাকে ব্যবসা করতে দেয়া হবে না। এক্ষেত্রে আমাদের চুক্তিটি মেনে নিলে আর্থিকভাবে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সে অন্য কোনো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হবে না। এটাকে বলা যায় তার ওপর আধিপত্য বিস্তার করা। যতদিন এই আধিপত্য বহাল থাকবে ততদিন এই চুক্তি থাকবে, ততদিন আমরা কমিশন পেতে থাকবো।”

আমাকে নিরব হয়ে যেতে হয়। “এরকম কিছু করা কি সম্ভব আমি জানি না,” আমি বলি। “ভালো ফল পাবার জন্য আমি কষ্ট করতে রাজি আছি, সারা জীবন কষ্ট করতে রাজি আছি। কিছু শিখতে হলে শিখবো। আমি কারো ওপর আধিপত্য বিস্তারের পক্ষে নই। কয়েকটা বাড়তি টাকার জন্য তো নয়ই।”

“কিন্তু আর কতকাল সাবলেটে থাকবেন?” রফিকুল্লা বলে। “আর কতকাল একজন অসুস্থ লোককে দেখতে যাওয়ার জন্য সহকর্মীর কাছ থেকে টাকা হাওলাত করবেন? এসব এবারই শেষ হতে হবে। আমি মশকরা করছি না। এসব এবারই শেষ হতে পারে, খুব বড় আকারে শেষ হতে পারে এবং এজন্য আমাদেরকে কিছুই করতে হবে না। শুধু তাই নয়, একদিন আমাদের জীবনে এমন পাগল করা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, যখন ব্যবসার জন্য আমাদেরকে হেঁটে হেঁটে ষড়ঋতু অটো বডি শপে যেতে হবে না, পরিবর্তে আমরা মোয়াজ্জেম হোসেনকে বলবো আপনি অমুক তারিখের অমুক সময়ে আমাদের কাছে আসুন এবং চুক্তিপত্রে সই করে যান। কোনো প্রশ্ন না তুলে তিনি আসবেন এবং সই করে ব্যবসার জন্য আমাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে তারপর যাবেন।” 

রফিকুল্লা আমার অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন – এজন্য আমি তাকে মনে মনে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু আমি যা মেনে নিতে পারি না তা হচ্ছে আমি সাবলেটে থাকি বা তার কাছ থেকে টাকা হাওলাত করেছি এসব প্রসঙ্গ তোলা। সে হয়তো বুঝতে পারে না সে আমাকে লজ্জার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। সে আমার দ্বিধা পড়তে পারে। 

“ঠিক আছে,” সে বলে, “এমন একটা কাস্টমারের নাম বলুন যে আপনার সঙ্গে চুক্তি করতে রাজি হচ্ছে না বা যে চুক্তি করবো-করছি বলে বেশ কিছুদিন ধরে আপনাকে ঘোরাচ্ছে।” “বাবু বাজারের সুমন এন্টারপ্রাইজ,” আমি বলি। “তারা নাকি দোকান বড় করতে গিয়ে প্রচুর টাকা খরচ করে ফেলেছে এবং সেজন্য নতুন মালের চুক্তি করতে পারবে না। তাছাড়া দোকানে যা মাল আছে তা বিক্রি করতে আরো কয়েক মাস সময় লেগে যাবে বলেও আমাকে বলেছে।” “এগুলো তাদের অজুহাত,” রফিকুল্লা বলে। “লুকিয়ে লুকিয়ে তারা নিশ্চয়ই কারো না কারো কাছ থেকে মাল নিচ্ছে। কিন্তু আমরা যখন তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের কথা চিন্তা করবো, তখন এসব কিছু আমাদের গুরুত্ব দিলে চলবে না। দোকানে মাল থাকলেও তাদেরকে আমাদের কাছ থেকে বাড়তি মালের অর্ডার করতে হবে। দোকান বড় করতে টাকা খরচ করেছে কি করেনি তা এর মধ্যে আসতে পারবে না। দোকান বড় করে তারা যদি অনেক টাকা রোজগার করে তাতে আমাদের লাভ কি? চুক্তিমতো আমাদের কাছ থেকে মাল নিলে তবেই আমাদের লাভ।”

আমি আগে কখনো রফিকুল্লাকে এভাবে কথা বলতে শুনিনি। ব্যবসা নিয়ে ইদানিং সে অনেক পড়াশোনা করছে বলে মনে হয়। কোম্পানির কেউ এসব ব্যাপার জানে কি না জানি না। এমন হতে পারে যে আর বেশি দিন সে আমাদের সঙ্গে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসাবে থাকতে চায় না। 

“এক সপ্তাহের মধ্যে সুমন এন্টারপ্রাইজ আপনার চুক্তিপত্রে সই করবে,” সে বলে। “সব আমার ওপর ছেড়ে দিন। আপনাকে কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে হবে না, কারো কাছে দৌড়াতে হবে না। এই ছোট্ট সফলতাটুকু পেলে আপনি আমাকে বিশ্বাস করবেন তো?”

“আমি এখনো আপনাকে বিশ্বাস করি, রফিক,” আমি জবাব দেই। “সমস্যা সেটা নয়। সমস্যা হচ্ছে পুরো ব্যাপারটা কেমন যেন আমার আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমি ঠিক মিলাতে পারছি না ব্যবসার ক্ষতি হতে পারে জেনেও কেন কেউ এমন একটি চুক্তিপত্রে সই করতে রাজি হবে। মার্কেটিং-এ তো এমন কোনো বিষয়ের কথা লেখা নেই। সেখানে রয়েছে সুস্থ বা অসুস্থ প্রতিযোগিতার কথা, কাঁচামাল সংগ্রহের ব্যাপারে দূরদর্শী হবার কথা, কাস্টমারের কাছে প্রতিবার অতিরিক্ত কিছু বিক্রি করতে চেষ্টা করবার কথা। কাস্টমারের ওপর আধিপত্য বিস্তার করার ব্যাপারটি তো এর কোনোটির মধ্যে পড়ে না।”

জবাবে রফিকুল্লা হাসে। বলে, “এ হচ্ছে অসুস্থ প্রতিযোগিতার এক নতুন সংস্করণ।”

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা