প্রচ্ছদগল্পফকিরচাঁদ

লিখেছেন : খালিদ সাইফ

ফকিরচাঁদ

খালিদ সাইফ

প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ফুলঝুরি শহরে যখন ফকিরচাঁদ ঢুকত, তখন ঢুকত অনেক স্বপ্ন আর গল্প সাথে নিয়ে। তারপর অর্ধরাত পর্যন্ত তার কিভাবে যেন কেটে যেত বাজারের মধ্যেই। সিনেমা হলে ভালো সিনেমা চললে সে তা মিস হতে দিত না। কখনও কখনও তার সময় কাটত তাড়ির আড়তে, তাড়ি সে খায় বটে কিন্তু কেউ কখনও তাকে মাতাল হতে দেখেনি। বাকি সময় বয়ে যেত বিপণির আলো-আঁধারিতে ভিজে ভিজে, পরিচিত এ-দোকান সে-দোকান ঘুরে ঘুরে। যে-দোকানে সে একবার যেত, সেই দোকানদারের সাথে দশ মিনিট কথা বললেই দোকানদার হয়ে পড়ত তার ভক্ত। অনাস্বাদিত মধু মেশানো থাকত তার কথায়। কণ্ঠের পেলবতা জাদুর মতো আছর করত শ্রোতার ওপর। এ-জন্য ফুলঝুরি বাজার ও শহরে বহু মানুষ তাকে ভালোবাসত।

যে-গ্রামে তার বাড়ি, সে-গ্রাম বাংলাদেশের আদি অকৃত্রিম গ্রামই; তখনও এখানে বিদ্যুৎ আসেনি। বর্ষার সময় এ-গাঁয়ের সাথে শহরের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্নই হয়ে যেত। গ্রামের চারদিকে রহস্যের মতো থইথই করত পানি। কিন্তু শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা যে-ঋতুই হোক না কেন, কোনো বাধাই দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া – ফকিরচাঁদকে শহরে যাওয়া থেকে ফেরাতে পারত না। ফকিরচাঁদ পেশায় ছোটখাটো একজন কৃষক। কৃষিকাজ সে অধিকাংশ সময়ই পাইট (কৃষি-শ্রমিক) দিয়ে করালেও কাজের তদারকি করার জন্য তাকে পাইটদের সাথে থাকতে হতো। কখনও কখনও তাদের সাথে নিজেকেও নেমে পড়তে হতো কাজে। সূর্য মাথার উপর এলে কাজ শেষ করে, বাড়ি গিয়ে পুকুর থেকে গোসল সেরে, দুপুরের খাওয়ার পর সে প্রস্তুতি নিত শহরে যাওয়ার। রাস্তা শুকনো থাকলে কখনও সাথে থাকত ভাঙা একটা সাইকেল। বর্ষাকাল হলে তো আর সাইকেল নেওয়া যেত না, তখন তাকে যেতে হতো হাঁটু বা কোমর পানি ভেঙে। সাগরে নিম্নচাপের কারণে কয়েকদিন বুনো বৃষ্টির সাথে ঝকাস (মাঝারি বাতাস) বইলে তখন হয়ত শহরে যেতে পারত না কিন্তু মনটা পুরোই পড়ে থাকত সেখানে। তারপর আবহাওয়া একটু ভালো হলেই সে ছুটত তার কয়েকদিনের বিরহী শহরে। সেখানে গিয়ে যেন মুক্তির স্বাদ নিত। ফকিরচাঁদের নিজের গাঁ টিয়ামন গ্রামের একটু লেখাপড়া জানা মানুষেরা বলত ফকিরচাঁদ জনসংযোগের যে জন্মগত গুণ পেয়েছে তা নিয়ে চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য পর্যন্ত হওয়া সম্ভব। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ফকিরচাঁদ নিজেও তার এই যোগ্যতা সম্পর্কে সজাগ ছিল না কিংবা রাজনৈতিক নেতা জাতীয় কেউও এই যোগ্যতাকে নিজ দলের কাজে লাগানোর জন্য এগিয়ে আসেনি।

