প্রচ্ছদগদ্যদেশকে এত আঘাত কোনো লেখক করেনি

লিখেছেন : রাসেল মাহমুদ

দেশকে এত আঘাত কোনো লেখক করেনি

রাসেল মাহমুদ 

তসলিমা অদ্ভুত! জন্ম মুসলমান হিসেবে। কিন্তু ‘নিজেকে তিনি ধর্মের উর্ধ্বে নিয়ে গেছেন’; কৈশোরে তেমনটাই ভাবতাম। একটু বয়স বাড়লে দেখলাম, তিনি হিন্দুধর্ম প্রেমী এক নাস্তিক! ভারতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের স্বরে কথা বললে তিনি বেশ কড়তালি পান। সেই ভারতের রাজ্য কলকাতা থেকেও তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মাঝে মাঝে কনফিউশন লাগে এটা ভেবে যে ‘তসলিমার আসলে দেশ কোথায়?’ মনে হয়, তসলিমা নাসরিনের মতো আর কোনো লেখক কি দেশকে এত আঘাত করেছে? 

নতুন প্রজন্মের অনেকে তসলিমাকে চেনে না। বেশিরভাগই তসলিমার বই পড়েনি। তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এক অসাধারণ গদ্যকার (ছিলেন)। কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর সঙ্গে প্রেমে জড়ানোর আগেও তিনি কবিতা লিখতেন, কিন্তু রুদ্রর প্রেম তার কবিতাকে করে তুলেছিল ঝকঝকে, কোমল, প্রেমময়। বিয়েও করেছিলেন রুদ্রকে, সংসার টেকেনি। ডিভোর্সের পরও তাদের প্রেমটা ছিল।

তবে তসলিমার প্রেম নিয়ে এসব কথা লেখা বা পড়া অর্থহীন। কারণ রুদ্রর পর তিনি আরও বেশ কয়েকটি প্রেম ও বিয়ে করেছেন। কোথাও থিতু হতে পারেননি। হবার দরকারও ততটা ছিল না। তসলিমা কি আর প্রথাগত সংসার করার মানুষ? তার আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘ক’ বেরোবার পর অনেক সাহিত্যিকের নাম তিনি ফাঁস করেছেন, যাদের সঙ্গে তিনি মিলিত হয়েছিলেন। এমনকি এ নিয়ে একটা ভয়াবহ রসালো কৌতুকও আছে, এমনকি ঘটনাটি সত্য হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। মজার ঘটনা পরে বলছি।  

বাংলাদেশে তসলিমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। লেখার কারণে হুমকি-ধামকির মুখে তাকে দেশ ছাড়তে হয় ১৯৯৪ সালে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ঘরানার সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ, তত্বাবধায়ক, সামরিক সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার। কেউই তাকে দেশে ফেরানোর চেষ্টা করেনি। অপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে কে মাথা ঘামায়। আমার ধারণা, তসলিমা নিজেই দেশে ফিরতে চাননি। দেশে ফিরলেই ‘ফেরারী লেখক’ স্বীকৃতি হারাবেন তিনি। সম্ভবত এই মহান স্বীকৃতি নিয়েই মরতে চান।

ভারতের কাছে তসলিমা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটির হিন্দু মৌলবাদীদের স্বরে তিনি বাংলাদেশকে কটাক্ষ করেন। বাংলাদেশের মেয়ে যখন বাংলাদেশকে ‘জেহাদিস্তান’ বলে, তখন সেটা সত্য হওয়ারই কথা, তাই না?

২০০৪ সাল থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে থাকতে শুরু করেন। ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তার লেখালেখি নিয়ে সহিংস প্রতিবাদ এবং সেসব ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়। রীতিমতো হাত দিয়ে মেরে তাকে তাড়ানো হয়। তার ঠাঁই হয় দিল্লিতে। ১৯ বছর পর তিনি কলকাতায় ফিরছেন। তাকে ব্যবহার করে শুরু হবে পুরাতন খেলা।

ফ্রান্স প্রতিভাবানদের অ্যাসাইলাম দেয়। ভারতও দেয়। যেমন দিয়েছিল তসলিমাকে। যেমন দিয়েছে শেখ হাসিনাকে। জুলাই অভ্যুত্থানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ মেরেছে আ. লীগ সরকারের পুলিশ ও দলটির নেতা-কর্মীরা। তসলিমা তখন নিশ্চুপ ছিলেন। সরকার পতনের পর ভারতীয় মিডিয়ার মতো বাংলাদেশকে জ*ঙ্গি*রাষ্ট্র সাব্যস্ত করতে তিনি ছিলেন সোচ্চারতম কণ্ঠ। ফেসবুকে আ. লীগ কর্মীদের মতো করে গুজব, ঘৃণা, অপতথ্য ছড়িয়েছেন তিনি। কৈশোরে পড়া কবিতা ও গদ্যের তসলিমাকে ঘৃণা করতে আর কি কিছুর প্রয়োজন আছে?

তসলিমা নাসরিনের জন্ম ১৯৬২ সালে, ময়মনসিংহে। সম্প্রতি প্রায় ১৯ বছর পর তিনি কলকাতা ফিরেছেন, তবু নিজের দেশে নয়। দেশকে যদি নিজের মনে করতেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরতেন। এমন কোনো অন্যায় তিনি করেননি যে ফেরারী আসামীর মতো তাকে আরেক দেশে আশ্রিত থাকতে হচ্ছে! কেউ যখন নিজেই নিজেকে সর্বহারা ঘোষণা করে, দেশে ফেরার সমস্ত পথে নিজেই কাঁটা ছিটিয়ে রাখে, তাকে ফেরায় কে? 

২০২৪ সালের আগস্টে আ. লীগ সরকার পতনের পর তসলিমা যেভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লিখেছেন, তার পুরস্কার নিশ্চয়ই তিনি তার প্রভুদের থেকে পাবেন, পাচ্ছেন বা পেতে শুরু করেছেন। আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা কীভাবে তার ঋণ শোধ করবো? আদৌ করবো? কারণ সেসব তো ক্ষুদ্রঋণ।

তসলিমার উপন্যাস ‘ক’ বের হলো। কবি অসীম সাহাকে কে যেন ফোন করে বলল, দাদা, তসলিমা তো সব ফাঁস করে দিয়েছে। আপনিও নাকি তার সঙ্গে …। দাদা কোনো রকম লুঙ্গির খুট বাঁধতে বাঁধতে দৌড় দিলেন বইয়ের দোকানে। বই নেই কোথাও। শেষে অনেক খোঁজাখুঁজি করে একজনের কাছে পেলেন, কিন্তু সে তো বই ধার দেবে না দাদাকে। কবিরা নাকি বই নিলে ফেরত দেয় না! অসীম দা বইটা ফটোকপি করে নিলেন। বাসায় গিয়ে নাওয়া-খাওয়া রেখে পড়লেন, তারপর ফোন করলেন ওই ব্যক্তিকে, যে তাকে ভড়কে দিয়েছিল। বললেন, ‘হতচ্ছাড়া, আমার তো নাই’। ফোনের ওপাশ থেকে ওই ব্যক্তি বললেন, ‘ক-তে নেই! তাহলে খ-তে থাকবে, অপেক্ষা করেন।’

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা