তৈমুর খান
গতকাল তসলিমা নাসরিনের সংবর্ধনা সভাকে কেন্দ্র করে যে অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একজন প্রথিতযশা কবির অপমান বা একজন নির্বাসিত সাহিত্যিকের সম্মান প্রাপ্তির সরল সমীকরণ দিয়ে বিচার করা যায় না। এর নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক মেরুকরণ, মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং একজন কবির ব্যবহারিক জীবন ও কাব্যিক সত্তার দীর্ঘকালীন টানাপোড়েন।
তসলিমা নাসরিনের সংবর্ধনা সভার আয়োজক এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার মূল ভিত্তি রয়েছে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের বহু সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নেপথ্যে এমন কিছু সংগঠনের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, যাদের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে মূলধারার প্রগতিশীল বা ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সংঘাত রয়েছে। ফলে, তসলিমা নাসরিনের মতো একজন বিতর্কিত ও নির্বাসিত লেখককে কেন্দ্র করে যখন এমন কোনো মঞ্চ প্রস্তুত হয়, তখন সেখানে সাহিত্যিক ভাবনার চেয়ে রাজনৈতিক প্ররোচনা ও মেরুকরণের হিসাব-নিকাশই বেশি সক্রিয় থাকে।
জয় গোস্বামী শুধু বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নন, দীর্ঘকাল ধরে তাঁর নাম নানাভাবে রাজ্যের শাসক দলের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে এসেছে। একজন কবি যখন নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে একরকম স্পষ্ট বা প্রচ্ছন্নভাবে কোনো বিশেষ শিবিরের সঙ্গে যুক্ত রাখেন, তখন তাঁর পক্ষে বিপরীত মেরুর আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া মানেই এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করা।
নিন্দুকেরা বা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই উপস্থিতিকে নতুন সমীকরণের চেষ্টা বা সুবিধার রাজনীতি হিসেবে দাগিয়ে দিতেই পারেন।
তসলিমার প্রতি যদি তাঁর প্রকৃত শুভকামনা বা সাহিত্যিক সৌহার্দ্য থাকতও, তবে তা মঞ্চে শারীরিক উপস্থিতির চেয়ে বার্তা পাঠিয়ে বা প্রকাশ্যে অবস্থান স্পষ্ট করেই সম্পন্ন করা যেত। এই সভায় যাওয়ার সিদ্ধান্তটি যে তাঁর নিজের ভাবমূর্তির জন্য বুমেরাং হতে পারে, তা অনুমান না করার কোনো কারণ ছিল না।
বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে ‘সেকুলারিজম’ বা ধর্মনিরপেক্ষতা প্রায়শই সিলেক্টিভ বা বাছাবিচারমূলক হয়ে দাঁড়ায়। তসলিমা নাসরিনকে একপক্ষ লুফে নেয়, আবার অরুন্ধতী রায়কে আশ্রয় করে অন্যপক্ষ। এই বিভক্ত সংস্কৃতিতে প্রকৃত মানবতাবাদ বারবার সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের বলি হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সব মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য একটি অভিন্ন ও সর্বজনীন মঞ্চ পাওয়ার আশা আজও সুদূরপরাহত। এই ট্র্যাজেডির ট্র্যাডিশন সহজে বদলানোর নয়।
কবি জয় গোস্বামীকে দুটি আলাদা সত্তায় ভাগ করে দেখা ছাড়া আজ আর উপায় নেই:
ব্যবহারিক জীবনের জয়: যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার সান্নিধ্য পেতে চেয়েছেন, সুবিধা বা ক্ষমতার কোলাহলে বারবার নিজেকে জড়িয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি মঞ্চে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন যেখানে তাঁর লাঞ্ছিত হওয়ার সব রকম রসদ প্রস্তুত ছিল। এই বাস্তব জীবনের জয় গোস্বামী তাঁর দীর্ঘকালীন সাহিত্যিক গাম্ভীর্য ও অবস্থানকে নিজেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন।
কাব্যিক সত্তার জয়: যিনি ‘ঘুমিয়েছ ঝাউপাতা?’, ‘ভুতুম ভগবান’ কিংবা ‘পাগলী, তোমার সঙ্গে’-র মতো অমর পংক্তিমালা সৃষ্টি করেছেন। কাব্যের সেই ঈশ্বরকে কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ, কোনো অবমাননা বা কোনো সভার বিশৃঙ্খলা ছুঁতে পারে না।
জয় গোস্বামীর অপরাধ বা ভুল এই ছিল যে, তিনি তাঁর অমর কাব্যিক সত্তাটিকে জাগতিক সুবিধা ও রাজনৈতিক সমীকরণের মলিনতায় জড়িয়ে ফেলেছিলেন। স্রষ্টা হিসেবে তিনি চিরকাল অক্ষত ও মহিমান্বিত, কিন্তু মানুষ হিসেবে সেই মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ছিল এক avoidable miscalculation বা এড়িয়ে যাওয়ার মতো এক ভুল পদক্ষেপ। কবির এই দ্বৈত রূপের কারণেই আজ সুধী সমাজে এমন গভীর আক্ষেপ ও বেদনার সৃষ্টি হয়েছে।
…………
কবি। পশ্চিমবঙ্গ, ইন্ডিয়া।