তখন ঢাকায় থেকে লেখাপড়া করি। কখনও কখনও ছুটিতে রাজধানী শহর থেকে আসি ফুলঝুরিতে। এখানে এলে মাঝে মাঝে ফুলঝুরি বাজারে দেখা হতো ফকিরচাঁদের সাথে। সম্পর্কের দিক থেকে সে আমাদের কাছেরই আত্মীয়। আমি তার হাঁটুর সমান বয়সি হলেও আমার সাথে এত সুন্দর ও স্নেহভরে কথা বলত যে মুহূর্তের মধ্যে মনটা নরম হয়ে যেত। সত্যি কথা বলতে কি, মানুষকে কিভাবে সম্মান করতে হয় সেটা শিখেছি ব-কলম ফকিরচাঁদের কাছে।

বাবাজান কবে আইচো ঢাকা থেকি ?

আবেগ ও স্নেহ দুটোই উপচে পড়ত তার কণ্ঠ থেকে। কণ্ঠের এ-মমতাকে ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব!

এই তো পরশু দিন ফুফা।

বাড়ির সবাই ভালো আছে তো সোনা?

হ, সবাই ভালো।

তা কতদিন থাকবা বাড়িতে? কবে ছুটি শেষ হোবি?

থাকব দিন দশেকের মতো।

অবশ্যই অবশ্যই টিয়ামন গ্রামে যাইয়ো, তোমার ফুফুর সাথে দেখা করি আইসো।

ঠিক আছে অবশ্যই যাব।

সাক্ষাৎ হলে তাকে সব খবর জানাতে হতো। সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানা হবার পর তার বাড়িতে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে তবেই ছাড়া পাওয়া যেত।

এই ফকিরচাঁদ কেন প্রতিদিন শহরের বাজারে যেত সেটা ছিল অন্য অনেকের মতো আমার কাছেও এক বিস্ময়। তাড়ি, সিনেমা আর বিড়ি ব্যতীত তার অন্য কোনো নেশা কিংবা বদ-নেশার কথা শোনা যায়নি। বিশাল এক বিস্ময়ের চিহ্ন অন্য অনেকের মতো আমারও মনে দোলা দিতে থাকে দীর্ঘকাল। বহু বছর ধরে এর পাইনি কোনো কূলকিনারা। অবশেষে তার মৃত্যুর প্রায় কুড়ি বছর পর শহরে যাওয়ার রহস্য উদ্‌ঘাটন করি। সবার মনে প্রশ্ন উদয় হতে পারে, মারা যাওয়ার এত বছর পর কি একজন সাধারণ লোক অন্য এক বা একাধিক লোকের মনে এভাবে স্মৃতি হয়ে থাকতে পারেন যে, তার বিষয়ে কোনো রহস্যের সমাধান করা যায়! তবে, তিনি যদি কোনো ধর্মগুরু, বিপ্লবী বা বিখ্যাত কেউ হন, সেটা আলাদা কথা। ফকিরচাঁদের ঘটনা তো এমন কিছু নয়, তাহলে! ফকিরচাঁদ বড়মাপের কোনো লোক ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু বড়ত্বের অনেক উপাদান ছিল তার মধ্যে; যেগুলোর ঠিকমতো পরিচর্যা করলে আর উপযুক্ত শিক্ষা পেলে ছড়িয়ে যেতে পারত আমাদের মাঝারি ও নিম্নমানের সীমানা। ফকিরচাঁদের দুর্ভাগ্য, সে সহজাত প্রতিভা পেয়েছিল কিন্তু পায়নি সেটাকে উপযুক্ত পরিবেশে বিকশিত করার সুযোগ। সে নিজের গ্রাম ও আশপাশের দশ গ্রামের মানুষের মনে দাগ কেটে গেছে ঠিকই কিন্তু আঁচড় কেটে নিজেকে খোদাই করতে পারেনি।

একহারা গড়ন ছিল ফকিরচাঁদের, সাধারণ বাঙালি যেমন কালো বর্ণের হয় তার গায়ের রং ছিল এর থেকেও বেশি কালো। উচ্চতায় আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ তার ধারেকাছে ছিল না। লোকে বলত, দশজন লোকের কলিজার সমান ছিল ফকিরচাঁদের কলিজা। রাত দুইপ্রহর পার করে প্রতিদিন যখন গ্রামে ফিরত তখন তাকে বাড়ি ফিরতে হতো অসংখ্য প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে। চোর-ডাকাতের ভয়কে গ্রামের অধিকাংশ মানুষই কোনো ভয় মনে করত না। করবেই বা কেন! গ্রামের অধিকাংশ মানুষই দরিদ্র, তাদের হাতে খুব কম সময়ই যথেষ্ট পরিমাণে টাকা-পয়সা থাকে। আর ফকিরচাঁদ তো মার্কামারা লোক, তাকে দেখলে চোর-ডাকাতরা পর্যন্ত সালাম দিয়ে বিদায় হয়।

কিন্তু অন্য এক শ্রেণির প্রাণীকে ফকিরচাঁদ ভয় না-করলেও সমীহ করে চলত। এই জাতটার আচরণ মানুষ থেকে একদম আলাদা। এরা কখন কার সাথে কেমন ব্যবহার শুরু করে বলা মুশকিল। একদিন ভূতখালির মাঠ দিয়ে ফেরার সময় এক ঘটনা বড্ড ভুগিয়েছিল। কোনো অঘটন অবশ্য ওই সময় ঘটেনি। ভূতখালির মাঠ পার হয়েই যে বাঁশঝাড় সেই বাঁশঝাড়ের নিচ দিয়ে পার হওয়ার সময় সে দেখতে পায় সমস্ত বাঁশগাছ বাঁকা হয়ে রাস্তার উপর শুয়ে আছে। প্রথম দিন তো ফকিরচাঁদ রীতিমতো চমকে উঠেছিল। ঘটনা কি! যখন সে বাজারে গেছে তখনও তো বাঁশঝাড় ছিল এখানে। হঠাৎ রাতের বেলা সেগুলো কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। পরে একটু খেয়াল করে দেখতেই বুঝতে পারল আসল ঘটনা! তার শিড়দাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে যায় নিচের দিকে। কয়েক মিনিট সময় নেয় সিদ্ধান্ত নিতে। অবশেষে সাইকেলটা এক হাতে ধরে বাঁশগাছ ছাড়িয়ে খানিকটা দূর দিয়ে পার হয় শুয়ে থাকা বাঁশগুলো। কিছুদূর এসে সাইকেলের উপর উঠে দ্রুত প্যাডেল মেরে যখন রওনা হয় তখন শুনতে পায় প্যাট প্যাট শব্দ করে বাঁশগুলো সোজা হয়ে উঠছে। ঠিক তখনই গুমরে কেঁদে উঠল কে যেন!

ঘটনাটি পরের দিন ফকিরচাঁদ টিয়ামন গ্রামের অনেকের কাছেই বলল। সংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামের মানুষেরা বর্ণনার প্রতিটি বর্ণ বিশ্বাস করল। তখন সে গ্রামের সাহসী কয়েকজন মানুষকে প্রস্তাব দেয়, চল আজকে রাতেও ঘটনাটা দেখি। বাজার থেকি দেরি করি ফিরলেই বোঝা যাবি আমার বর্ণনা ঠিক না বেঠিক।

রহস্য উন্মোচনের জন্য কয়েকজন রাজি হয়ে গেল এবং ওই দিন তারা অনেক রাত করে ভূতখালি দিয়ে গ্রামে আসার জন্য রওয়ানা দিলো, কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, সেদিন তারা কেউই ফকিরচাঁদের কথার কোনো সত্যতা খুঁজে পেল না। নির্দিষ্ট জায়গায় দেখতে পেল বাঁশগাছগুলো যথাযথভাবে রাস্তার পাশে সুন্দরভাবে আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। একটি নিশাচর পাখি শুধু ডেকে উঠছিল থেকে থেকে। এই নিষ্ফলতায় ফকিরচাঁদ নিজেও লজ্জায় পড়ে গেল। সে বারবার আগের রাতের ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে জোর দিতে থাকল। তখন দলের অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার আফসার বলল, ঘটনা শুনো, তোমার কথা আমরা অবিশ্বাসও করতিছিনি, কিন্তু এর ভিতর আরও গুমর আচে। 

ফকিরচাঁদ আবাক হয়ে তাকায় ওর দিকে, কি গুমর ?

হাঁটতে হাঁটতে অমাবস্যার ওই ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে আফসার ফিসফিস করে বলে, একসাতে দল ব্যাইধা আসা যাবি না। একলা আইসি দেখতে হোবি ঘটনা আসলে কি ?

হয়ত আফসারের ভয় জাগানো ফিসফিসানির স্বরেই এই গাঢ় অন্ধকারের ভেতরে অন্ধকার যেন আরও পুরু হয়ে ওঠে। ভয়ের এক শিরশিরানি অনুভূতিতে দাঁড়িয়ে যায় চারজনের শরীরের লোম। যখন তারা নিজেদের গ্রামে প্রবেশ করল তখন ফকিরচাঁদ জিগায়, ক্যালকে কি কেউ রাতে আসতে পারবু এই রাস্তা দিয়া ?

প্রথমে কেউ স্বীকার করতে চাইল না, অবশেষে আফসার বলে, ঠিক আচে আমি আগামীক্যালও ফুলঝুরিতে যাব।

আফসার পরদিন ফুলঝুরিতে যায় এবং মাঝরাতে ফেরার সময় ঠিক ফকিরচাঁদের অভিজ্ঞতারই মুখোমুখী হয়। পরের দিন সকালবেলা যখন সে সবাইকে ঘটনাটা বলল তখন ঘটনাটা অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইল না। বোঝা গেল এ গতরাতের আগের রাতের প্রভাব। ফকিরচাঁদ তখন বলে, তাহলে অ্যাজও একজন চলো।

পুরো জমায়েত নীরব। বোঝা যায় কারো রাজি হওয়ার ইচ্ছা নেই। অবশেষে সাহস দেখায় রেজাব্বুল, ঠিক আচে আমি ওই রাস্তা দিয়া আজ রাতে অ্যাসপো।

বিকেলে ফকিরচাঁদ আর রেজাব্বুল একই সাথে বাজারে গেল। মাঝরাত হলে দুজন ফেরার জন্য ধরল দুই পথ। ফকিরচাঁদ দ্রুত অন্য রাস্তা দিয়ে রাতের এই বিষণ্ণ গ্রামে ঢুকে রেজাব্বুলের জন্য উৎকণ্ঠিত অপেক্ষার মুহূর্ত কাটাতে থাকে। ভূতখালি পার হতেই আজ রেজাব্বুলও আগের দুজনের ঘটনার মুখোমুখী হলো। অল্প সময়ে মধ্যে রেজাব্বুল এসে পৌঁছায় গ্রামে। খানিক দূরে ফকিরচাঁদ তাকে দেখতে পেয়ে ডাক দেয়, রেজাব্বুল নাকি গো?

রেজাব্বুল জবাব দেয়, হ ভাই।

ছেলেটি যখন ফকিরচাঁদের পাশে এসে দাঁড়াল তখন সে বুঝতে পারল ব্যাচারা ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।

ফকিরচাঁদ বলে, ঘটনা কি সত্যি?

হ, ভাই। আমি আর র‍্যাতে এই রাস্তা দি অ্যাসপো ল্যা।

ফকিরচাঁদের যা বোঝার বুঝতে পারল। তাকে সে সান্ত্বনা দিলো, আরে ভয় পাচ্চিস ক্যা ? ওরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। চল আমি তোক বাড়ি র‍্যাখি আসি।

সেই থেকে টিয়ামন গ্রামে এ-ঘটনা জনপ্রিয়। এই ঘটনাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পুরো কৃতিত্ব ফকিরচাঁদের। এখনও এ-কাহিনি যারা জানে তারা এড়িয়ে চলে রাতের এ-রাস্তা।

টিয়ামন গ্রামের চারপাশেই বিল। বর্ষাকালে আকাশ থেকে দেখলে মনে হতে পারে পানির মধ্যে ভাসছে গ্রামখানি। বর্ষার পর পানিতে একটু টান ধরলেই বিলের চরিত্র বুঝে যেত ফকিরচাঁদ। আশপাশের কোন্ বিলে পদ্মার উজান থেকে বর্ষার সময় মাছ বেশি ঢুকেছে তা বিলের পানিতে হাত দিলেই বলে দিতে পারত। পূর্বপুরুষের হাজার বছরের অভিজ্ঞতাপূর্ণ জ্ঞান সে প্রয়োগ করত পানিকে বুঝতে।

তারপর অন্যদের সাথে আলোচনা করে রসিক গ্রামের হাঁটে রবি ও বুধবার ঘোষণা করে দিত বিলে মাছ ধরার সিদ্ধান্ত। অমনি সকাল দশটা-এগারোটার মধ্যে আশপাশের দশগ্রামের মানুষ এসে নির্দিষ্ট দিন জমা হত বিলের ধারে। সে কি শুধু মাছ ধরা! গ্রামগুলো যেন মেতে উঠত এক যৌথ-উৎসবে। মাছধরা পরিণত হতো এক মিলনমেলায়। এমনকি যারা মাছ বেশি ধরতে পারত তারা আত্মীয়-স্বজনকেও দাওয়াত দিত। পিতা মেয়েকে নাইয়রেও নিয়ে আসত।

নির্দিষ্ট সময়ে গ্রামের প্রধানেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা সেরে সবাইকে ‘নেমে পড়ো, নেমে পড়ো’ নির্দেশ দিয়ে নিজেরাও পলো হাতে নেমে পড়তেন পানিতে। তারপর সারি বেঁধে এক ধারচে শুরু হতো পলো চাপা। লাইন ধরে পলো চাপতে চাপতে বিলের অপর পাড়ে গিয়ে উঠত সবাই। ততক্ষণে ভাগ্যবানদের কোমরের চারপাশ ভরে যেত বড় বড় রুই-কাতলা-বোয়াল-চিতল আর কালবাউস মাছে।

ফুলঝুরি শহরেই আমার নানার বাড়ি। পরে আব্বা নিজেও ওই শহরে বাড়ি করেন ছোট ভাই-বোনদের লেখাপড়া শেখানোর জন্য। অবশ্য মূল বাড়ি ছিল গ্রামেই। শহরের এই বাড়ির মাধ্যমে আস্তে আস্তে আমরা নাগরিক শিক্ষিত সমাজের পংক্তিতে আসন নিই। পরিবারের মধ্যে শিক্ষা ডালপালা ছড়াতে থাকে। ফুলঝুরি শহরে কোনোদিন সকাল সকাল এলে ফকিরচাঁদ আমাদের শহরের বাড়িতেও আসত। এ-আসাটা তার নিয়মিতই ছিল বলা যায়। মাসে দু-একবার না এলে যেন তার পেটের ভাতই হজম হতো না। আমার আম্মা সম্পর্কের দিক থেকে বড় ভাবি। আম্মার সে আবার ছিল খুবই ভক্ত। আমাদের বাড়িতে এসে সোজা চলে যেত আম্মার কাছে। সারা এলাকার যত খবর আছে সব একে একে দিত আম্মাকে। তারপর শুরু হতো একের পর এক গল্প। আমিও ছোটবেলায় আম্মার পাশে বসে তার বলা অনেক গল্প শুনেছি। সে-সব গল্পের কোনো কোনোটি এখনও জ্বলজ্বল করে মনের ভেতর। আম্মা যখন নানাবাড়ি থাকতেন তখন সে নানাবাড়িতেও চলে যেত। সেখানে যাওয়া-আসার মধ্যে দিয়ে খালা-মামা ও মামিদের সাথে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। একবার ছোট খালা-মামাদের এক আড্ডায় একটি কথা বলে বিপদে পড়েছিল। এটি সে-সময়ের কথা যখন ডিশলাইনও চালু হয়নি – ইন্টারনেট তো দূরের কথা। সে বলেছিল ছোট খালা-মামা ও মামি সবাইকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাবে।

আম্মা তখন নানাবাড়িতে ছিলেন, সুতরাং তিনিও যাবেন আর তিনি গেলে সাথে তো আমরা থাকবই। শুরু হলো নির্দিষ্ট দিনটির জন্য অপেক্ষা। তখন বাড়িতে বাড়িতে এত টেলিভিশন ছিল না, সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা ছিল মানুষের বড় বিনোদন। বিকেল থেকে সেজেগুজে শুরু হলো অপেক্ষার পালা।

সময় গড়িয়ে ধীরে পাঁচটা হলো, পাঁচটা গড়িয়ে হলো সাড়ে পাঁচটা। রওয়ানা হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়, ছয়টা থেকে শুরু হবে সিনেমা। এখন রিকশা করে রওয়ানা দিলে সিনেমা হলে পৌঁছতে লাগবে দশ মিনিট। এই সময়ের মধ্যে টিকিট কাটতে হবে। টিকিটের লাইনে ভিড় থাকলে টিকিট কাটতে অনেক সময় লাগতে পারে, এমনকি দেরি করে গেলে টিকেট সব শেষ হয়েও যেতে পারে। তখন সিনেমা না-দেখে বাড়ি ফিরে আসতে হবে। সময় ছয়টার দিকে যত এগোয় সবার উৎকণ্ঠা তত বাড়তে থাকে। নানা ধরনের মন্তব্য করতে থাকেন মামা-খালারা। 

আম্মা অবশ্য ফকিরচাঁদের পক্ষ নিয়ে সবাইকে বলেন, নিশ্চয় কোনো বিপদে পড়িচে, না হলে সে ঠিকই অ্যাসতো।

ঘড়ির কাঁটা যখন ছয়টা পার হয়ে যেতে থাকল তখন শুরু হলো ফকিরচাঁদের প্রতি লক্ষ করে শ্লীল ভাষায় গালিগালাজ। ওর এই অপমানে সেদিন খুবই খারাপ লেগেছিল। আমার মনে হয়েছিল, যদি টাকা থাকত তাহলে সবাইকে এখনই সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতাম। সবার মন-মানসিকতা একেবারে তেত করে দেয় ফকিরচাঁদ। সে-দিন সে কি বিপদে পড়েছিল তা তখনই জানতে পারিনি। পরে না আসার কারণ সবার কাছে পরিষ্কার হয়। অবাক ব্যাপার হলো, ফকিরচাঁদ মন জয় করা কৌশল ব্যবহার করে অল্পদিনের মধ্যেই ওই ঘটনাটি সবার মন থেকে মুছে ফেলে।

আজ বুঝি, এই ফকিরচাঁদ প্রচণ্ড ভালোবাসত মর্ত্যের এই অপরূপ জীবন। জীবনের প্রতিটি দিনকে সে চাইত উৎসবে পরিণত করতে। গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনে সে সন্তুষ্ট ছিল না। তাই জীবনের আরও বৈচিত্র্যের খোঁজে প্রতিদিন আসত শহরে। সন্ধ্যারাত কাটিয়ে সে যখন গ্রামে ফিরত তখন মাঝরাত। শহরে কাটানো প্রতিটি রাতই তার কাছে ছিল অনেকটা বিত্তবানদের পার্টির মতো। বছরের পর বছর ছিল এই তার রুটিন। ফকিরচাঁদের এই অদ্ভুত জীবনযাপনের জন্য তার সম্পর্কে আমার ছিল প্রচণ্ড কৌতূহল। দূরে থাকলেও তার গতিবিধির উপর গভীর নজর রাখতাম। সত্যি কথা বলতে কি, তার ব্যক্তিত্ব আমাকে প্রচণ্ড টানত। সে মারা যাবার পর অনেক লোককে আমি জিজ্ঞাসা করেছি তার বাজারে যাওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু কেউ সদুত্তর দিতে পারেনি কিংবা উত্তর দিলেও সে উত্তর আমার পছন্দ হয়নি। অবশেষে যখন বিষয়টা নিয়ে একদিন মুনসেরের সাথে কথা বললাম তখন দেখলাম মুনসের আর আমার মত একই, অর্থাৎ তারও ধারণা জীবনকে ফকিরচাঁদ উৎসবের ভেতর দিয়ে উপভোগ করেছে। অন্তত একজনকে আমার মতের সাথে মিলতে দেখে সিদ্ধান্তে আসলাম আমরা দুজনই ঠিক। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সে উৎসবের সাথে উদযাপন করে গেছে। তার মতো এমন ইহজাগতিক মানুষ সমাজে খুব কমই আছে। অবাক ব্যাপার হলো, যেদিন মারা যায় ওই দিনও সে শহরের বাজারে গিয়েছিল। বাজার থেকে ফেরার পথে এই বিয়োগাত্মক ঘটনাটি ঘটে। ওইদিন বাজার থেকে ফিরছিল রসুলপুরের নতুন রাস্তা ধরে। রাস্তাটিতে অল্প কয়েক মাস হলো কার্পেটিং করা হয়েছে, ফলে সাইকেল চালিয়ে এ-রাস্তা দিয়ে টিয়ামন গ্রামে ফেরা খুবই সহজ। পাঠান বাড়ি পার হয়ে সে যখন সুন্দরপুরের ফাঁকা মাঠের রাস্তায় ঢোকে তখনই খেয়াল করে আকাশে কালো ঘুটঘুটে মেঘ দ্রুত ঢেকে ফেলছে তারাগুলোকে। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে শুরু হয় ঝড়ো হাওয়া। প্রচুর আজিজ বিড়ি ফোঁকা ফকিরচাঁদের অনেক বছর ধরেই উচ্চ-রক্তচাপ। অবশ্য রক্তচাপ তখন গ্রামে কোনো রোগই না, হৃদরোগ ও স্ট্রোকে মানুষ মারা গেলে বলা হতো বাতাস লেগে মারা গেছে। ফকিরচাঁদ মাঝরাতের ওই মেঘ-ঝড়-বৃষ্টি ও বিদ্যুৎ চমকের ভৌতিক চাপে দিশেহারা হয়ে রাস্তার পাশে এক চারা বটগাছের নিচে গিয়ে আশ্রয় নেয়। পরদিন সকালে সেখানেই তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পাশেই পড়েছিল অত্যন্ত পুরনো হওয়া সাইকেলটি।

তার জানাজায় মানুষের ঢল নামে গ্রামে। আশপাশের দশগ্রামের জনগণ অবাক হয়ে খেয়াল করে, টিয়ামন গ্রামে তাদের বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে কোনো ব্যক্তির জানাজায় বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে এত বেশি লোকের সমাবেশ আর কখনও হয়নি।🔳

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা